শ্যাওলার দেয়ালে
আমি কখনো বড় স্বপ্নের মানুষ ছিলাম না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এসব শব্দ আমার মাথায় জায়গা পায়নি। আমি শুধু জানতাম, কেউ চুপ করে থাকলে তার পাশে বসতে হয়, আর কেউ কাঁপলে তার দিকে হাত বাড়াতে হয়।
আমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল দৈনন্দিন ছোট ছোট কাজ। এক কাপ চা ঠিক সময়ে এনে দেওয়া, জানালার পর্দা একটু সরিয়ে দেওয়া, যাতে আলোটা ভেতরে ঢোকে। সেই আলোতে দাঁড়িয়ে একদিন অদিতি বলেছিল—
— ‘তুমি এত ছোট ছোট জিনিস নিয়ে বাঁচো কেন?’
আমি হেসেছিলাম, বলেছিলাম—
— ‘কারণ বড় জিনিস একদিন ভেঙে যায়… ছোটগুলো থাকে!’
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—
— ‘তুমি যদি একদিন না থাকো?’
আমি খুব আস্তে বলেছিলাম—
— ‘আমি না থাকলেও আমার কাজগুলো থাকবে… জানালার ওই আলোয়!’
আমি ভাবতাম ভালোবাসা যদি রোদ্দুর হয়, তাহলে তা হবে বিকেলের। যে রোদ গরম দেয়, কিন্তু কাউকে তাড়া করে না!
অদিতি ছিল দ্রুত। হাঁটায়, কথায়, সিদ্ধান্তে। তার জীবনে সবকিছুর একটা মাপ ছিল—সময়, মানুষ, অনুভূতি।
সে একদিন হঠাৎ বলেছিল—
—‘তুমি এত ধীর কেন?’
আমি বলেছিলাম—
—‘আমি ভয় পাই। তাড়াহুড়ায় মানুষ হারিয়ে যায়!’
সে চুপ করে থেকে বলেছিল—
—‘আমি হারিয়ে গেলে তুমি কী করবে?’
আমি উত্তর দিইনি।
সে কাঁপা গলায় বলেছিল—
— ‘তুমি আমাকে ধরে রাখবে তো?’
আমি তখন বুঝিনি দম নেওয়ার জায়গা আর থেকে যাওয়ার জায়গা এক জিনিস নয়!
আমি অদিতিকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিলাম। কোনো উপলক্ষ ছিল না। আমি শুধু বিশ্বাস করতাম—জঙ্গলের ভেতর মানুষ মিথ্যে বলতে পারে না।
পাতার শব্দের ভেতর সে বলেছিল—
— ‘এখানে খুব চুপচাপ…ভয় লাগে।’
— ‘আমি তো আছি।’
সে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল—
— ‘সব সময় থাকবে?’
আমি নীরব ছিলাম।
সে প্রায় ফিসফিস করে বলেছিল—
— ‘আমাকে ছেড়ে যেও না… আমি একা থাকতে পারি না।’
আমার বুকের ভেতর তখন হাহাকার উঠেছিল—
আমি জানতাম, মানুষ থেকে যাওয়ার কথা বলে কেবল চলে যাওয়ার আগে!
কিন্তু তাকে সেটা বলতে পারিনি। যেমন বলেনি হিজলের ফল, টুপ করে ডুবে যাওয়ার আগে!
নৌকা ধীরে চলছিল। আকাশের ছায়া পড়ছিল ঘোলা জলে।
অদিতি পানিতে হাত ডুবিয়ে বলেছিল—
— ‘ভবিষ্যৎ কেমন হবে বলো তো?’
— ‘নদীর মতো… হয়তো বদলাবে।’
— ‘তুমি কখনো নিশ্চয়তা দাও না কেন?’
আমি চুপ।
সে হঠাৎ কাঁপা স্বরে বলেছিল—
— ‘আমি থাকব। তুমি ভয় পেও না।’
আমি ভেতরে ভেঙে পড়ছিলাম।
কারণ, আমি জানতাম থাকার প্রতিশ্রুতি যত জোরে বলা হয়, তত দ্রুত ভেঙে যায়!
অদিতি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
একদিন সে ক্লান্ত গলায় বলেছিল—
—‘তুমি আমাকে খুব বেশি ভালোবাসো।’
—‘ভালোবাসা কি মাপা যায়?’
সে বলেছিল—
—‘যখন সেটা শ্বাস নিতে দেয় না… তখন যায়।’
—‘আমি তো শুধু পাশে থাকতে চেয়েছি।’
সে চোখ নামিয়ে বলেছিল—
—‘তোমার পাশে থাকতে থাকতে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি।’
সেদিন প্রথম বুঝলাম, ভালোবাসা কখনো কখনো আলোর মতো নয়, ছায়ার মতোও হতে পারে!
যেদিন অদিতি চলে গেল, আকাশ খুব পরিষ্কার ছিল।
সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল—
—‘আমি পারছি না।’
আমি জিজ্ঞাসা করিনি কেন।
তবু সে নিজেই বলেছিল—
— ‘তোমার চোখের ভেতর এত অপেক্ষা থাকে… আমি সেই অপেক্ষা পূরণ করতে পারি না।’
আমি খুব আস্তে বলেছিলাম—
— ‘আমি তো কিছু চাইনি।’
সে হেসে উঠেছিল, তিক্ত হাসি—
—‘তোমার না চাওয়াটাই সবচেয়ে বড় চাওয়া।’
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা ছোট ছিল।
কিন্তু আমার ভেতরে সেটা বজ্রপাতের মতো বাজছিল।
আমি এখন অন্ধকার ছাপাখানায় কাজ করি।
একদিন সহকর্মী জিজ্ঞাসা করে,
—‘তুমি এত চুপচাপ কেন?’
আমি বলি—
—‘শব্দ সাজাতে সাজাতে নিজের শব্দগুলো হারিয়ে ফেলেছি!’
রাতে একা দাঁড়িয়ে কখনো নিজেকেই বলি—
—‘তুমি কাঁদছো?’
ভেতর থেকে উত্তর আসে—
—‘না… শুধু একটু ফাঁকা হয়ে যাচ্ছি।’
আমি এখন কাউকে বলি না আমি থাকব।
বিকেলের আলো জানালায় এসে পড়ে। খুব শান্ত।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি।
মনে পড়ে জঙ্গল, নদী, আর এক অদিতি।
কখনো কল্পনায় সে এসে বলে—
—‘তুমি এখনো এমনই আছো?’
— ‘না… আমি এখন একটু কম আলো।’
সে যেন দূর থেকে ফিসফিস করে –
— ‘তুমি আমাকে দোষ দাও?’
—‘না… আমি শুধু নিজেকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোমার ভেতর দিয়ে।’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি রোদ্দুর হতে পারিনি। আমি শুধু আলো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। যে আলো কাউকে পোড়ায় না, কিন্তু কাউকে ধরে রাখতেও পারে না।
আর এখন বুঝি—
কিছু মানুষ ভালোবাসে এমনভাবে, যে ভালোবাসা কাউকে আটকে রাখে না—
শ্যাওলার দেয়ালে!
কুড়ি বছর পর
সেদিন বিকেলেও রোদ ছিল। কিন্তু রোদটা কেমন ফ্যাকাসে। আমি লোকাল বাসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিড় ঠেলে ঠেলে মানুষ উঠছে, নামছে।
হঠাৎই চোখ পড়ল। জানালার পাশে বসে আছে এক নারী। চুলে সামান্য সাদা। মুখে ক্লান্তির রেখা।
তবু চোখদুটো—সেই একই।
অদিতি!
আমার বুকের ভেতর শব্দ উঠল। যেন পুরোনো ছাপাখানার মেশিন হঠাৎ চালু হয়ে গেছে।
সে প্রথমে আমাকে খেয়াল করেনি। তারপর চোখ তুলে তাকাল।
দৃষ্টি থেমে গেল।
আমরা দুজনেই চিনে ফেললাম।
কেউ হাসল না।
কেউ অবাক হলো না।
শুধু চেনা নীরবতা।
তার চোখ যেন বলল—
— ‘তুমি?’
আমার চোখ বলল—
— ‘হ্যাঁ… এখনো আছি।’
বাস ঝাঁকুনি খেল। আমি সিটের হাতল ধরলাম।
সে কাঁচের জানালায় হাত রাখল। আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল ২০ বছরের দূরত্ব।
আমি ভেতরে ভেতরে বললাম—
— ‘তুমি ভালো আছো?’
তার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি যেন উত্তর দিল—
—‘ভালো থাকার অভিনয় শিখেছি।’
সে একটু নড়ল। আমার দিকে আবার তাকাল।
তার ঠোঁট কাঁপল। খুব আস্তে—
—‘তুমি এখনো ধীর?’
আমি ঠোঁট নাড়ালাম, শব্দ বেরোল না।
মনে মনে বললাম—
—‘আর তুমি? এখনো দ্রুত?’
আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো জানত না এই ভিড়ের ভেতর দুজন মানুষ তাদের একসময়ের জীবন দেখে ফেলেছে।
সে ব্যাগটা শক্ত করে ধরল।
হয়তো বলতে চেয়েছিল—
— ‘সেদিন আমি ভুল ছিলাম। তোমার অতিরিক্ত ভালোবাসা ছাড়া আমি এখন ফাঁকা।’
কিন্তু শব্দ বেরোল না।
আমি বলতে চেয়েছিলাম –
— ‘আমি এখনো জানালার পর্দা সরাই। আমি এখনো বিকেলের রোদ পছন্দ করি। আমি তোমাকে দোষ দিইনি কখনো।’
কিন্তু লোকাল বাসে স্বীকারোক্তির জায়গা নেই।
এখানে শুধু ধাক্কা আছে।
বাস থামল।
সে নামার আগে একটু থামল।
চোখে এক অদ্ভুত হাহাকার।
তার চোখ যেন বলল—
— ‘তুমি আমাকে খুব বেশি ভালোবাসতে…’
আমার চোখ উত্তর দিল—
—‘আর তুমি সেটা নিতে পারোনি…’
সে নেমে গেল।
বাস আবার চলতে শুরু করল।
জানালার বাইরে তাকে ছোট হতে দেখলাম।
ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
আমি হঠাৎ বুঝলাম ২০ বছরেও কিছু শব্দ বুড়িয়ে যায় না।
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
কেউ টের পেল না। লোকাল বাসে কেউ কারও কান্না দেখে না!
ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলল—
—‘ডেকে নাও… এখনো পারো…’
আরেকটা কণ্ঠ বলল—
— ‘না। এবার তাকে মুক্তই থাকতে দাও।’
বাস এগিয়ে চলল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
হাতল শক্ত করে ধরা।
মনে হচ্ছিল আজ আবার দরজা বন্ধ হলো।
কিন্তু শব্দটা আরও গভীর।
বিকেলের রোদ জানালায় এসে পড়ছিল।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
ফিসফিস করে বললাম –
— “অদিতি…”
কেউ শুনল না।
শুধু বুকের ভেতর জমে থাকা ২০ বছরের কান্না ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল – শ্যাওলার দেয়ালে!
লেখক: হিমু আকরাম, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। হাইপয়েন্ট স্ট্রিট, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র। [email protected] https://www.facebook.com/share