কানাডায় গত দুই মাসে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বেকার হয়ে গেছে

অফিসে এক কর্মী কাজ করছেন। তবে ২০২৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কানাডায় মোট ১ লাখ ১০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে।ফাইল ছবি

কানাডার শ্রমবাজারে টানা দুই মাসের পতনে বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া কর্মসংস্থানের সব প্রবৃদ্ধি মুছে গেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে কমেছে ৬৮ হাজার ৩০০টি এবং আগস্টে ৪১ হাজার ৭০০টি। চাকরির বাজারের এই দুর্বলতা দেশটির অর্থনীতি, তরুণ চাকরিপ্রার্থী ও নতুন অভিবাসীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর ২০২৬) কানাডার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার প্রকাশিত শ্রমবাজারের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার অর্থনীতিবিদেরা সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার ২০০টি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কর্মসংস্থান বেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কানাডায় নিট ৪১ হাজার ২০০টি কর্মসংস্থান কমেছে। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৩০০টি কর্মসংস্থান বেড়েছিল।

সরকারি চাকরি ও উৎপাদন খাতে চাপ

সেপ্টেম্বরে কানাডার সরকারি খাতে কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৭০ হাজার। এ নিয়ে টানা চার মাস সরকারি খাতে কর্মসংস্থান কমল। গত এক বছরে এ খাতে কর্মীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ১৯ হাজার।

শিক্ষা খাতে সেপ্টেম্বরে ৩৫ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে কমেছে আরও ২৩ হাজার। তবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক মাসে কর্মসংস্থান কমলেও গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ খাতে কর্মীর সংখ্যা এখনো বেশি রয়েছে।

উৎপাদন খাতেও দুর্বলতা দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে এ খাতে ১২ হাজার ৭০০টি কর্মসংস্থান কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা কানাডার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক কর্মসংস্থান হ্রাসের পুরোটা মার্কিন শুল্কের কারণে হয়েছে, এমন প্রমাণ এখনো নেই।

গত দুই মাসে কানাডায় ১ লাখ ১০ হাজার কর্মসংস্থান হারিয়ে অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তরুণ ও নতুন অভিবাসীরা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তরুণেরা

শ্রমবাজারের এই পতনে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন তরুণেরা। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সেপ্টেম্বরে ৪৮ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মিলিয়ে এ বয়সী মানুষের কর্মসংস্থান কমেছে ৬৭ হাজার।

তরুণদের জন্য চাকরির বাজারে প্রবেশ করা এমনিতেই প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবন শুরু করতে চাওয়া তরুণদের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। নতুন অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন—দুই ধরনের কর্মসংস্থানেই সেপ্টেম্বরে পতন হয়েছে। পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান কমেছে ৩৫ হাজার এবং খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান কমেছে ৩৩ হাজার।

এদিকে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের পর, কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাদ দিলে, এটি সর্বনিম্ন পর্যায়। এই হার দিয়ে বোঝা যায়, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কত অংশ কাজ করছেন অথবা সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজছেন।

সুদের হার নিয়ে কী ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

কর্মসংস্থানের প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ পরিসংখ্যান প্রকাশের পর কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াবে কি না, তা নিয়ে বাজারের প্রত্যাশায় পরিবর্তন এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্বল শ্রমবাজারের কারণে অক্টোবর মাসে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কমেছে।

তবে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হবে, কমানো হবে নাকি বাড়ানো হবে, তা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের ওপর। শুধু কর্মসংস্থান কমার তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

কানাডিয়ান ডলারের দর পতন

প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে কানাডীয় ডলারের মূল্যও কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার কানাডীয় ডলার মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ দুর্বল হয় এবং দিনের একপর্যায়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।

সব মিলিয়ে, কানাডার শ্রমবাজারে টানা দুই মাসের চাকরির বাজারের ও কানাডিয়ান ডলারের দর পতন দেশটির অর্থনীতিকে আগামীতে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার লেবার ফোর্স সার্ভে, সেপ্টেম্বর ২০২৬ এবং রয়টার্সের ৯ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]