উরাশিমা তারো
বহু বছর আগে, জাপানের উপকূলে ট্যাঙ্গো প্রদেশে, মিজু-নো-য়ে নামের একটি ছোট জেলে গ্রামে উরাশিমা তারো নামের এক যুবক জেলে বাস করত। তার বাবাও জেলে ছিলেন এবং তারোর মধ্যে তার বাবার চেয়েও দ্বিগুণ নৈপুণ্য ছিল, কারণ উরাশিমা ছিল সেই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ জেলে এবং এক সপ্তাহে তার সঙ্গীরা যে পরিমাণ বনিটো এবং তাই মাছ ধরত, সে এক দিনেই তার চেয়ে বেশি ধরতে পারত।
কিন্তু সেই ছোট জেলে গ্রামে, সমুদ্রে মাছ ধরার দক্ষতার চেয়েও বেশি পরিচিত ছিল তার দয়ালু হৃদয়ের জন্য। তার সারা জীবনে সে কখনো কোনো প্রাণী, তা ছোটই হোক বা বড়ই হোক, আঘাত করেনি এবং ছেলেবেলায় তার সঙ্গীরা তাকে নিয়ে সব সময় হাসাহাসি করত, কারণ সে তাদের সঙ্গে প্রাণীদের জ্বালাতন করার এই নিষ্ঠুর খেলায় কখনোই যোগ দিত না। বরং সব সময় তাদের এই নিষ্ঠুর খেলা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করত।
এক স্নিগ্ধ গ্রীষ্মের গোধূলিবেলায়, সারা দিনের মাছ ধরা শেষে সে যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন সে একদল শিশুর কাছে এসে পৌঁছাল। তারা সবাই চিৎকার করছিল ও খুব জোরে কথা বলছিল এবং দেখে মনে হচ্ছিল কোনো একটা বিষয়ে তারা খুব উত্তেজিত। সে ব্যাপারটা দেখার জন্য তাদের কাছে গেল। গিয়ে দেখল যে তারা একটি কচ্ছপকে কষ্ট দিচ্ছে। কোনো শিশু একদিক থেকে আরেক দিন টানা টানি করছিল, কেউ লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল এবং কচ্ছপের খোলসে পাথর দিয়ে আঘাত করছিল।
উরাশিমার সেই নিরীহ কচ্ছপটির জন্য খুব মায়া হলো এবং সে এটিকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিল। সে ছেলেদের বলল: ‘তোমরা শোনো, ছেলেরা, তোমরা এই কচ্ছপটির সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করছো যে এটি শিগগিরই মরে যাবে!’ ছেলেগুলো, যারা এমন বয়সের যখন শিশুরা প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখাতে আনন্দ পায় বলে মনে হয়, তারা উরাশিমার মৃদু তিরস্কারে কোনো মনোযোগ দিল না বরং আগের মতোই তাকে জ্বালাতন করতে লাগল। বড় ছেলেদের মধ্যে একজন উত্তর দিল: ‘কে পরোয়া করে যে এটি বাঁচে কি মরে? আমরা করি না। এই ছেলেরা, চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও!’ এবং তারা সেই নিরীহ কচ্ছপটির সঙ্গে আগের চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর ব্যবহার শুরু করল। উরাশিমা একমুহূর্ত অপেক্ষা করল, ছেলেদের সঙ্গে কীভাবে ভালো উপায়ে মোকাবিলা করা যায়, তা মনে মনে ভাবল।
সে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করবে যাতে তারা কচ্ছপটি তাকে দিয়ে দেয়, তাই সে তাদের দিকে হেসে বলল: ‘আমি নিশ্চিত যে তোমরা সবাই ভালো, দয়ালু ছেলে! এখন তোমরা কি আমাকে কচ্ছপটি দেবে না? এটি আমার খুব পছন্দ হবে!’
‘না, আমরা তোমাকে কচ্ছপটি দেব না,’ ছেলেদের মধ্যে একজন বলল। ‘কেন দেব? আমরা নিজেরাই এটিকে ধরেছি।’
‘তোমরা যা বলছো তা সত্যি,’ উরাশিমা বলল, ‘কিন্তু আমি তোমাদের এটি বিনা মূল্যে দিতে বলছি না। আমি এর জন্য তোমাদের কিছু টাকা দেব—অন্য কথায়, ওজিসান (কাকা/চাচা) তোমাদের কাছ থেকে এটি কিনে নেবে। এতে তোমাদের চলবে না, আমার ছেলেরা?’ সে তাদের দিকে টাকাগুলো তুলে ধরল, প্রতিটি মুদ্রার কেন্দ্রে একটি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে একটি সুতো গাঁথা ছিল। ‘দেখো ছেলেরা, তোমরা এই টাকা দিয়ে তোমাদের পছন্দের যেকোনো কিছু কিনতে পারবে। এই নিরীহ কচ্ছপটির চেয়ে এই টাকা দিয়ে তোমরা অনেক বেশি কিছু করতে পারবে। দেখো তোমরা আমার কথা শুনো কত ভালো ছেলে!’
ছেলেগুলো মোটেই খারাপ ছিল না, তারা কেবল দুষ্টু ছিল এবং উরাশিমা যখন কথা বলছিল, তারা তার বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি ও ভদ্র কথায় মুগ্ধ হলো এবং তারা ‘তার চেতনার’ (টু বি অব হিজ স্পিরিট) দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করল, যেমনটি জাপানে বলা হয়। ধীরে ধীরে তারা সবাই তার কাছে এগিয়ে এল, ছোট দলের নেতা কচ্ছপটি তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
ঠিক আছে ওজিসান, আপনি যদি আমাদের টাকা দেন, তবে আমরা আপনাকে কচ্ছপটি দেব! উরাশিমা কচ্ছপটি নিল আর ছেলেদের টাকা দিল, যারা একে অপরকে ডাকতে ডাকতে ছুটে গেল এবং শিগগিরই দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। তারপর উরাশিমা কচ্ছপটির পিঠে হাত বুলাল এবং এই সময় সে বলল: ‘ওহ, তুমি বেচারা প্রাণী! বেচারা প্রাণী! আহ, আহ! তুমি এখন নিরাপদ! লোকে বলে যে সারস এক হাজার বছর বাঁচে, কিন্তু কচ্ছপ দশ হাজার বছর। এই পৃথিবীতে সব প্রাণীর মধ্যে তোমার সবচেয়ে দীর্ঘ জীবন এবং সেই দুষ্টু ছেলেদের দ্বারা তোমার সেই মূল্যবান জীবন খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়ার বড় বিপদ ছিল। ভাগ্যক্রমে আমি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম এবং তোমাকে বাঁচিয়েছি, এবং তাই জীবন এখন তোমার। এখন আমি তোমাকে তোমার বাড়ি, সমুদ্রে এখনই ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি। নিজেকে আর যেন ধরা পড়তে দিও না। কারণ, পরেরবার হয়তো তোমাকে বাঁচানোর কেউ থাকবে না!’
এই দয়ালু জেলে যখন কথা বলছিল, তখন সে দ্রুত সমুদ্রের দিকে ও পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল; তারপর কচ্ছপটিকে জলের মধ্যে রেখে সে প্রাণীটিকে অদৃশ্য হতে দেখল, তারপর নিজেও বাড়ির দিকে ফিরল, কারণ সে ক্লান্ত ছিল এবং সূর্য অস্ত গিয়েছিল।
পরদিন সকালে উরাশিমা তার নৌকায় গেল। আবহাওয়া ভালো ছিল ও গ্রীষ্মের সকালের কোমল কুয়াশায় সমুদ্র এবং আকাশ উভয়ই নীল ও স্নিগ্ধ ছিল। উরাশিমা তার নৌকায় উঠল ও স্বপ্নালুভাবে সমুদ্রে রওনা হলো, সেই সময় তার মাছ ধরার সুতো ছুড়ে দিল। সে শিগিরই অন্য মাছ ধরার নৌকাগুলোকে অতিক্রম করল এবং সেগুলোকে তার পেছনে ফেলে দিল যতক্ষণ না তারা দূরে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, এবং তার নৌকা নীল জলের ওপরে আরও দূরে ভেসে চলল। কোনোভাবে সে জানে না কেন, সেই সকালে সে অস্বাভাবিকভাবে সুখী বোধ করছিল; এবং সে আগের দিন মুক্ত করে দেওয়া কচ্ছপটির মতো, তার নিজের স্বল্প মানব জীবনের পরিবর্তে হাজারো বছর বেঁচে থাকার ইচ্ছা দমন করতে পারল না।
হঠাৎ নিজের নাম ধরে ডাকা শুনে সে তার দিবাস্বপ্ন থেকে চমকে উঠল: ‘উরাশিমা, উরাশিমা!’ ঘণ্টার মতো পরিষ্কার এবং গ্রীষ্মের বাতাসের মতো নরমভাবে নামটি সমুদ্রের ওপর দিয়ে ভেসে এল। সে উঠে দাঁড়াল এবং সব দিকে তাকাল, ভাবল যে অন্য কোনো নৌকা হয়তো তাকে ধরে ফেলেছে, কিন্তু যতদূর সে তাকাল, কাছে বা দূরে, জলের সেই বিশাল বিস্তারে কোনো নৌকার চিহ্ন ছিল না, তাই কণ্ঠস্বর কোনো মানুষের কাছ থেকে আসতে পারত না।
চমকে গিয়ে এবং কে–বা কী তাকে এত স্পষ্ট করে ডেকেছিল তা ভেবে সে তার চারদিকে তাকাল এবং দেখল যে সে না জানতেই একটি কচ্ছপ নৌকার পাশে চলে এসেছে। উরাশিমা অবাক হয়ে দেখল যে এটি সেই কচ্ছপ, যাকে সে আগের দিন উদ্ধার করেছিল।
‘আচ্ছা, মিস্টার কচ্ছপ,’ উরাশিমা বলল, ‘এই মাত্র আমার নাম ধরে তুমিই ডেকেছিলে?’
কচ্ছপটি বেশ কয়েকবার মাথা নাড়ল এবং বলল: ‘হ্যাঁ, আমিই। গতকাল আপনার সম্মানের ছায়ায় আমার জীবন রক্ষা পেয়েছিল ও আমি আপনাকে আমার ধন্যবাদ জানাতে এবং আপনার দয়ার জন্য আমি কতটা কৃতজ্ঞ, তা জানাতে এসেছি।’
‘আসলেই,’ উরাশিমা বলল, ‘এটা আপনার খুব ভদ্রতা। নৌকায় উঠে আসুন। আমি আপনাকে একটু ধোঁয়া (তামাক) দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যেহেতু আপনি একটি কচ্ছপ, নিঃসন্দেহে আপনি ধূমপান করেন না,’ এবং জেলেটি ঠাট্টা করে হাসল।
‘হি-হি-হি-হি!’ কচ্ছপটি হাসল; ‘সাকে (চালের মদ) আমার প্রিয় পানীয়, তবে আমি তামাক পছন্দ করি না।’
‘আসলেই,’ উরাশিমা বলল, ‘আমি খুব দুঃখিত যে আমার নৌকায় আপনাকে দেওয়ার মতো কোনো সাকে নেই, তবে ওপরে উঠে এসে সূর্যের আলোয় আপনার পিঠ শুকিয়ে নিন—কচ্ছপরা সব সময় এটা করতে ভালোবাসে।’
তাই কচ্ছপটি নৌকায় উঠল, জেলে তাকে সাহায্য করল এবং কিছু প্রশংসামূলক বাক্যের আদান-প্রদানের পর কচ্ছপটি বলল:
‘আপনি কি কখনো রিন গিন, সমুদ্রের ড্রাগন কিং-এর প্রাসাদ দেখেছেন, উরাশিমা?’
জেলে মাথা নেড়ে উত্তর দিল; ‘না; বছর পর বছর সমুদ্রই আমার ঘর, কিন্তু যদিও আমি সমুদ্রের নিচে ড্রাগন কিং-এর রাজ্যের কথা অনেক শুনেছি, আমি এখনো সেই বিস্ময়কর স্থানটি দেখিনি। যদি এটির অস্তিত্ব থাকে তবে এটি অবশ্যই অনেক দূরে!’
‘সত্যিই কি তাই? আপনি কখনো সমুদ্র রাজার প্রাসাদ দেখেননি? তবে আপনি পুরো মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এটি সমুদ্রের একেবারে তলদেশে অনেক দূরে, কিন্তু আমি যদি আপনাকে সেখানে নিয়ে যাই তবে আমরা শিগগিরই সেখানে পৌঁছে যাব। আপনি যদি সমুদ্র রাজার দেশ দেখতে চান তবে আমি আপনার পথপ্রদর্শক হব। আমি সেখানে যেতে চাই, অবশ্যই, এবং আমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবার জন্য আপনি খুব দয়ালু, কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে যে আমি কেবল একজন সাধারণ মানুষ এবং আপনার মতো সমুদ্রের প্রাণীর মতো সাঁতার কাটার ক্ষমতা আমার নেই—’
জেলেটি আরও কিছু বলার আগেই কচ্ছপটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল:
‘কী? আপনাকে নিজে সাঁতার কাটতে হবে না। আপনি যদি আমার পিঠে চড়েন তবে আমি আপনার কোনো সমস্যা ছাড়াই আপনাকে নিয়ে যাব।’
‘কিন্তু,’ উরাশিমা বলল, ‘আপনার ছোট পিঠে আমার পক্ষে চড়া কীভাবে সম্ভব?’
‘এটা আপনার কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে, তবে আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি যে আপনি তা করতে পারবেন। এখনই চেষ্টা করুন! শুধু এসে আমার পিঠে চড়ুন, এবং দেখুন আপনি যেমন অসম্ভব মনে করেন এটি কি তেমনই!’
কচ্ছপটি কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে উরাশিমা তার খোলসের দিকে তাকাল, এবং অদ্ভুতভাবে সে দেখল যে প্রাণীটি হঠাৎ এত বড় হয়ে গেছে যে একজন মানুষ সহজেই তার পিঠে বসতে পারে।
‘এটা সত্যিই অদ্ভুত!’ উরাশিমা বলল; ‘মিস্টার কচ্ছপ, আপনার সদয় অনুমতিতে আমি আপনার পিঠে চড়ে বসব। দোকোইশো!’ সে লাফ দিয়ে ওঠার সময় চিৎকার করে উঠল।
কচ্ছপটি অবিচল মুখে, যেন এই অদ্ভুত প্রক্রিয়াটি একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ঘটনা, বলল:
‘এখন আমরা ধীরেসুস্থে যাত্রা শুরু করব,’ এবং এই কথাগুলো বলেই সে উরাশিমাকে তার পিঠে নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিল। জলের মধ্য দিয়ে কচ্ছপটি ডুব দিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই অদ্ভুত সঙ্গী সমুদ্রের মধ্য দিয়ে যাত্রা করল। উরাশিমা কখনো ক্লান্ত হলো না, বা তার পোশাকও জলে ভিজে গেল না। অবশেষে, দূরে, দিগন্তে একটি দুর্দান্ত ফটক দেখা গেল, এবং ফটকের পেছনে একটি প্রাসাদের দীর্ঘ, ঢালু ছাদ দেখা গেল।
ইয়া, উরাশিমা চিৎকার করে উঠল, ওই তো কোনো বড় প্রাসাদের ফটকের মতো কিছু দেখা যাচ্ছে! মিস্টার কচ্ছপ, আপনি কি বলতে পারেন যে আমরা এখন যে জায়গাটি দেখতে পাচ্ছি তা কী? ওটি হলো রিন গিন প্রাসাদের বিশাল ফটক, ফটকের পেছনে আপনি যে বড় ছাদটি দেখছেন সেটি হল সমুদ্র রাজার প্রাসাদ।’
‘তাহলে আমরা অবশেষে সমুদ্র রাজার রাজ্যে এবং তাঁর প্রাসাদে এসে গেছি,’ উরাশিমা বলল।
‘হ্যাঁ, অবশ্যই,’ কচ্ছপটি উত্তর দিল, ‘এবং আপনি কি মনে করেন না যে আমরা খুব দ্রুত এসেছি?’ এবং সে কথা বলার সময় কচ্ছপটি ফটকের পাশে এসে পৌঁছাল। ‘এবং এই আমরা এসে গেছি, এবং এখান থেকে আপনাকে হেঁটে যেতে হবে।’
কচ্ছপটি এবার সামনে গেল, এবং ফটক রক্ষকের সঙ্গে কথা বলে বলল:
‘ইনি হলেন উরাশিমা তারো, জাপানের দেশ থেকে এসেছেন। আমি এই রাজ্যে একজন অতিথি হিসেবে তাকে নিয়ে আসার সম্মান পেয়েছি। দয়া করে তাকে পথ দেখান।’
তখন ফটকরক্ষক, যিনি ছিলেন একটি মাছ, সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামনে দিয়ে ফটকের মধ্য দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন।
লাল ব্রিম, ফ্লাউন্ডার, সোল, ক্যাটলফিশ ও সমুদ্রের ড্রাগন কিং-এর প্রধান সামন্তরা সবাই বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করে এই অপরিচিত ব্যক্তিকে স্বাগত জানাতে বেরিয়ে এল। উরাশিমা সামা, উরাশিমা সামা! সমুদ্র প্রাসাদে আপনাকে স্বাগত, সমুদ্রের ড্রাগন কিং-এর বাড়িতে। আপনি এত দূর দেশ থেকে এসেছেন, আপনাকে তিনবার স্বাগত। এবং আপনি, মিস্টার কচ্ছপ, উরাশিমাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য আপনার সব কষ্টের জন্য আমরা আপনার কাছে অত্যন্ত ঋণী। তারপর, আবার উরাশিমার দিকে ফিরে তারা বলল, ‘দয়া করে এই পথে আমাদের অনুসরণ করুন,’ এবং এখান থেকে মাছের পুরো দলটি তার পথপ্রদর্শক হয়ে উঠল।
উরাশিমা, কেবল একজন দরিদ্র জেলে ছেলে হওয়ায়, সে জানত না যে একটি প্রাসাদে কীভাবে আচরণ করতে হয়; কিন্তু যদিও তার কাছে সবকিছুই অদ্ভুত ছিল, সে লজ্জিত বা বিব্রত বোধ করল না বরং বেশ শান্তভাবে তার দয়ালু পথপ্রদর্শকদের অনুসরণ করল যেখানে তারা তাকে ভেতরের প্রাসাদে নিয়ে গেল। যখন সে প্রবেশদ্বারগুলোতে পৌঁছাল, তখন একজন সুন্দরী রাজকুমারী তাঁর পরিচারিকাদের নিয়ে তাকে স্বাগত জানাতে বেরিয়ে এলেন। তিনি সুন্দরী ছিলেন এবং লাল ও নরম সবুজ রঙের মতো পোশাক পরেছিলেন, যা ঢেউয়ের নিচের দিকের মতো এবং তার গাউনের ভাঁজের মধ্যে সোনার সুতো চিকচিক করছিল। তাঁর সুন্দর কালো চুল বহু শত বছর আগের রাজার কন্যার ফ্যাশনে তাঁর কাঁধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, এবং যখন তিনি কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা সংগীতের মতো শোনাচ্ছিল। উরাশিমা তাঁকে দেখতে দেখতে বিস্ময়ে হারিয়ে গেল, এবং সে কথা বলতে পারল না। তারপর তার মনে পড়ল যে তার মাথা নত করা উচিত, কিন্তু সে পুরোপুরি ঝুঁকে প্রণাম করার আগেই রাজকুমারী তার হাত ধরলেন এবং তাকে একটি সুন্দর হলঘরে নিয়ে গেলেন, এবং ওপরের প্রান্তে সম্মানের আসনে নিয়ে গেলেন, এবং তাকে বসতে বললেন।
‘উরাশিমা তারো, আমার বাবার রাজ্যে আপনাকে স্বাগত জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত,’ রাজকুমারী বললেন। ‘গতকাল আপনি একটি কচ্ছপকে মুক্ত করেছিলেন, এবং আমার জীবন বাঁচানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে আমি আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি, কারণ আমিই ছিলাম সেই কচ্ছপ। এখন আপনি যদি চান তবে আপনি এখানে চিরন্তন তারুণ্যের দেশে চিরকাল বাস করতে পারেন, যেখানে গ্রীষ্ম কখনো মরে না এবং যেখানে দুঃখ কখনো আসে না, এবং আপনি যদি চান তবে আমি আপনার বধূ হব, এবং আমরা তারপর চিরকাল সুখে–শান্তিতে বসবাস করব!’
এবং উরাশিমা যখন তাঁর মিষ্টি কথা শুনছিল এবং তাঁর সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন তার হৃদয় এক মহান বিস্ময় ও আনন্দে ভরে উঠল, এবং সে উত্তর দিল, এটি কোনো স্বপ্ন নয় তো, তা ভেবে: ‘আপনার দয়ালু কথার জন্য আপনাকে হাজার হাজার ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে এই সুন্দর দেশে থাকতে পারার চেয়ে বেশি কিছু আমি আর চাইতে পারি না, যার কথা আমি প্রায়ই শুনেছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত দেখিনি। সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আমি এই পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে বিস্ময়কর স্থান এটি।’
রাজকুমারী কথা বলার সময়, মাছের একটি শোভাযাত্রা উপস্থিত হলো, সবাই আনুষ্ঠানিক, দীর্ঘ পোশাক পরে ছিল। একে একে, নিঃশব্দে এবং রাজকীয় পদক্ষেপে, তারা হলে প্রবেশ করল, প্রবালের থালায় মাছ এবং সমুদ্র-শৈবালের সুস্বাদু খাবার বহন করে, যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না, এবং এই আশ্চর্য ভোজটি বর ও কনের সামনে পরিবেশন করা হলো। বিবাহটি ছিল ঝলমলে জাঁকজমকপূর্ণ, এবং সমুদ্র রাজার রাজ্যে ছিল মহা আনন্দ। তরুণ দম্পতি যখন বিয়ের মদের পেয়ালায় তিনবার করে প্রতিজ্ঞা করলেন, তখন সংগীত বাজানো হলো এবং গান গাওয়া হলো, এবং রুপালি আঁশ ও সোনালি লেজযুক্ত মাছেরা ঢেউ থেকে লাফিয়ে এসে নাচ করল। উরাশিমা মন ভরে আনন্দ উপভোগ করল। তার পুরো জীবনে সে এমন কোনো অসাধারণ ভোজে বসেনি।
ভোজ শেষ হওয়ার পর রাজকুমারী বরকে জিজ্ঞাসা করলেন যে সে প্রাসাদের মধ্য দিয়ে হেঁটে সবকিছু দেখতে চায় কি না। তখন সেই সুখী জেলে, তার বধূ, সমুদ্র রাজার কন্যাকে অনুসরণ করে, সেই মায়াবী দেশের সমস্ত বিস্ময় দেখতে পেল যেখানে তারুণ্য এবং আনন্দ হাত ধরাধরি করে চলে এবং যেখানে সময় বা বার্ধক্য তাদের স্পর্শ করতে পারে না। প্রাসাদটি প্রবাল দিয়ে তৈরি এবং মুক্তা দিয়ে সজ্জিত ছিল, এবং স্থানটির সৌন্দর্য ও বিস্ময় এতটাই দুর্দান্ত ছিল যে ভাষায় তা বর্ণনা করা যায় না।
কিন্তু উরাশিমার কাছে, প্রাসাদের চেয়েও বেশি বিস্ময়কর ছিল এটিকে ঘিরে থাকা বাগান। এখানে একই সঙ্গে চারটি ভিন্ন ঋতুর দৃশ্য দেখা যেত; গ্রীষ্ম ও শীত, বসন্ত ও শরতের সৌন্দর্য একই সঙ্গে সেই বিস্মিত দর্শকের সামনে প্রদর্শিত হচ্ছিল।
প্রথমত, যখন সে পূর্ব দিকে তাকাল, তখন সে দেখল যে প্লাম এবং চেরিগাছগুলো ফুলে ভরা, গোলাপি পথ ধরে নাইটিংগেল পাখি গাইছিল, আর প্রজাপতিরা ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছিল। দক্ষিণে তাকালে গ্রীষ্মের পূর্ণতায় সমস্ত গাছ ছিল সবুজ, এবং দিনের সিকালা ও রাতের ঝিঁঝি পোকা জোরে ডাকছিল। পশ্চিমে তাকালে শরতের ম্যাপলগাছগুলো সূর্যাস্তের আকাশের মতো জ্বলজ্বল করছিল, আর ক্রিস্যান্থেমাম ফুলগুলো ছিল নিখুঁত। উত্তরে তাকালে পরিবর্তন দেখে উরাশিমা চমকে উঠল, কারণ ভূমি ছিল বরফে রুপালি সাদা, এবং গাছপালা ও বাঁশও বরফে ঢাকা ছিল এবং পুকুরটি ছিল বরফের মতো ঘন।
এবং প্রতিদিন উরাশিমার জন্য নতুন আনন্দ ও নতুন বিস্ময় ছিল, এবং তার সুখ এত বেশি ছিল যে সে সবকিছু ভুলে গিয়েছিল, এমনকি যে বাড়ি সে পেছনে ফেলে এসেছিল, তার বাবা-মা এবং তার নিজের দেশও, এবং তিন দিন কেটে গেল তার ফেলে আসা কোনো কিছুর কথা চিন্তা না করেই। তারপর তার মনে সব ফিরে এল এবং তার মনে পড়ল যে সে কে, এবং সে এই বিস্ময়কর দেশ বা সমুদ্র রাজার প্রাসাদের নয়, এবং সে নিজেকে বলল:
‘ওহ প্রিয়! আমার এখানে থাকা উচিত নয়, কারণ বাড়িতে আমার একজন বৃদ্ধ বাবা ও মা আছেন। এতদিনে তাঁদের কী হয়েছে? আমি যখন স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসিনি, তখন এই দিনগুলোতে তাঁরা নিশ্চয়ই খুব উদ্বিগ্ন হয়েছেন। আর একটি দিনও না কাটিয়ে আমার এখনই ফিরে যেতে হবে।’ এবং সে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করল।
তারপর সে তার সুন্দরী স্ত্রী, রাজকুমারীর কাছে গেল, এবং তার সামনে মাথা নত করে বলল:
‘আসলেই, আমি আপনার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে খুব সুখী ছিলাম, ওতোহিমে সামা (কারণ এটিই ছিল তার নাম), এবং আপনি আমার প্রতি যেকোনো কথার চেয়ে বেশি সদয় ছিলেন। কিন্তু এখন আমাকে বিদায় জানাতে হবে। আমাকে আমার বৃদ্ধ মা–বাবার কাছে ফিরে যেতে হবে।’
তখন ওতোহিমে সামা কাঁদতে শুরু করলেন, এবং নরমভাবে ও দুঃখের সঙ্গে বললেন:
‘এখানে কি আপনার ভালো লাগছে না, উরাশিমা, যে আপনি এত তাড়াতাড়ি আমাকে ছেড়ে যেতে চান? এত তাড়া কিসের? আর শুধু একটি দিন আমার সঙ্গে থাকুন!’
কিন্তু উরাশিমার তার বৃদ্ধ মা–বাবার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল, এবং জাপানে মা–বাবার প্রতি কর্তব্য অন্য সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী, এমনকি আনন্দ বা ভালোবাসার চেয়েও শক্তিশালী, এবং সে প্ররোচিত হলো না, বরং উত্তর দিল:
‘আসলেই, আমাকে যেতে হবে। আপনি মনে করবেন না যে আমি আপনাকে ছেড়ে যেতে চাই। ব্যাপারটা তা নয়। আমাকে গিয়ে আমার বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখতে হবে। আমাকে এক দিনের জন্য যেতে দিন এবং আমি আপনার কাছে ফিরে আসব।’
‘তাহলে,’ রাজকুমারী দুঃখের সঙ্গে বললেন, ‘কিছুই করার নেই। আমি আপনাকে আজ আপনার মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেব, এবং আপনাকে আমার কাছে আরও একটি দিন রাখার চেষ্টা করার পরিবর্তে, আমি আপনাকে আমাদের ভালোবাসার প্রতীক হিসাবে এই উপহারটি দেব—দয়া করে এটি আপনার সঙ্গে নিয়ে যান;’ এবং তিনি তাকে একটি সুন্দর ল্যাকার করা বাক্স এনে দিলেন, যা একটি রেশমের সুতো ও লাল রেশমের ঝুমকো দিয়ে বাঁধা ছিল।
উরাশিমা রাজকুমারীর কাছ থেকে ইতিমধ্যে এত কিছু পেয়েছিল যে এই উপহারটি নিতে তার কিছুটা দ্বিধা হয়েছিল, এবং সে বলল:
‘আপনার কাছ থেকে এত অনুগ্রহ পাওয়ার পরেও আপনার কাছ থেকে আরও একটি উপহার নেওয়া আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে না, তবে যেহেতু এটি আপনার ইচ্ছা, আমি তা করব,’ এবং তারপর সে যোগ করল:
‘আমাকে বলুন এই বাক্সটি কী?’
‘ওটি,’ রাজকুমারী উত্তর দিলেন, ‘হল তামাতে-বাকো (মণির হাতের বাক্স), এবং এতে খুব মূল্যবান কিছু আছে। যা–ই ঘটুক না কেন, আপনি এই বাক্সটি খুলবেন না! আপনি যদি এটি খোলেন তবে আপনার ভয়ানক কিছু ঘটবে! এখন আমাকে কথা দিন যে আপনি এই বাক্সটি কখনোই খুলবেন না!’ এবং উরাশিমা প্রতিশ্রুতি দিল যে যা–ই ঘটুক না কেন সে কখনোই বাক্সটি খুলবে না। তারপর ওতোহিমে সামাকে বিদায় জানিয়ে সে সমুদ্রের তীরে গেলেন, রাজকুমারী ও তাঁর পরিচারিকারা তাকে অনুসরণ করলেন, এবং সেখানে সে তার জন্য অপেক্ষা করা একটি বিশাল কচ্ছপ দেখতে পেল।
সে দ্রুত প্রাণীটির পিঠে চড়ে বসল এবং ঢেউয়ের ওপর দিয়ে পূর্ব দিকে চলে গেল। সে ওতোহিমে সামাকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতে পেছনে তাকাল যতক্ষণ না সে আর তাকে দেখতে পেল না, এবং সমুদ্র রাজার দেশ ও সেই বিস্ময়কর প্রাসাদের ছাদগুলো বহু দূরে হারিয়ে গেল। তারপর, নিজের দেশের দিকে আগ্রহের সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে, সে তার সামনে দিগন্তে নীল পাহাড়ের উত্থানের জন্য অপেক্ষা করল। অবশেষে কচ্ছপটি তাকে সেই উপসাগরে নিয়ে গেল যা সে খুব ভালোভাবে জানত, এবং যেখান থেকে সে যাত্রা শুরু করেছিল সেই তীরে নিয়ে গেল। সে তীরে নামল এবং তার চারদিকে তাকাল যখন কচ্ছপটি সমুদ্র রাজার রাজ্যে ফিরে যেতে চলে গেল।
কিন্তু উরাশিমা যখন দাঁড়িয়ে তার চারপাশে তাকাল তখন তাকে কী এক অদ্ভুত ভয় গ্রাস করল? কেন সে তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকেদের দিকে এত স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে, এবং কেন তারা ঘুরে তাকে দেখছে? সমুদ্রসৈকত একই এবং পাহাড়গুলোও একই, কিন্তু সে যে লোকেদের হেঁটে যেতে দেখছে তাদের মুখগুলো সে আগে যাদের খুব ভালোভাবে চিনত তাদের থেকে খুব আলাদা। এর মানে কী হতে পারে তা ভেবে সে দ্রুত তার পুরোনো বাড়ির দিকে হেঁটে গেল। এমনকি সেটিও আলাদা দেখাচ্ছিল, কিন্তু সেই জায়গায় একটি বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, এবং সে চিৎকার করে বলল:
‘বাবা, আমি এইমাত্র ফিরে এসেছি!’ এবং সে ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল, যখন সে দেখল একজন অপরিচিত লোক বেরিয়ে আসছে। ‘হয়তো আমি দূরে থাকার সময় আমার মা–বাবা স্থানান্তরিত হয়েছেন, এবং অন্য কোথাও চলে গেছেন,’ জেলেটি ভাবল। কোনোভাবে সে অদ্ভুতভাবে উদ্বিগ্ন বোধ করতে শুরু করল, সে বলতে পারল না কেন।
‘ক্ষমা করবেন,’ সে লোকটিকে বলল, যে তার দিকে তাকিয়ে ছিল, ‘তবে গত কয়েক দিন আগপর্যন্ত আমি এই বাড়িতে থাকতাম। আমার নাম উরাশিমা তারো। আমি এখানে যাদের রেখে গিয়েছিলাম, আমার মা–বাবা কোথায় গেছেন?’
লোকটির মুখে খুব হতভম্ব অভিব্যক্তি দেখা গেল, এবং উরাশিমার মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল:
‘কী? আপনি উরাশিমা তারো?’
‘হ্যাঁ,’ জেলেটি বলল,‘আমি উরাশিমা তারো!’
‘হা, হা!’ লোকটি হাসল,‘আপনি এমন রসিকতা করবেন না। এটা সত্যি যে একসময় উরাশিমা তারো নামে একজন লোক এই গ্রামে বাস করত, কিন্তু সেই গল্প তিন শ বছর পুরোনো। সে এখন জীবিত থাকতে পারে না!’
উরাশিমা এই অদ্ভুত কথাগুলো শুনে ভয় পেয়ে গেল, এবং বলল:
‘দয়া করে, দয়া করে, আপনি আমার সঙ্গে রসিকতা করবেন না, আমি খুব বিভ্রান্ত। আমি সত্যিই উরাশিমা তারো, এবং আমি নিশ্চিত যে আমি তিন শ বছর বাঁচিনি। চার বা পাঁচ দিন আগে পর্যন্ত আমি এই জায়গায় থাকতাম। দয়া করে আর রসিকতা না করে আমি যা জানতে চাই তা বলুন।’
কিন্তু লোকটির মুখ আরও বেশি গম্ভীর হলো, এবং সে উত্তর দিল:
‘আপনি উরাশিমা তারো হতেও পারেন বা না হতে পারেন, আমি জানি না। তবে উরাশিমা তারো যার কথা আমি শুনেছি সে এমন একজন লোক যে তিন শ বছর আগে বাস করত। হয়তো আপনি আপনার পুরোনো বাড়িতে ফিরে আসা তার আত্মা?’
‘আপনি আমাকে উপহাস করছেন কেন?’ উরাশিমা বলল। ‘আমি কোনো আত্মা নই! আমি একজন জীবিত মানুষ—আপনি আমার পা দেখতে পাচ্ছেন না;’ এবং ‘ডন-ডন,’ সে মাটিতে আঘাত করল, প্রথমে এক পা দিয়ে এবং তারপর অন্য পা দিয়ে লোকটিকে দেখানোর জন্য। (জাপানি ভূতদের পা থাকে না।)
‘কিন্তু উরাশিমা তারো তিন শ বছর আগে বাস করত, আমি শুধু এটুকুই জানি; এটি গ্রামের ইতিহাসে লেখা আছে,’ লোকটি জোর দিয়ে বলল, যে জেলেটির কথা বিশ্বাস করতে পারছিল না।
উরাশিমা হতবুদ্ধি ও সমস্যায় পড়ে গেল। সে তার চারপাশে তাকাল, ভয়ংকরভাবে বিভ্রান্ত, এবং সত্যিই, সবকিছুর চেহারাতে এমন কিছু ছিল যা সে চলে যাওয়ার আগে যা মনে রেখেছিল তার থেকে ভিন্ন, এবং তার মনে একটি ভয়ানক অনুভূতি এল যে লোকটি যা বলছে তা হয়তো সত্যি। সে যেন এক অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে ছিল। সমুদ্রের ওপারের সমুদ্র রাজার প্রাসাদে সে যে কয়েক দিন কাটিয়েছিল তা মোটেই দিন ছিল না: সেগুলো ছিল শত শত বছর, এবং এই সময়ে তার মা–বাবা ও সে যাদের চিনত তারা সবাই মারা গিয়েছিল, এবং গ্রাম তার গল্প লিখে রেখেছিল। এখানে আর থাকার কোনো লাভ নেই। তাকে সমুদ্রের ওপারে তার সুন্দরী স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে হবে।
রাজকুমারী তাকে যে বাক্সটি দিয়েছিলেন, সেটি হাতে নিয়ে সে সমুদ্রসৈকতে ফিরে গেল। কিন্তু পথ কোনটি? সে একা খুঁজে পাচ্ছিল না! হঠাৎ তার বাক্সের কথা মনে পড়ল, সেই তামাতে-বাকো।
‘রাজকুমারী আমাকে যখন বাক্সটি দিয়েছিলেন তখন বলেছিলেন এটি কখনো না খুলতে—যে এতে খুব মূল্যবান কিছু আছে। কিন্তু এখন যখন আমার কোনো বাড়ি নেই, যখন আমার এখানে প্রিয় সবকিছু হারিয়ে গেছে, এবং দুঃখে আমার হৃদয় ক্ষীণ হয়ে আসছে, এমন সময়, যদি আমি বাক্সটি খুলি, তবে অবশ্যই আমি এমন কিছু খুঁজে পাব যা আমাকে সাহায্য করবে, এমন কিছু যা আমাকে সমুদ্রের ওপারের আমার সুন্দরী রাজকুমারীর কাছে ফিরে যাওয়ার পথ দেখাবে। এখন আমার আর কিছু করার নেই। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি বাক্সটি খুলব এবং ভেতরে দেখব!’
এবং এইভাবে তার হৃদয় এই অবাধ্যতার কাজে সম্মতি দিল, এবং সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সঠিক কাজটি করছে।
ধীরে ধীরে, খুব ধীরে ধীরে, সে লাল রেশমের সুতোটি খুলল, ধীরে ধীরে এবং বিস্ময়ের সঙ্গে সে মূল্যবান বাক্সের ঢাকনাটি তুলল। এবং সে কী পেল? অদ্ভুতভাবে বলতে গেলে কেবল একটি সুন্দর ছোট বেগুনি মেঘ তিনটি নরম ধোঁয়ার মতো বাক্স থেকে উঠল। একমুহূর্তের জন্য এটি তার মুখ ঢেকে দিল এবং যেতে অনিচ্ছুক হয়ে তার ওপর দোলা দিল, এবং তারপর এটি বাষ্পের মতো সমুদ্রের ওপর দিয়ে ভেসে গেল।
উরাশিমা, যে সেই মুহূর্ত পর্যন্ত চব্বিশ বছর বয়সী একজন শক্তিশালী এবং সুদর্শন যুবকের মতো ছিল, সে হঠাৎ খুব, খুব বৃদ্ধ হয়ে গেল। তার পিঠ বয়সের ভারে বেঁকে গেল, তার চুল বরফের মতো সাদা হয়ে গেল, তার মুখ কুঁচকে গেল এবং সে সৈকতে মৃত অবস্থায় পড়ে গেল।
আহ্ উরাশিমা! তার অবাধ্যতার কারণে সে আর কখনোই সমুদ্র রাজার রাজ্যে বা সমুদ্রের ওপারের সুন্দরী রাজকুমারীর কাছে ফিরে যেতে পারেনি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]