মন খারাপ করা বিকেল
অস্ট্রেলিয়া আসার পর জেনেছিলাম এখানে তিনটা বিষয়কে কখনো বিশ্বাস করতে নেই। সেই তিনটা বিষয় হচ্ছে তিনটা ডব্লিউ। এর মানে হচ্ছে ওয়েদার, ওয়ার্ক ও উইমেন। এমন প্রবাদের কারণ হচ্ছে, এই তিনটা বিষয় যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। এর মধ্যে প্রথমটা হচ্ছে ওয়েদার মানে আবহাওয়া। আবহাওয়া যে কখন বদলে যাবে, কেউই বলতে পারে না যতই পূর্বাভাস থাকুক না কেন। এখানে এখন শীতকাল চলছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। যেটা ঠান্ডার পরিমাণ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই দেশে থাকতে যে বৃষ্টি আসত আনন্দের বার্তা নিয়ে, এখানে সেই একই বৃষ্টি আসে মন খারাপের বার্তা নিয়ে। কবীর সুমন লিখে গেছেন—
‘মন খারাপ করা বিকেল মানেই
মেঘ করেছে
দূরে কোথাও দু-এক পশলা
বৃষ্টি হচ্ছে।’
আমারও তাই মনটা খারাপ। আর তার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সামনের পবিত্র ঈদুল আজহা। মনে পড়ে, ঈদ এলেই আমরা বন্ধুরা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে কুষ্টিয়া এসে হাজির হতাম। তারপর চাঁদরাত পর্যন্ত চলত কুষ্টিয়া শহরে আমাদের বেড়ানো। কুষ্টিয়া নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাস্তার এমাথা থেকে ওমাথা আবার ওমাথা থেকে এমাথা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চলত আমাদের হাঁটাহাঁটি। আর নির্দিষ্ট বিরতিতে চা পান বা আরও অন্যান্য খাবার খাওয়া। এ ছাড়া রেনউইক বাঁধে গিয়ে ঘণ্টা হিসাবে নৌকা ভাড়া করে নিয়ে নৌভ্রমণ ছিল অন্যতম অনুষঙ্গ। এখনো বন্ধুরা সবাই উৎসব উপলক্ষে কুষ্টিয়া আসে, কিন্তু আমরা যারা প্রবাসী, তারা সেখানে নেই। আমার মনের কোণে বেজে চলে মাহিনের ঘোড়াগুলির গান—
‘আমি গাই ঘরে ফেরার গান
উতলা কেন এ প্রাণ
শুধু যে ডাকে, ফিরে আমাকে
বিদেশ–বিভুঁইয়ে পড়ে আছি
তবু ছাড়ে না কেন ছাড়ে না পিছুটান।’
কোরবানির ঈদ চলে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে খুদে বার্তায় যোগাযোগ করলেই ওরা বলে চলে আয় একসঙ্গে ঈদ করি। এবারও সৌরভ একই কথা বলল, যখন ওকে আমি গুগুলের ছবির স্মৃতিভান্ডার থেকে পুরোনো দিনের ছবি পাঠালাম। বলল, চলে আয় আবার আমরা নৌবিহারে যাই। নৌবিহার নিয়ে কত স্মৃতি। তখন গড়াই নদের ওপর সেতু হয়নি। দল বেঁধে নৌকায় ওঠার পরপরই অনেকেই আবেগের বশে পাটাতনে শুয়ে পড়ে আকাশ দেখতাম। কেউ কেউ আবার বলে উঠত, নৌকার দুলুনিতে মনে হচ্ছে আমি যেন নদীর পানির ঢেউয়ের ওপর শুয়ে আছি। সেটা শুনে আমরা বাকিরা বলতাম, আজকে ওর গায়ে খারাপ বাতাস লেগেছে। যেহেতু ঘরের ফেরার কোন তাড়া থাকত না, তাই নৌকা কখনো ভাটির টানে চলে যেত কুমারখালীর দিকে। আবার কখনোবা তালবাড়ির টেকে। সেই স্থবির সময়গুলো ছিল নির্মল আনন্দময়।
রোজার ঈদের সময়ও বন্ধুরা সবাই কুষ্টিয়া গিয়ে জড়ো হয়েছিল। আমি আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম চাঁদরাতে তোরা যখন সবাই একত্র হোস, আমাকে একটা কল দিস। টিভিতে কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’ ছেড়ে দিয়ে আমি সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল ভোর চারটার পর। ঘুম ভেঙেই দেখি হোয়াটস্যাপে একগাদা মিসড কল। আমি তাড়াতাড়ি ফিরতি কল করলাম। ভিডিওতে দেখি সব কটি মুখ হাসিতে ঝলমল করছে। আমি বললাম, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রে। ওরা বলল, আজকে তুই ঘুমিয়ে পড়লি, মানে কী? এরপর সবার সঙ্গেই কুশলবিনিময় হলো। এই বন্ধুদের দেখলে মনে হয়, জীবন এত সুন্দরও হয়। আমাদের মধ্যে নেই কোনো ভেদাভেদ, নেই কোনো উচ্চবাচ্য। আমাদের একটাই পরিচয়—আমরা সবাই কুষ্টিয়ার মানুষ।
এবারও ওদের বলে রেখেছি। আমি নিশ্চতভাবেই জানি ওরা আবার ঠিক আমাকে কল দেবে। আমি আবার নতুন করে নিজেকে রিচার্জ করে নেব পরবর্তী এক বছরের জন্য। জগতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছোট গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম আমি দুনিয়ার হালহকিকতের খবর পেয়েছিলাম আমার কলেজের বন্ধুদের কাছে। আমার মানস গঠনে ওদের একটা বিশাল অবদান রয়ে গেছে এবং থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি ওদের সবার পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলাম। আমরা মাত্র দুটি বছর একসঙ্গে পড়াশোনা করেছিলাম। যদিও তখনো সেভাবে পরিচয় হয়নি। এরপর যখন সবাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে বাড়িতে অবসর সময় কাটাচ্ছিলাম, তখন আমরা আরও কাছাকাছি এলাম। এরপর সবাই চলে গেলাম দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন থেকেই ঈদের ছুটিগুলো ছিল আমাদের পুনর্মিলনীর একমাত্র উপলক্ষ।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এভাবেই দূর পরবাসে জীবন চলে একেবারে রুটিন মেনে। সপ্তাহের সাত দিনের যে রুটিন পুরো বছরেরও সেই একই রুটিন। সূর্য ওঠার আগেই রোজ ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে চড়ে বসা। একই কামরায় প্রতিদিন, একই যাত্রীদের সঙ্গে যাতায়াত। ট্রেনের জানালা দিয়েও প্রতিদিন সেই একই দৃশ্যের অবতারণা। এরপর ট্রেন থেকে নেমে বাংলাদেশের পোশাককর্মীদের মতো দৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া। তারপর একই যাত্রীদের সঙ্গে বসে চড়ে বসা। এরপর একই কফি শপ থেকে একই কফি নিয়ে অফিসে ঢুকে দিনের কাজ শুরু করা। এর মধ্যে এতটুকু বৈচিত্র্য নেই। আমি চেষ্টা করি চলার পথে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যাত্রাটাকে উপভোগ্য করতে, কিন্তু মুঠোফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এতটাই আত্মকেন্দ্রিক করেছে যে আমরা আলাপ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। তাই দূর পরবাসের সময়গুলো আমার কাটে দেশের স্মৃতিচারণা করে—
‘এই দূর পরবাসে তারা গুনি আকাশে আকাশে
কাটে নিঃসঙ্গ রাত্রিগুলো
মাঝে মাঝে স্বপ্নের বেশে স্মৃতিরা এসে
আমাকে করে যায় বড় বেশি এলোমেলো।’