হায়, সে সুখ

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে হতচকিত হই।
এই তো আম্মু বুঝি আমায় ডেকে ডেকে হয়রান। গরম পানি তৈরি। হাত-মুখ ধুয়ে গরম পরোটা আর খাঁটি দুধের চা। এত্ত ভোর এখনো—কখন জাগল মা? তার ঘুম ভাঙাতে এলার্ম ক্লক তো ছিল না কোনোকালে। নাকি ঘুমোয়নি এতটুকু!! আজকের মায়েদেরও কী ঘুম ভাঙে এমনই—জানতে ইচ্ছে করে।

কি শীত কি গরম—একই রকম দিনগুলো। নাশতা করে দৌড়ে মক্তবে, লাইন করে বসে আমপারা-সুরা-মোনাজাত-দোয়া-নামাজ শিক্ষা। আরও কত কী! ঠিক এখনো কানে বাজে সুর করে পড়া সুরাগুলো। নাহ আজও নামাজে দাঁড়ালে সেই সুরই বাজে—একটুও নড়চড় হয়নি। আচ্ছা, আজকের প্রজন্ম কোথায় শিখে সুরা, কোথায় শিখে নামাজ পড়ার নিয়ম? নিশ্চয় তাদের ঘরে ঘরে মাওলানারা এসে পড়িয়ে যান; কিংবা ইন্টারনেটেই পাওয়া যায় ‘সহজ নামাজ শিক্ষা’! খুব ভোরে ঘুম ভেঙে তাদের দৌড়াতে হয় না মক্তবে! সময় সহজ করে দিয়েছে হয়তো তাদের জীবন।

অলংকরণ: আরাফাত করিম

সহজ হয়েছে আরও কত কি? আর আমরা! মক্তব থেকে এসে পড়তে বসো। সকালের পড়া নাকি মনে থাকে খুব—বাবার কথা। পড়া শেষে কাঁধে ব্যাগ গুছিয়ে স্কুল—লাইন ধরে পিটি ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’—কানে বাজে আজও। পড়া না শিখলে মাস্টারের বেতের বাড়িটা বড় জঘন্য ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বিকেলে মাঠে ফুটবল—ততটা জনপ্রিয় হয়নি তখনো ক্রিকেট। মাঠও ছিল পাড়ায় পাড়ায়—মহল্লায় মহল্লায়। প্রতি সপ্তাহে ফুটবল ম্যাচ। জয়ী দলের জন্য কাচের গ্লাস—আহা কী সুখ! মাঝেমধ্যে মারামারি—হাত-পা ছিঁড়ে ঘরে ফেরা—মায়ের বকুনি। অল্পবিস্তর উত্তম-মধ্যম—অতঃপর সেবা-যত্ন–পট্টি বেঁধে দেওয়া। এখনো ছেলেরা খেলে সেই মাঠে—জানতে ইচ্ছে করে খুব।

এখনো পাড়ায়-পাড়ায় ম্যাচ হয়, গ্লাসের বিনিময়ে? শীতকালটা বড়ই মজার ছিল—শুধু হতচ্ছাড়া সাত-সকালের মক্তবটা বাদে। গরম গরম ভাপা পিঠা-খেজুরের রস—আরও কত কী! এখনো কী পাওয়া যায় তেমন খেজুরের রস, ভাপা পিঠা? নাকি হারিয়ে গেছে ফুচকা-চটপটির আর বার্গারের ভিড়ে?

একটু বড় হতে না হতেই কত রঙিন দুনিয়া। বইয়ের পাতায় পাতায় হাঁটে মাসুদ রানা-রবিন হুড—আরও কত নায়ক! বইয়ে চড়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো, আফ্রিকা থেকে ইউরোপ-আমেরিকা। কতদূরের দেশ! না জানি কেমন স্বপ্নময়–গল্পময়! কেমন মানুষগুলো? আমাদের মতোই নাকি অন্য কোন ভাষার-জগতের, অন্য কোন মানবীয় মননের? জানতে ইচ্ছে করত! রাতে শুয়ে শুয়ে দিনে পড়া গল্পগুলোর কাহিনি-ছেদন-গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত। আজও কী বই পড়ে শিহরিত হয় ছেলেমেয়েরা, স্বপ্ন বুনে আমাদের মতো? নাকি ল্যাপটপ কেড়ে নিয়েছে ওদের সব স্বপ্ন? হায় কত অভাগা ওরা—কতটুকু বঞ্চিত!

ওদের আজ সবই আছে। কত সহজ আর আধুনিক ওদের জীবন। ফুটবল মাঠ এখন ঘরে ঘরে—কম্পিউটার জুড়ে। মক্তব-লাইব্রেরি সবই চারকোনা বাক্সে প্যাকেটবন্দী। তামামদুনিয়া আজ অজানা নয়। রবিনহুডদের জায়গা দখল করে নিয়েছে সুপারম্যানরা। সবই আছে—সবই। ওদের মুখে তবু হাসি দেখি না—আমাদের সময়কার মতো।

ওদের বুকফাটা কান্না দেখি না—স্বপ্ন দেখি না—অভিমান দেখি না। দুঃখ-কষ্টের মায়াজালে ওদের বন্দি হতে দেখি না। হায়, কত হতভাগা ওরা, কতটুকু বঞ্চিত! মুঠোফোন ছিল না আমাদের—ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারিনি বন্ধুর সঙ্গে। তবে বন্ধুত্ব ছিল অফুরান। মুঠোফোন ছাড়াও প্রতিদিন ঠিকই দেখা হতো। আমাদের বন্ধুত্বে প্রাণ ছিল—স্পর্শ ছিল। আমরা যেন অনেক বেশি মানবীয় ছিলাম।

সবচেয়ে খুশির ছিল ঈদ। ঈদ এলেই নতুন জামা-জুতা। নতুন আবদার- রিবোক ক্যাডস কিংবা হালফ্যাসনের নতুন জিন্স! আর না পেলে কান্নাকাটি- অভিমান; ভাত না খাওয়া। সংসার যন্ত্রণার দুঃখ লুকিয়ে বাবার সারপ্রাইজ- মাঝরাতে নতুন প্যাকেট খোলা। নতুন জামা-জুতা পরে সারা রাত বসে থাকা। আহা—কী সুখ!

এখনো ঈদ হয়—হয়তো ঠিক আগের মতোই। এখনো সকালে ঈদগাহে জামাত হয়। ঈদের আগের রাতে বাবারা কী এমন সারপ্রাইজ দেয়—জানতে ইচ্ছে করে খুব।

সংসার সাগরের সেই সুখ-দুঃখের ভেলায় ভাসতে ইচ্ছে করে আবার। কান্না-হাসি, অভিমান-ভালোবাসায় ভরপুর পুরোনো ঠিকানায় ফিরতে পারতাম যদি! চোখের কোণ আর্দ্র করে দেওয়া স্মৃতির পাতা হাতড়াই, ঘুম-ঘুম চোখে তাকিয়ে রই বুকের ভেতর দুমড়েমুচড়ে দেওয়া অতীত পানে।

হায়, সে সুখ!