সব রকমের পারফর্মারদের নিয়ে দলটি গঠিত। এর মধ্যে আছে অত্যাধিক হাসিখুশি ভাঁড়, প্রশিক্ষিত ছাগল, কুকুর, টাট্টু ঘোড়া আর আছে একদল প্রশিক্ষিত অ্যাক্রোবেটিক পারফর্মার। সিডনির লিভারপুলে এখন তাদের শো চলছে। আমরা বাপ–ব্যাটা, বেটি মিলে গিয়েছিলাম তাদের শো দেখতে। সেই শো দেখতে যেয়ে আমরা যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছি। আমরা প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছি। লিভারপুলের ক্যাথলিক ক্লাবের পাশের মাঠে বিশাল তাঁবু ফেলে চলছে তাদের শো।

ক্যাথলিক ক্লাবের পার্কিংয়ে গাড়ি পার্ক করে আমরা এগিয়ে গেলাম মূল প্রবেশদ্বারের দিকে। গত কয়েক দিনের অল্প অল্প বৃষ্টিতে মাঠের পরিবেশ কর্দমাক্ত। মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে সার্কাস ছাড়াও বিভিন্ন রাইডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আছে বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রকারের গেম শো। আরও রয়েছে খাবারের, কফির ও কোমল পানীয়ের দোকান। আর শো ব্যাগ বলে একটা ব্যাগ বিক্রি হচ্ছিল, যার মধ্যে অনেক ধরনের খেলনা একসঙ্গে ছিল। আমরা একটু আগেই চলে গিয়েছিলাম। তাই যেয়েই বাচ্চাদের জন্য পপকর্ন আর স্ল্যাসি নিয়ে নিলাম। এরপর অনলাইনে কাটা টিকিট দেখিয়ে কাউন্টার থেকে সিট নম্বর সংগ্রহ করে অপেক্ষার পালা কখন সার্কাস শুরু হবে।

আমার ছেলে ছয় বছরের রায়ানের যেন আর তর সইছিল না। সে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল, কখন শো শুরু হবে। সময় কাটানোর জন্য আমরা ছবি তোলা শুরু করলাম। শুরুতে তেমন ভিড় না থাকলেও শোয়ের সময় যতই ঘনিয়ে আসছিল, ভিড় ততই বাড়ছিল। অবশেষে নির্দিষ্ট সময়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে বিভিন্ন আলোর ঝলকানি দেখে মনে হলো যেন কোনো কল্পলোকে ঢুকে পড়েছি। একজন সাহায্যকারী আমাদের সিট খুঁজে দিলেন। আমাদের সিট ছিল মূল মঞ্চের একেবারে সামনে।

এরপর চমৎকার উদ্দীপনাময় সুরের তালে তালে শুরু হলো একেকটা দুর্দান্ত পরিবেশনা। আর এরই ফাঁকে কয়েকজন ভাঁড় তাঁদের মজার মজার সব কাজকর্ম দিয়ে দর্শকদের মাতিয়ে রাখছিলেন। শুরুতেই একজন ভাঁড় সামনে বসা কয়েকজনকে বাংলাদেশের দিল্লির লাড্ডুর মতো একটা চৌকোনা বাক্স থেকে প্লাস্টিকের গ্লাসে করে শরবত খেতে দিলেন। খাওয়ার পর সেই বাক্স খুলে তার মধ্যে থেকে গিনিপিগ বের করলেন, যেন ব্যাপারটা এমন যে সবাই গিনিপিগের মূত্র পান করলেন। শোয়ের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল।

এরপর ছাগলের একটা বাক্সে ঢুকে রং বদলানো এবং একজন বড় ভাঁড় ঢুকে ছোট হয়ে বের হওয়ার খেলাটাও সবাইকে ভীষণ আনন্দ দিল। আর অ্যাক্রোবেটিক পারফরম্যান্সগুলো দেখে গায়ের রোম দাড়িয়ে যাচ্ছিল। সবাই অনেক বেশি প্রশিক্ষিত, তবুও নিরাপত্তার বিষয়টা খেয়াল রাখা হচ্ছিল। বাংলাদেশের সার্কাসের পারফর্মারদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার পারফর্মারদের পার্থক্যটা এখানেই। এই গল্পটাই আমি আমার পাশে বসা আমাদের মেয়েটাকে বলছিলাম। শুনে সে বিশ্বাসই করতে চাইছিল না যে এত বিপজ্জনক টাস্কও কোনো প্রকার সেফটি মেজর ছাড়াই করা যায়!
যা–ই হোক, পারফরম্যান্সের মধ্যে একটা ১৫ মিনিটের বিরতি দিয়ে আবার শুরু হলো। এভাবে কখন যে দুই ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে, আমরা খেয়ালই করিনি।

অবশেষে পারফরম্যান্স শেষ হলো মুহুর্মুহু করতালির মধ্য দিয়ে। আমরা বাইরে এসে দেখি, আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠলাম। ফেরার সময় রাতের অন্ধকারে সার্কাসের তাঁবুটাকে সত্যি সত্যিই আরব্য রজনীর রূপকথার কোনো মহল বলে মনে হচ্ছিল।