ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম: স্বচক্ষে যা দেখলাম, অভিজ্ঞতায় যা শিখলাম

অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গে লেখকছবি: লেখকের পাঠানো

বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব অনেক দেশেই আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেন সম্ভবত এক নতুন রেকর্ড গড়েছে। যুক্তরাজ্যে গত ১০ বছরে যেখানে একজন প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ কিংবা পর পর দুজন প্রধানমন্ত্রীর মাত্র এক মেয়াদ করে ক্ষমতায় থাকার কথা, সেখানে আজ পর্যন্ত ছয়জন প্রধানমন্ত্রী গত হয়ে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাসীন হয়েছেন। গতকাল সোমবার (২০ জুলাই) নর্থ ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার সিটির সদ্য সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

এবার সরকার পরিবর্তনে উপরোক্ত প্রচলিত সব প্রথার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকলেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়াতে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছে। কারণ, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কোনো সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে বিজয়ী লেবার সরকার গঠন করেছিলেন সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কিন্তু ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস গণহত্যা বন্ধে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দুর্বল ভূমিকা এবং দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারের ক্রমশ ব্যর্থতা গত দুই বছরে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তাকে বিপুল সংকটের মুখে ফেলে। এর ফলশ্রুতিতে মে মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বিপুল পরাজয় ঘটে। এর পর থেকে মূলত নিজ দলের ভেতর থেকেই প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের দাবি উঠতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা এমন জোরালো আকার ধারণ করে যে কিয়ার স্টারমারের পক্ষে তা অগ্রাহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পার্লামেন্টে দলের অর্ধেকের বেশি সদস্যের দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দলীয় প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন, যার ফলে অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে দলীয় এমপিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের একজন সুপরিচিত রাজনীতিবিদ, যিনি জনসেবামূলক নেতৃত্ব, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর কাজের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম মহানগর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গণপরিবহন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আবাসন এবং জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে অঞ্চলটির পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

বার্নহ্যামের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া। তিনি প্রায়ই সামাজিক বৈষম্য কমানো, সুযোগের সমতা বৃদ্ধি এবং কম আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পক্ষে কথা বলেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি স্থানীয় ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তিনি স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তাঁর অবস্থান জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এবং অনেকেই স্থানীয় জনগণের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন।

সমর্থকদের মতে, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এমন একজন নেতা যিনি স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি, উন্নত গণপরিবহন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে তাঁর নীতিমালা আঞ্চলিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল করতে সহায়তা করেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে প্রথম ভাষণে তাঁর উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেছে। ভাষণে তিনি রাজনীতিতে নতুন সূচনার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, গত এক দশকে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের কারণে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেছেন, এই পরিস্থিতিকে বদলানোর জন্য তিনি একটি ‘circuit breaker’ বা বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে চান। তিনি আগামী ১০ বছরের জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কথাও বলেছেন, যাতে অর্থনীতি, জনসেবা ও অবকাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তোলা যায়। এ ছাড়া তিনি সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন এবং অচিরেই এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন।

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ আমার হয়েছে। প্রায় বছর তিনেক আগে চ্যানেল এস টেলিভিশনের ইয়র্কশায়ার ব্যুরো চিফ হিসেবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির একটি কনফারেন্সে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম পার্টির প্রভাবশালী এমপি রিচার্ড বার্গনের কাছ থেকে। রিচার্ড জানিয়েছিলেন, ম্যানচেস্টার সিটির মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামও আসবেন অনুষ্ঠানে। বার্নহ্যাম তখন ম্যানচেস্টারে উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তা ছাড়া ইতিপূর্বে লেবার পার্টির লিডার হওয়ার দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণেও তিনি মিডিয়ার লাইম লাইটে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, সম্ভব হলে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিতে হবে। পরিকল্পনা মোতাবেক হাজির হলাম অনুষ্ঠানে। এমপি রিচার্ড বার্গন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন।

তারপর অনুষ্ঠানের বক্তব্য-পর্ব শেষে মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাকে। তাঁর সামনে গিয়ে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করলাম। কারণ, যাঁকে ইন্টারভিউ করার নিয়তে স্যুট-টাই পরে এলাম, তাঁকে সাধারণ একটা শার্টের ওপরে নীল ব্লেজার, জিনস প্যান্ট আর পায়ে কেডস পরে এসেছেন দেখে অবাকই হলাম। যাই হোক, পরিচিত হওয়ার পর অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আমার সঙ্গে এমন আন্তরিকভাবে কথা বললেন, মনে হলো যেন আমাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। কিন্তু আমি জানি, তাঁর মতো একজন সিনিয়র নেতা আমাকে চেনার কথা নয়। মনে মনে ভাবছিলাম, মানুষকে আপন করে নেওয়ার কি অসাধারণ তার ক্ষমতা। একজন রাজনীতিবিদের জন্য নিশ্চয়ই এটা একটা বড় যোগ্যতা।

যাই হোক, তাঁকে ক্যামেরার সামনে ছোট্ট একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার অনুরোধে তিনি সানন্দে রাজিও হলেন। বিদায় নেওয়ার আগে এই লেখার সঙ্গে সংযুক্ত ছবিটিও তুলেছিলাম। সেদিন তাঁর সাধারণ বেশ-ভূষা দেখে যত না অবাক হয়েছিলাম, তার চেয়েও বিস্মিত হয়েছিলাম তাঁকে গাড়িতে তুলে বিদায় দিতে গিয়ে। তাঁর যাওয়ার প্রাক্কালে এমপি রিচার্ড বললেন, ‘চলো, অ্যান্ডিকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’ আমি ভেবেছিলাম, ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দলের এত বড় নেতা! সঙ্গে নিশ্চয়ই কিছু সিকিউরিটি আর গাড়ি থাকবে অন্তত দুই-তিনটা। কিন্তু তাঁর গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি, কোথাও কেউ নেই। তিনি একাই এসেছেন তার সাধারণ ব্র্যান্ডের ব্যক্তিগত গাড়িটি নিজে চালিয়ে। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে বিশ্বের এক অন্যতম পরাশক্তি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন এই মানুষটি। আমার এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস শিখলাম, প্রকৃত নেতারা ক্ষমতার দাপট দেখান না। তাঁদের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁদের কাজে। এটার চর্চা হওয়া উচিত আমাদের দেশেও।