ভালোবাসায় বন্দী
টেলিফোনের শব্দে সাবরিনার ঘুম ভেঙে গেল। মোবাইল বন্ধ ছিল।
ছোট চাচুর ফোন—কোথায় ছিলি? ফোন ধরিস না!
সাবরিনা লজ্জা পেল। আসলেই এত দেরি হয়ে গেছে। ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি বলো চাচু, দেরিতে ঘুমালে যা হয়!
তুই ক্লাসে যা, সময় পেলে চলে আয়, গল্প করা যাবে।
ছোট চাচুর কথা সাবরিনা কখনোই ফেলতে পারে না। ছোটবেলা থেকে চাচুর সঙ্গে অনেক সুন্দর সম্পর্ক। বয়সের পার্থক্য মাত্র ১০ বছরের। তার ওপরে চাচুর বন্ধুকেই সাবরিনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে বেঁধে দিলেন আব্বু। সেই থেকে ওখানে যায় সাবরিনা। কিন্তু আজকে একাই যাবে। স্বামী এই মুহূর্তে দেশের বাইরে।
গতকালের রান্না করা কিছু ভেজে রাখা কাবাব একটা বক্সে ভরে সঙ্গে নিল। ভার্সিটিতে গিয়ে আনিসার সঙ্গে কমনরুমে দেখা। মেয়েটা দেশের বাইরে বড় হয়েছে। তাই সাবরিনার কৌতূহল অনেক। বিভিন্ন সময় জিজ্ঞাসা করে আনিসার মতামত। তারা টিউটরিয়াল ক্লাসে একসঙ্গে গিয়ে ঢুকল। স্যার ঠিক সময়মতো আসেন। ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ডিজিটাল ওয়েব ডিজাইনের ক্লাসও বন্ধ, সবাই হইচই করে গল্প শুরু করে দিল। টিচার নতুন মুখ দেখে আনিসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ক্লাস আর ভার্সিটি কেমন লাগছে?
সবাই অনেক মিশুক আর সবার মধ্যেই অনেক একতা, আনিসা বলল।
এই যে ‘একতা’ বললেন, কীভাবে মনে হলো? স্যারের প্রশ্ন।
এই মুহূর্তে সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছে, আগে কখনো দেখিনি, আনিসা বলল।
এটা খুবই পজিটিভ। আপনি ব্যাপারটাকে এভাবে দেখলেন। এক ভাষা, একই কৃষ্টি, একতা তো আছেই।
সাবরিনা মনে মনে হাসল। স্যার কিন্তু অনেক বুদ্ধিমান। এই ‘একতা’ই নেই, সবাই কেমন পরস্পরের শত্রুর মতো। অথচ গল্প আর অস্থিরতাকে আনিসার এভাবে একতা হিসেবে দেখাটাও একটু মজা লাগল। সাবরিনা আবার কমনরুমে আনিসার পাশে বসল। ওর মা নার্স। ওরা ওমান থেকে ফিরে এসেছে। ছোটবেলায় আনিসার বাবার মৃত্যু হয় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। সে অনেক হাশিখুশি একটা মেয়ে। সাবরিনার হঠাৎ মনে হলো, চাচুর বাসায় ওকে নিয়ে গেলে কেমন হয়! এখন আমি চাচার বাসায় যাব। তুমি চাইলে সঙ্গে যেতে পারো—আনিসাকে বলল সাবরিনা।
আমার আসলেই কোথাও বেড়ানোর জায়গা নেই, আম্মাকে জিজ্ঞাসা করে দেখি।
আনিসা তার মাকে ফোন দিল—আমার বান্ধবীর সঙ্গে তার চাচার বাসায় কি যাব?
কতক্ষণ?
এক ঘণ্টার জন্য, সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব। ক্লাস না হওয়ার কারণে বেশি বাজে না।
আনিসাকে সঙ্গে নিয়ে চাচার বাসায় পৌঁছে যাওয়ার পর সাবরিনা দেখল মুখটা বেশ অন্ধকার আনিসার। চাচু তো কাবাব দেখে খুব খুশি। বলল, চা বানা আমার জন্য। আপনিও চা খাবেন আনিসা?
আনিসা কোনোরকম মাথা নাড়াল।
রান্নাঘরে যাওয়ার সময় সাবরিনা ওকে ডাকল। কিন্তু জড়সড় হয়ে বসেই থাকল আনিসা। সাবরিনা ঠিক বুঝতে পারল না।
চাচা জিজ্ঞেস করল, আপনার কথা শুনেছি। ওমান থেকে কত দিন হলো এসেছেন?
আনিসা বলল, ছয় মাস।
একুশে ফেব্রুয়ারিতে কি শহীদ মিনারে যাওয়ার ইচ্ছা আছে?
সাবরিনা যাবে? জিজ্ঞাসা করল আনিসা। তারপর কী ভেবে বলে উঠল, অনেক ভিড় আর ফুল দেওয়া, এটা যেন কেমন মনে হচ্ছে!
সাবরিনা চা আর কিছু খাবার নিয়ে ঢুকল।
এটা বাঙালির আবেগ আর কৃষ্টি। না, আমি যাব না, গন্ডগোলও হয় মাঝেমধ্যে।
চাচা বলল, আমি সঙ্গে যেতে পারি চাইলে।
সাবরিনা চুপ করে গেল। আনিসা বলে উঠল—
ভাষা নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, তাহলে ইংরেজি স্কুলে দেশ কেন ভরা?
চাচা বলল, ইংরেজি ভাষা ছাড়া কোনো কাজই চলে না। আর অসুবিধা কোথায়, যদি আমরা সব ভাষাকে ভালোবাসি!
আনিসা একটু খেপে বলে উঠল, হ্যাঁ, এই ভালোবাসায় আমরা বলি, ‘বাট’ আর ‘সো’। এখানেই ফাইস্যা গেছি।
সাবরিনা আর হাসি চাপতে পারল না।
চাচা কাবাব মুখে দিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু আপনি এ রকম মুড অফ করে আছেন কেন?
সাবরিনা একটু বিব্রত হয়ে বলল, আহ চাচু!
আনিসা বলল, এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম আপনি একজন বয়স্ক মানুষ, তাই আম্মা এখানে আসতে নিষেধ করেননি। এ কথা বলে আনিসা নিজেই অনেক জোরে হেসে উঠল।