আমিও কি পেনশন পাব
কিছুদিন আগে মেয়াদ শেষে দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি অবসরে গেলেন। নানা তথ্যের মধ্যে একটি তথ্য বেশ ভাবনার খোরাক হয়ে পড়ে, সেটা ছিল অবসর ভাতাসহ তাঁকে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে রাষ্ট্র থেকে।
ছোটবেলায় মা-বাবা থেকে শুরু করে পারিপার্শ্বিকতা বা নিজ থেকে আমাদের সবার মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কী, আমি কী হতে চাই—এ ধরনের চিন্তা কিন্তু মাথায় ঢোকানো হয় বা নিজ থেকে ঢুকে যায়।
আমি জানি না, কারও মাথায় কখনো এ ধরনের চিন্তার জন্ম নেয় কি না, যেমন আমি চোর, গুন্ডা, বদমাশ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ বা খুনি হতে চাই। এ ধরনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নিয়ে জীবন শুরু করেছে, এমন ঘটনাও শুনিনি। তবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বৈমানিক, বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ, শিল্পপতি, এমনকি রাজনীতিবিদ ইত্যাদি হতে চায় অনেকেই, এসব শুনেছি। ছোটবেলার সেই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সাধনা এবং কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সাফল্য পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা সরল মনের অধিকারী।
সেই সুবাদে সেবা দেওয়া এবং সেবা নেওয়া আমাদের মানবতা এবং নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
যতক্ষণ মানবতা ও নৈতিকতা সঠিকভাবে কাজ করে, ততক্ষণ আমরা সমাজের সবকিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই মেনে চলি, কিন্তু যখনই মানবতা ও নৈতিকতার অবনতি দেখা দেয়, তখনই শুরু হয় সমস্যার।
সমাজের একটি গ্রুপ আছে, যারা রীতিমতো ছাত্রজীবন থেকেই প্রকাশ্যে সমাজসেবক হিসেবে কাজ করে। বাবার হোটেলে শুয়েবসে খায় আর গরিবের জন্য এটা-সেটা করে বেড়ায়। তারা সেই থেকেই গরিবের ভাগ্য পরিবর্তনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শেষে রাজনীতিতে যোগ দেয় গরিবের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে। লক্ষ করেছেন কিনা জানি না, তবে আমি খুব কাছ থেকে লক্ষ করেছি। আমি এ পর্যন্ত, বিশেষ করে বাংলাদেশে গরিবের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হতে দেখিনি। তবে রাজনীতিবিদদের বিশাল পরিবর্তন দেখেছি। কী করতে চেয়েছিল আর কী হয়ে গেল! ঘটনাটি কি ভাবার বিষয় নয়?
আমি আজ আলোচনা করব পেনশন বা অবসর ভাতার ওপর। আমি বা আমার মতো যাঁরা দিনমজুর, কৃষক থেকে শুরু করে দিনভিখারি এবং যাঁরা দূর পরবাসী, আজীবন বিদেশে কাজ করছেন, একদিন তাঁদেরও তো কর্মজীবন শেষ হবে। তাঁদের জন্যও কি সীমিত পেনশনের ব্যবস্থা করা হবে বা হচ্ছে? বিষয়টি জানতে ইচ্ছা করছে। বাংলাদেশ তো অনেক উন্নতির শিখরে এখন, তাহলে আছে কি একটি সঠিক ও নির্ধারিত পরিকাঠামো, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য?
সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশনের সুবিধা পেলেও যাঁরা বেসরকারি চাকরি করেন, তাঁরা এমন সুবিধা পান কি না, জানি না। নানা রকম সংকটের মধ্য দিয়েই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের দিন যাপন করতে হয়। পেনশনের টাকা পাওয়ার জন্যও যদি তাঁদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তা হবে দুঃখজনক। চাকরি ছাড়ার পর সময়মতো পেনশনের টাকা না পাওয়ায় কোনো কোনো শিক্ষককে অর্ধাহারে-অনাহারেও দিন কাটাতে হয়। আমরা জানি, বৃদ্ধ বয়সে সবারই কম-বেশি নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন। অর্থাভাবে ওষুধ কিনতে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কতটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। বস্তুত সন্তানের পড়ালেখার খরচসহ প্রতিদিনই বিভিন্ন খাতে দরকার অনেক টাকা।
অবসরজীবনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের যাতে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, সে জন্য পেনশনবিষয়ক সমস্যার সমাধানে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য।
এ ছাড়া যাঁরা স্বল্প আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তাঁরাও কর্মজীবন শেষে আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ কারণে যে সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়, তা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে শুনেছি, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে, একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হবে, সেটা আগেভাগেই বলে রাখি।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনায় এনে এই কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। আপাতত চার শ্রেণির জনগোষ্ঠীর জন্য চার ধরনের পেনশন কর্মসূচি চালু হয়েছে। সেগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাসী। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা জারি করা হয়েছে, গঠন করা হয়েছে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব নাগরিকই এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে এবং ৬০ বছর বয়স থেকে তাঁরা আজীবন পেনশন পাবেন। শুরুর দিকে চিন্তা না থাকলেও পরে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদেরও পেনশন কর্মসূচির আওতায় রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
গ্লোবাল পেনশন ইনডেক্সে বিশ্বের ৪৪টি দেশের তালিকা করা হয়েছে। এই তালিকায় যেমন আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, ইসরায়েল, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, সুইডেন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের নাম রয়েছে। এখন থেকে বাংলাদেশের নামও এর মধ্যে থাকবে। সঞ্চয়মুখী ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার অভিপ্রায়ে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি প্রশংসার দাবি রাখে। আশা করি, এটা শুধু তালিকাযুক্ত হয়ে থেমে যাবে না, এটা কাজেও প্রমাণিত হবে। কারণ, সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া মানুষ পেনশন তুলতে গিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হন, তা আমলে নিলে আলোচ্য কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। যে কারণে কর্মসূচির পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিতের বিকল্প নেই। সাধারণ জনগণের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে পেনশন উত্তোলনের ব্যবস্থা যদি করা যায়, তাহলে এই কর্মসূচি জনপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করি।
এই কর্মসূচি সার্থক হলে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। এ জন্য পেনশন কর্মসূচির সফল উদাহরণ তৈরি করা প্রয়োজন। আমি এই কর্মসূচির সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করি, একই সঙ্গে মাননীয় রাষ্ট্রপতিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছি। আশা করি, তিনি বিষয়টি মানবতা ও নৈতিকতার দিক দিয়ে বিবেচনা করবেন, সেই প্রত্যাশাও করি।
লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। [email protected]