দেশ থেকে প্রায় আড়াই হাজার মাইল দূরে প্রবাসের মাটিতে রমজান পালন করা সত্যিই এক অন্য রকম অনুভূতি। রমজান এলেই যেন হৃদয়ের গহিনে এক শূন্যতা নেমে আসে। ইফতারের সময় যখন দেশের কথা মনে পড়ে, তখন মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের হাসি-আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে মসজিদে একসঙ্গে নামাজ পড়ার দিনগুলো মনের আয়নায় ভেসে ওঠে।
‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
রমজান মানেই এক অন্য রকম প্রশান্তি, এক অদ্ভুত প্রশস্ত অনুভূতি, যা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তোলে; কিন্তু যখন এই পবিত্র মাসটি কাটাতে হয় প্রবাসে, তখন এর আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে একরাশ শূন্যতা। দেশের ইফতারি, মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসে ইফতার করতে দেখার যে সুখ, তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট কেবল একজন প্রবাসীই অনুভব করতে পারেন। প্রবাসে থাকা মানেই অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া। দেশে থাকলে রমজানের সময় পুরো পরিবেশটাই বদলে যায়। ইফতারের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, মসজিদগুলোতে ভিড় লেগে থাকে, আর চারপাশে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়; কিন্তু প্রবাসে সেই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে পড়াশোনা, অফিসের কাজের চাপ থাকে আগের মতোই, চারপাশে নেই সেই পরিচিত আজানের ধ্বনি, নেই ইফতারের সময় পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা সুগন্ধ।
মসজিদে গিয়েই পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে দেখা—এসব মুহূর্ত শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দী হয়ে থাকে; কিন্তু তার পরও আমরা যারা প্রবাসে, তারা চেষ্টা করি এই বিশেষ মাসের আনন্দ একসাথে ভাগ করে নিতে। দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরে একা একা ইফতার করা সত্যিই কষ্টের। যদিও এখানে আমরা চেষ্টা করি বন্ধুরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে ইফতার করতে, তবু দেশের মতো সেই স্বাদ পাওয়া যায় না।
আমাদের দেশের ইফতার মানেই যেন এক অন্য রকম আয়োজন। খেজুর, শরবত, বেগুনি, পেঁয়াজু, চপ, হালিম, জিলাপি—কত রকম মুখরোচক খাবার থাকে! আর সবচেয়ে বড় কথা, থাকে মায়ের হাতের পরম যত্নে বানানো খাবারের স্বাদ, যা কোনো রেস্টুরেন্টের খাবারেই খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে প্রবাসের জীবন মানেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। এখানে নিজের মতো করেই আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।
আমি যখনই সময় পাই, বন্ধুদের সঙ্গে ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ইফতার করি। তখন মনে হয়, বন্ধুরাই যেন প্রবাসের পরিবার। একসঙ্গে ইফতার করতে গিয়ে কিছুটা হলেও দেশের সেই হারানো উষ্ণতা ফিরে পাওয়া যায়। পবিত্র রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়, এটি আত্মশুদ্ধির মাস, ধৈর্য ও সংযমের মাস। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মধে৵ও আমরা চেষ্টা করি এই পবিত্র মাসের মাহাত্ম্য ধরে রাখতে। সবাই মিলে একসঙ্গে ইফতার করলে, একটু হলেও মন ভালো হয়ে যায়। তবু, মনে সব সময় একটাই চাওয়া—যদি একদিন ফিরে যেতে পারতাম সেই ছোটবেলার রমজানে, যখন মাগরিবের আজানের আগেই সবাই মিলে গোল হয়ে বসতাম, বাবা দোয়া পড়তেন, মা সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতেন, আর ভাইবোনেরা মজা করতাম। সেই স্মৃতিগুলো এখন শুধু হৃদয়ের এক কৌটায় বন্দী হয়ে আছে।
রমজান এক ধৈর্যের পরীক্ষা, সংযমের শিক্ষা। প্রবাসের ব্যস্তজীবনের মধে৵ও আমরা চেষ্টা করি এ পবিত্র মাসের মাহাত্ম্য ধরে রাখতে। সবাই দোয়া করবেন, যেন আল্লাহ আমাদের সবার রোজা কবুল করেন এবং আমাদের পরিবারকে সুস্থ-সুখে রাখেন। রমজান মোবারক!
লেখক: হাসিবুর রহমান