বিদেশে বাংলাদেশি শেফ আছেন, কিন্তু বাংলাদেশি কুইজিন কোথায়

দেশি নানা পদের খাবার আছে আয়োজনেফাইল ছবি

বিশ্বের নামকরা পাঁচ তারকা হোটেলে কাজ করার স্বপ্ন অনেক বাংলাদেশি শেফের। কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের মাধ্যমে আজ হাজার হাজার বাংলাদেশি শেফ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছেন প্রতিদিন। কিন্তু একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আমাকে কষ্ট দেয়।

এখন কাজ করছি আয়ারল্যান্ডে। গত কয়েক বছরের কালিনারি ক্যারিয়ারে বিশ্বের একাধিক আন্তর্জাতিক পাঁচ তারকা হোটেলে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। মেরিওট ইন্টারন্যাশনালের লো মেরিডিয়েন, শেরাটন, সেন্ট রেজিসসহ নামকরা কিছু ব্র্যান্ডে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক অতিথির জন্য খাবার প্রস্তুত করেছি। ইতালিয়ান, ফরাসি, জাপানিজ, চায়নিজ, থাই, ভারতীয়, মেক্সিকান, আরবীয়সহ বিশ্বের অসংখ্য দেশের খাবার একই হোটেলের আ লা কার্ট মেনু ও আন্তর্জাতিক বুফেতে দেখেছি। কিন্তু একটি দেশের খাবার প্রায় কখনো দেখিনি। সেটি হলো, আমার বাংলাদেশের খাবার। এটি শুধু একজন শেফ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; এটি বাংলাদেশের কালিনারি ইন্ডাস্ট্রির জন্যও একটি বড় বাস্তবতা।

আমাদের দেশের রান্না কি সুস্বাদু নয়? অবশ্যই সুস্বাদু। আমাদের কি শত শত ঐতিহ্যবাহী রেসিপি নেই? অবশ্যই আছে। সিলেটের সাতকরা, ঢাকার কাচ্চি, চট্টগ্রামের মেজবান, বরিশালের ঐতিহ্যবাহী খাবার, খুলনার চিংড়ি, রাজশাহীর আঞ্চলিক রান্না, পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি, ভর্তা, ভুনা, মাছ, মাংস, পিঠা, মিষ্টি, মৌসুমি রান্না, মসলার অনন্য ব্যবহার, নদীমাতৃক খাদ্য ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কালিনারি ঐতিহ্য বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ একটি খাদ্যসংস্কৃতি। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা খাবারে নয়; সমস্যা আমাদের উপস্থাপনে। আজ বিশ্বের প্রতিটি বড় শহরে ভারতীয়, চায়নিজ, জাপানিজ, ইতালিয়ান কিংবা ফরাসি রেস্টুরেন্ট পাওয়া যায়। এসব দেশের খাবার শুধু জনপ্রিয় নয়, একটি বৈশ্বিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। ফলে এসব কুইজিনে দক্ষ শেফদের আন্তর্জাতিক বাজারে সব সময় চাহিদা থাকে। হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টগুলো নিয়মিত এসব কুইজিনের শেফ নিয়োগ দেয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশি শেফদের অধিকাংশই আন্তর্জাতিক কিচেনে কাজ করেন ঠিকই, কিন্তু রান্না করেন অন্য দেশের খাবার। খুব কম ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের দেশের কুইজিন নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। এর অন্যতম কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কুইজিনের শক্তিশালী অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি। আমার বিশ্বাস, যদি বাংলাদেশি কুইজিনকে আন্তর্জাতিকভাবে সঠিক গবেষণা, আধুনিক উপস্থাপনা, মানসম্মত রেসিপি স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও কার্যকর প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কুইজিনের জন্যও আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার তৈরি হবে। শুধু একজন শেফ নন, তখন একটি দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় লাভবান হবে। এই স্বপ্ন নিয়েই আমি কাজ করছি। আমার এটি শুধু স্বপ্ন নয়, এটি একটি যুদ্ধ। আমার লক্ষ্য শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়া নয়। আমি চাই, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শেফরা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করুক, একই সঙ্গে নিজেদের শিকড়কে ভুলে না যাক। এই উদ্দেশ্যে আমি নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কালিনারি শিক্ষা, ফুড সায়েন্স, কিচেন ম্যানেজমেন্ট, মেনু ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুড কস্টিং, আন্তর্জাতিক রান্নার মান, ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও বাংলাদেশি কুইজিন নিয়ে তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করছি। আমার বিশ্বাস, একটি দেশের কুইজিন বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয় শুধু সুস্বাদু খাবারের মাধ্যমে নয়। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা, ডকুমেন্টেশন, স্ট্যান্ডার্ড রেসিপি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, দক্ষ শেফ, শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব খাদ্য ঐতিহ্য রয়েছে। এগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ, আধুনিকভাবে পরিবেশন ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তুলে ধরতে পারলে একদিন বিশ্বের পাঁচ তারকা হোটেলের বুফে ও আ লা কার্ট মেনুতেও বাংলাদেশি খাবার স্থান পাবে। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন বিদেশের কোনো বিলাসবহুল হোটেলে গিয়ে একজন অতিথি গর্বের সঙ্গে বলবেন, ‘আজ আমি বাংলাদেশি খাবার খেতে চাই।’ সেদিন শুধু একটি খাবারের স্বীকৃতি হবে না, স্বীকৃতি পাবে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, মসলা, নদী, মানুষের জীবনধারা এবং আমাদের হাজার বছরের খাদ্যের ঐতিহ্য। আমি বিশ্বাস করি, এই পরিবর্তন সম্ভব। যদি দেশের শেফ, রেস্টুরেন্ট, কালিনারি ইনস্টিটিউট, গবেষক, উদ্যোক্তা, সরকার ও খাদ্যপ্রেমীরা একসঙ্গে কাজ করেন, তাহলে খুব শিগগির বাংলাদেশি কুইজিন বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রাপ্য সম্মান অর্জন করবে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]