উত্তম-সুচিত্রা: স্মৃতির আলো, জীবনের ছায়া
আমি অতি উৎসাহী হয়ে বলতে চাই, আমার ছোটবেলার দিনগুলোয় আমি চিত্রজগতের দুই অমর নাম উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের গভীর ভক্ত ছিলাম। তাঁদের অভিনয় আমাকে এতটাই মুগ্ধ করত যে আজও সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সে বহু বছর আগের কথা, তবু স্মৃতিতে আজও তাঁরা জীবন্ত।
হঠাৎ আজ এক লেখা চোখে পড়ে গেল, এই সূত্র ধরেই সেই সময়ের একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি আমার মনে পড়ছে। ‘সেদিন ওর চোখ দেখে…’, সেই উত্তম-সুচিত্রার শেষ দেখা, কী কথা হয়েছিল? সেই লেখা পড়তে গিয়ে যেন স্মৃতির দরজা খুলে গেল।
সুচিত্রা সেন, টলিপাড়ার মহানায়িকা। অপরূপ সৌন্দর্য আর অসাধারণ অভিনয়শৈলী দিয়ে তিনি যুগের পর যুগ দর্শকের মন জয় করেছেন। কিন্তু এই খ্যাতির আড়ালে ছিল এক নিঃসঙ্গ জীবন। ব্যক্তিগত জীবনের অস্থিরতা তাঁকে একসময় চলচ্চিত্রজগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আলো, ক্যামেরা, অ্যাকশনের পৃথিবী থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, লাইমলাইটের পেছনে কী গভীর অন্ধকার লুকিয়ে থাকে।
তাই তিনি চাননি তাঁর মেয়ে মুনমুন সেন অভিনয় জগতে আসুক। কারণ, সুচিত্রা সেন খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন খ্যাতির মূল্য কতটা কঠিন হতে পারে।
একসময় পর্দায় উত্তম-সুচিত্রা মানেই ছিল দর্শকের হৃৎস্পন্দন। সেই যুগে তাঁদের জুটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু সময়ের প্রবাহে উত্তমকুমারের প্রয়াণে ভেঙে পড়েছিলেন সুচিত্রা সেন। তাঁর শেষ দেখা, শেষ বিদায়, সবকিছুই হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ।
একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘এই তো সেদিন স্টারদের ক্রিকেট খেলার সময় দেখা হয়েছিল। আমায় দেখে হেসেছিল। সেদিন ওর চোখ দুটো দেখেছিলাম। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। জানতে চেয়েছিলাম কেমন আছো, উত্তরে বলেছিল ভালো।’ সেই ছিল শেষ কথা। তারপর থেমে যায় এক যুগের গল্প।
আমার নিজের জীবনের কথাও এখানে জড়িয়ে আছে। সে বহু বছর আগের কথা, সালটি হবে সম্ভবত ১৯৮৭। আমি তখন সুইডেন থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলাম। স্টকহোম থেকে বেলগ্রেড, বেলগ্রেড থেকে কলকাতা, তারপর ঢাকা। এক দীর্ঘ ও অদ্ভুত যাত্রাপথ। আজ ভাবলে সেই যাত্রার কথা গায়ে শিউরে ওঠে, কিন্তু তখন ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
সেই সময় অল্প খরচে বহু দেশের বিমানবন্দর দেখা ছিল একধরনের বিস্ময়।
ছোটবেলায় আমি টুকটাক অভিনয়ও করেছি। অভিনয় সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। ক্লাস এইটে পড়াকালীন একবার বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম খুদে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সে স্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমার বাবা তখন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন। তিনি আমাকে ধরে সরাসরি গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।
এসবই জীবনের অন্য এক অধ্যায়, যা আজ স্মৃতির ভাঁজে চাপা পড়ে আছে।
যা–ই হোক, সুইডেনে ফেরার পথে ঢাকা হয়ে এসে দমদম বিমানবন্দরে ট্রানজিটে বসে ছিলাম, প্লেনের অপেক্ষা। চারপাশে নীরবতা। তখন বাজছিল ইউরোপের সেই বিখ্যাত গান “The Final Countdown”। গানটির সুর যেন পুরো পৃথিবীকে ছাড়িয়ে অন্য এক বাস্তবতায় নিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি তাঁকে দেখলাম। দেখে পরবর্তী সময়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি সুচিত্রা সেনের মতোই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
যাকে এত দিন শুধু পর্দায় দেখেছি, সেই মানুষটি বাস্তবে আমার সামনে। সময় যেন থমকে গেল। বয়সের ছাপ ছিল, তবু তাঁর উপস্থিতি ছিল একই রকম রাজকীয়।
তিনি এসে খুব কাছেই বসলেন। হয়তো একই যাত্রায় ছিলেন। বিমানবন্দর তখন তুলনামূলক ফাঁকা। সাধারণ যাত্রীদের মতোই তিনি ছিলেন শান্ত, নীরব।
আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কি বেলগ্রেড যাচ্ছেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে পরে জার্মানিতে একটি বিশেষ কাজে যাবেন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কিছুক্ষণ আমাদের কথা হলো। আমি তখন বলিনি আমি তাঁকে চিনি বা তাঁর চলচ্চিত্রের একজন ভক্ত। তিনিও স্বাভাবিকভাবে আমার সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আমি কোথায় থাকি, কী করি, এটা কি আমার প্রথম বিদেশযাত্রা কি না।
ফ্লাইটের সময় হয়ে এল। আমরা বিমানে উঠলাম। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি আমার সামনের আসনে বসলেন। সেই যাত্রাপথে আবারও কিছু কথা হলো। জীবনের সাধারণ কথা, যাত্রার কথা। বিদেশে যাওয়ার সময় আমার মন সাধারণত ভারী হয়ে থাকে। তখন দেশ, পরিবার, শৈশব সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়ে। কিন্তু সেই দিন অনুভূতিটা ছিল ভিন্ন।
বিদায়ের সময় তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি কিছুক্ষণ সেই হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হলো, এই হাত শুধু একজন মানুষের নয়, একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করছে। তিনি বিদায়ের সময় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমিও তাঁর হাত ধরেছিলাম। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের অনুভূতি আজও আমার হৃদয়ে অমলিন।
উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণযুগের দুই নাম। তারা শুধু অভিনেতা ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন এক সাংস্কৃতিক অনুভূতির প্রতীক। কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং স্মৃতির অংশ।
আজও যখন তাদের কথা মনে পড়ে, মনে হয় তারা কোথাও হারিয়ে যাননি। তারা আছে, মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতিতে, চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে।
আমার এই সামান্য দেখা, সামান্য কথা, সেটাই আমার জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি।
শেষ পর্যন্ত একটাই অনুভূতি থেকে যায়। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক, কিছু মুখ, কিছু চোখ কখনো শেষ হয় না।
উত্তম-সুচিত্রা সেই অমর অধ্যায়, যা কখনো শেষ হবে না।
বাংলা চলচ্চিত্রজগতে উত্তম-সুচিত্রার মতো যুগলবন্দী কেবল একটি সময়ের সাফল্য নয়, এটি একটি নান্দনিক মানদণ্ড, যা আজও আমাদের চলচ্চিত্রচিন্তার ভিতকে প্রভাবিত করে। তাঁদের অভিনয় ছিল সংযমের ভেতরে তীব্রতা, সৌন্দর্যের ভেতরে গভীরতা এবং জনপ্রিয়তার ভেতরে একধরনের নীরব শৃঙ্খলা, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আজও এক অনিবার্য শিক্ষা।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, আমাদের চলচ্চিত্র নিয়েও ভাবায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও সেই একই ইতিহাস, একই আকাঙ্ক্ষা এবং একই সম্ভাবনার ধারাবাহিকতা। এখানে প্রতিভার অভাব নেই, গল্পের অভাব নেই, দর্শকের ভালোবাসার অভাবও নেই। কিন্তু যে জিনিসটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, সেই শৈল্পিক পরিমিতি, চরিত্রনির্ভর গভীরতা এবং নির্মাণের ধৈর্য, তা এখনো আরও দৃঢ় ভিত্তির অপেক্ষায় রয়ে গেছে।
আমার অন্তরের গভীর বিশ্বাস, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আরও সমৃদ্ধ হবে, আরও পরিশীলিত হবে এবং নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়কে আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করবে। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীরা যেন কেবল সাফল্যের পেছনে না ছুটে, বরং গল্পের সত্যতা, মানবিকতা এবং নান্দনিক দায়বদ্ধতাকে তাদের সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে শেখে।
কারণ চলচ্চিত্র কেবল পর্দায় দেখা কিছু দৃশ্য নয়, এটি একটি জাতির আত্মপ্রতিকৃতি, তার স্মৃতি, তার ব্যথা এবং তার স্বপ্নের সম্মিলিত রূপ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সেই জায়গায় পৌঁছাক, যেখানে প্রতিটি গল্প শুধু বলা হয় না, বরং মানুষের ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকে, যেমনটি আজও বেঁচে আছে আমার মাঝে।
*লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন