করিম মিয়া বলেন, ‘কুয়েতের ওপরা অঞ্চলে মরুভূমিতে আমাকে উট চরানোর কাজ দেওয়া হয়। সারা দিন উট নিয়ে খাটাখাটি করার পর একটু স্বস্তিতে ঘুমাব, সেটাও পারতাম না। না আছে এসি, না আছে ফ্যান। ছিল না ফ্রিজ। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যেতাম। বেতন যেখানে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া কথা, সেখানে দিচ্ছে ৭০ দিনার, যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ১৯ হাজার।’

করিম মিয়া আরও বলেন, ‘দেশে থাকতে ভালোই ছিলাম। ৩০ হাজার টাকা ইনকাম করতাম মাসে। আরেকটু বেশি উপার্জনের জন্য কুয়েত এসে যেন নরকে এসে পড়লাম। নিজ চাচা এমন বেইমানি করবে, তা ভাবতেও পারিনি। আসার পর চাচাকে বললাম, আপনি আমাকে মরুভূমিতে নিয়ে আসবেন, সেটা আগে কেন বলেননি? চাচার কোনো উত্তর নেই। তিনি নিজেই এসব কাজ করেছেন।’

বেতন বাড়ানোর জন্য বারবার কুয়েতি মালিককে তাগাদা দিলেও বাড়াননি। দুই বছর পর ২০ দিনার বাড়ল। বেতন বাড়িয়েছে ঠিক, কিন্তু মালিক পরিবর্তন হওয়ায় এবার বেতন বন্ধ। ৯ মাস বেতন দেননি। শুধু যে করিম মিয়ার বেতন বন্ধ করে দিয়েছেন তা নয়, ওখানে যাঁরা কাজ করতেন সবার একই অবস্থা। এরপর ছুটিতে যাওয়ার জন্য আবেদন করলে তা–ও দিতে নারাজ মালিক।

করিম মিয়া বলেন, ‘একবার মালিক কয়েক দিনের জন্য উটের সঙ্গে সৌদি নিয়ে যান। কিন্ত সেখানে যে পরিমাণ কষ্ট করছি, তা বুঝানোর মতো নয়। মরুর বুকে সপ্তাহে তাঁরা কয়েক দিন কিছু সময়ের জন্য আসেন। এসে প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে যান। আমাদের তো এখান থেকে বের হওয়া নিষেধ। এখন আর চাচার দেখা পাই না। বাড়িতে চিন্তা করবে বলে কিছুই জানাইনি। তিন বছর শেষ হলে কোম্পানি ছুটি দেয়। সঙ্গে ছয় মাসের পাওনা বেতন দেয়। বাকি তিন মাসের বেতন আসার পর দেবে বলে।’

করিম মিয়া বলেন, ‘ছুটি কাটিয়ে এসে যখন পাওনা বেতন চাইলাম, তখন মালিক বললেন আমার চাচাকে টাকা দিয়ে দিয়েছেন। চাচার কাছে ফোন করলে অস্বীকার করেন। ফলে তিন মাসের আর বেতন পেলাম না। এর মধ্যে অনেকে সহ্য করতে না পেরে সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান। তখন মাত্র আমরা দুজন ছিলাম। এখানকার কাজ এত কষ্ট যে অন্য দেশের শ্রমিকেরা এ ধরনের কাজ করতেই চান না। দীর্ঘ সময় মরুর তপ্ত বালুতে কাটাতে হয়। অনেকটা বন্দি বা নির্বাসিত জীবনের মতোই।’

মরুভূমির আশপাশে কোনো লোকালয় না থাকায় বাড়তি আয়ের সুযোগ নেই এসব শ্রমিকের। অন্যদিকে কুয়েতে যেকোনো কাজ করাও অবৈধ। যে কাজের জন্য তিনি নিবন্ধিত, ঠিক সেই কাজ ছাড়া অন্য কোথাও কর্মরত থাকা অবস্থায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সরাসরি জেল। পরে জেল খাটা আসামির পরিচয়ে চিরতরে ছাড়তে হয় কুয়েত।
একপর্যায়ে করিম মিয়া সেখান থেকে চলে যান কুয়েত সিটিতে। সেখানে অবৈধভাবে দিন পার করছেন এখন। নরক থেকে মুক্তি পেলেও তাঁর মনে ভয়ের চিন্তা কাজ করে সব সময়। ধরা পড়লেই নির্বাসিত। এমনকি জেলও খাটতে হতে পারে। বর্তমানে প্রচুরসংখ্যক প্রবাসী বৈধ পথে এসে অবৈধভাবে কুয়েতে অবস্থান করছেন। তাঁদের বেশির ভাগই দালালের ফাঁদে পড়ে নিজের সর্বস্ব হারিয়েছেন।

সরকার রেমিট্যান্সের আশা করে, কিন্তু এসব অবৈধ প্রবাসীর কথা ভাবে না—আক্ষেপ করিম মিয়ার। বৈধ পথে এসেও তাঁদের অবৈধভাবে থাকতে হচ্ছে। অবৈধ থাকা আর জেলখানায় থাকার মধ্যে তফাৎ নেই। পুলিশের ভয়ে কোথাও বের হওয়া যায় না। তাঁরা যে রেমিট্যান্স পাঠাবে মাধ্যম কী? বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে হলে তো সিভিল আইডি (পরিচয় পত্র) প্রয়োজন। সেটা তো তাঁদের নেই। সরকার তো কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। তাহলে কেন বৈধ পথে রেমিট্যান্স আশা করে?

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন