সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়া জুড়ে ঈদ উদযাপন, প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ক্যানবেরা, মেলবোর্নসহ দেশজুড়ে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ মুসলিম সম্প্রদায় অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করেছেন। তবে ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত পার্থক্যের কারণে এবারও অস্ট্রেলিয়ায় দুই দিনে ঈদ উদযাপিত হয়েছে। প্রথম দিন রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকলেও দ্বিতীয় দিন আজ বৃহস্পতিবার ছিল মেঘলা ও বৃষ্টিস্নাত। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের মাঝেও প্রবাসীদের ঈদ আনন্দ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময়ে কোনো কমতি ছিল না।
অস্ট্রেলিয়ার ইমাম কাউন্সিলের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী প্রথম দিন দেশটির অধিকাংশ মুসলিম ঈদ উদযাপন করেন। সেদিন সকালটি ছিল বেশ চমৎকার ও রৌদ্রোজ্জ্বল। কনকনে শীতের সকালে মনোরম আবহাওয়ায় হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা ঈদের জামাতে শরিক হন। জামাত শেষে প্রবাসীরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর দিনটি মূলত কাটে ঘরোয়া আয়োজনে, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে।
অন্যদিকে, স্থানীয় চাঁদ দেখা কমিটি 'মুনসাইটিং অস্ট্রেলিয়া'র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবারেও অনেক প্রবাসী ঈদ উদযাপন করেছেন। এই দিন সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন এবং আবহাওয়া ছিল বৃষ্টিস্নাত। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সকাল থেকেই বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে সমবেত হতে থাকেন।
মুসলিম উম্মাহর এই পরম আনন্দের দিন উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ শুভেচ্ছাবার্তা দিয়েছেন। তিনি তাঁর বার্তায় অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করেন এবং সবার সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ইতিবাচক বার্তা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের মতো সুনির্দিষ্ট ও বিশাল খোলা মাঠ বা স্থায়ী ঈদগাহ নেই। ফলে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা স্থানীয় পার্ক, বিভিন্ন শহরের মসজিদ, বিদ্যালয়, মাসাল্লা এবং কমিউনিটি হলগুলোতে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সিডনির লাকেম্বা এলাকার দাওয়াত ইসলামী অস্ট্রেলিয়ার ফয়জান-ই-মদিনা ইসলামিক সেন্টারে ঈদের বড় জামাতগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও প্যারি পার্ক, ব্যাংকস টাউন, অর্বান, লিডকম, লাকেম্বার দারুল উলুম কেন্দ্রীয় মসজিদ, রকডেল মসজিদ, লিভারপুল, মিন্টু, গ্রানভিল, গ্রিন-ভ্যালি, ম্যাসকট, মাউন্ট ড্রুইথ, ক্যাম্পবেলটাউন, গ্লেনফিল্ড, ম্যাকুরিফিল্ড, ইঙ্গেলবার্ন, সেফটন, এডমন্ডসন পার্ক ইসলামিক মসজিদ আল বাইয়িত, মদিনা মসজিদ এবং লুমিয়ার বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টার ও কনভেনশন হলে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি জামাতেই বিভিন্ন দেশের হাজারো মুসল্লির ঢল নামে।
ঈদের অভিজ্ঞতা ও আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে সিডনির ডেনহ্যাম কোর্ট এলাকার প্রবাসী রিজওয়ান চৌধুরী বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে সিডনিতে আছি। এবার দুই দিনে ঈদ হওয়ায় উৎসবের আমেজটা একটু ভিন্ন ছিল। প্রথম দিন বন্ধুদের বাসায় গিয়েছি, আর দ্বিতীয় দিন নিজেরা আয়োজন করেছি। বৃষ্টি থাকলেও ঈদের আনন্দ কমেনি। দেশের মতো ঈদগাহ না থাকলেও আমরা পার্ক এবং হলে সবাই মিলে যখন নামাজ পড়ি, তখন এক টুকরো বাংলাদেশই মনে হয়।"
অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১০ লাখ মুসলমানের বসবাস। ঈদের নামাজ শেষে প্রতিটি মসজিদে দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। বিশেষ করে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের শান্তি কামনায় অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা করেন মুসল্লিরা। নামাজ শেষে সর্বস্তরের মানুষ মেতে ওঠেন ঈদের চিরচেনা আনন্দ ভাগাভাগিতে।
কোরবানি ঈদের মূল আনুষ্ঠানিকতা অর্থাৎ পশু কোরবানির নিয়ম অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন। আইনি বাধ্যবাধকতা ও পরিবেশগত নিয়মের কারণে
অস্ট্রেলিয়ার ইমাম কাউন্সিলের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী প্রথম দিন দেশটির অধিকাংশ মুসলিম ঈদ উদযাপন করেন।
যত্রতত্র পশু কোরবানি দেওয়ার কোনো সুযোগ এখানে নেই। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশই দেশে তাঁদের পরিবারের মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করে থাকেন। তবে যাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় নিজে কোরবানি দিতে চান, তাঁরা শহর থেকে অনেক দূরে সরকার নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট ফার্মে গিয়ে ধর্মীয় নিয়ম মেনে কোরবানি সম্পন্ন করেন।
কোরবানির এই ভিন্ন নিয়ম সম্পর্কে ওয়ালিপার্কের কেক এন বেক এর কর্ণধার মাসুমা মৌ বলেন, "অস্ট্রেলিয়ায় কোরবানি দেওয়ার নিয়ম ভিন্ন। আমরা ঈদের বেশ কিছুদিন আগেই স্থানীয় হালাল মাংসের দোকানে কোরবানির জন্য ফরমাশ দিয়ে রাখি। দোকান মালিকরা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ফার্মে কোরবানি সম্পন্ন করে মাংস সুন্দরভাবে কেটে ঈদের দিন বা তার পরের দিন আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এতে ঝামেলা মুক্তভাবে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা যায়।"
ব্যস্ততম প্রবাস জীবনে ঈদের দিনগুলোতে কর্মজীবী অনেকেই ছুটি নিয়ে পরিবারকে সময় দেন। নতুন পোশাক পরিধান, ঐতিহ্যবাহী সেমাই ও পোলাও-মাংসের সুস্বাদু খাবার পাশাপাশি ভিন্ন ধরণের আয়োজনে প্রতিটি বাঙালি আঙিনা মুখরিত হয়ে ওঠে ভিন্ন সাজে, ভিন্ন চালে।