বর্তমান হাম্পির যা কিছু দর্শনীয়, তা মূলত বিজয়নগর রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ। ১৪ শতকে ভিন্ন ভিন্ন শাসকের অধীন থাকা বিজয়নগর রাজ্যের রাজধানী ছিল এ হাম্পি। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীন সময়ই ছিল এ রাজ্যের জন্য স্বর্ণযুগ। সে সময়ই নির্মিত হয়েছিল কারুকার্যখচিত প্রাসাদ, মন্দির, মূর্তি ইত্যাদি।

১৫৬৫ সালে বিজয়নগরের সর্বশেষ হিন্দু সাম্রাজ্যের পতন হয়। তারপর এ হাম্পি চলে যায় মুসলিম সুলতান বাহিনীর দখলে। পতন সুনিশ্চিত হওয়ার আগে সুলতানদের সঙ্গে একাধিক যুদ্ধে লড়েছে বিজয়নগরের এ সাম্রাজ্য। তবে শেষরক্ষা আর হয়নি। হাম্পির মনোমুগ্ধকর স্থাপনাগুলো অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। এসব ধ্বংসাবশেষ এখনো সগৌরবে জানান দেয় এর প্রাচুর্যভরা ইতিহাস এবং উচ্চস্তরের ধর্মীয় মুলোবোধের চর্চা। হাম্পি সে যুগের ধনী শহর হিসেবেও স্বীকৃত, সে সুবাদেই খুব সম্ভবত পর্তুগিজ ও পারস্যের ব্যবসায়ীরা শহরটির প্রতি আকৃষ্ট ছিল খুব। মধ্যযুগের তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম এ হাম্পি পরিচিত ছিল পম্পাক্ষেত্র নামেও।

১৯৮৬ সালে হাম্পি ইউনেসকো হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ৪৬ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাম্পির পর্বতমালা। হাম্পির এসব স্থাপনার মূল উপাদান গ্রানাইট পাথর, যে পাথর সে সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল চারপাশে ঘিরে থাকা অন্যান্য পাহাড় থেকে। সমস্ত হাম্পিই যেন যত্ন করে গড়া এক অনবদ্য স্থাপনা। এসব স্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো মনোথেলিক, বিশেষ করে মন্দিরের বিগ্রহ এবং দেয়াল ও ছাদজুড়ে নিপুণ কারুকার্য। মধ্যযুগের প্রাচুর্যভরা সাম্রাজ্য এখন দাঁড়িয়ে আছে এক পিছিয়ে পড়া জনপদ হিসেবে। তবে সেই সব ধ্বংসাবশেষের পর্যটনমূল্য বেড়ে গেছে কয়েক গুণ, দেশ-বিদেশির হাজারো পর্যটক ভিড় করেন প্রতিবছর এই শহরে, মুগ্ধ করে নিজের অভূতপূর্ব নিপুণ কারুকার্যে।

হাম্পিকে মূলত দুটি অংশে ভাগ করা যায়। এক. বাজার ঘিরে ধর্মীয় চত্বর, যার মধ্যে রয়েছে বিজয়বিট্টল মন্দির, কৃষ্ণমন্দির, একশিলা লক্ষ্মীনরসিংহ মূর্তি ইত্যাদি। দুই. কমলাপুরমে রাজকীয় চত্বর, যার মধ্যে রয়েছে প্রাসাদ, জেনানামহল, রানির স্নানাগার, হাতিশালা, হাজার রামমন্দির ইত্যাদি।

ইউনেসকো হেরিটেজ সাইটের তালিকাভুক্ত বিজয়ভিট্টল মন্দির নির্মিত হয় ষষ্ঠদশ শতকে রাজা কৃষ্ণদেব রাওয়ের রাজত্বকালে। মন্দির ঘিরে রয়েছে উঁচু প্রাচীর। সমস্ত মন্দিরের দেয়াল ও স্তম্ভের পাথুরে গায়ে খোদাই করা রয়েছে সেনাদল, যুদ্ধহস্তী, নর্তকীর অবয়ব। এ মন্দিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারুকার্যমণ্ডিত মনোলিথিক থাম এবং ছোট স্তম্ভ দিয়ে তৈরি আয়তাকার সংগীতস্তম্ভ। স্তম্ভগুলোয় সামান্য আঘাত করলেই সুর ছড়ায়। অধিকাংশ স্তম্ভের সেই সুর ধ্বংস হয়ে গেলেও জানা যায়, এখনো আটটি স্তম্ভ থেকে ভেসে আসে জলতরঙ্গ, সপ্তস্বরা, ডমরু প্রভৃতির মুগ্ধ সুর। মূল মন্দিরের সামনেই হাম্পির বিখ্যাত পাথরের রথ। পাথরেই খোদাই করে তৈরি করা আস্ত রথ। ভারতের পঞ্চাশ রুপির নোটে যে চিত্র দেখা যায়, তা এই পাথুরের রথেরই।

বিজয়বিট্টল মন্দিরের মুগ্ধতা কাটিয়ে এবারের যাত্রা পরের গন্তব্যে। যাত্রাপথে যত দূর চোখ যাবে, সবটাই উঁচু–নিচু ছোট–বড় একপাথুরে শিল্পনগরী। হাম্পির প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ধর্মীয় ভাস্কর্য, পৌর ভাস্কর্য, প্রতিরক্ষা ভাস্কর্য। সুর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি মোটামুটি খোলা থাকে সমস্ত স্থাপনাই। এবারে গন্তব্য কুইন্স বাথ, এখানে রানিরা স্নান করতেন। মাঝারি মাপের মহল বাইরে সাদামাটা কিন্তু ভেতরে ঝরোখা, আর্চ, ফোয়ারার স্থাপত্যশৈলী মুগ্ধ করে। স্নানাগারের পাশে উঁচু সিঁড়ি, যে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে সতর্ক পাহারায় থাকত রানিদের নারী রক্ষীরা, যাতে অন্য কোনো পুরুষ অনধিকার প্রবেশ করতে না পারে। এ চত্বরেই রয়েছে হাজারো রামমন্দির, যার দেয়ালজুড়ে খোদাই করা আছে রামায়ণের বহু কাহিনি। তার পরের গন্তব্য লোটাস মহল। হাম্পির অন্যতম এ নিদর্শনের স্থাপত্য রীতি মূলত হিন্দু–মুসলিমের মিশ্রণ। এর নিচতলায় আর্চের গঠন ইসলামিক রীতিতে আর ওপরতলায় হিন্দু রীতিতে। লোটাস মহল থেকে বের হয়েই বিশাল হাতিশালা। হাতিশালার পাশেই রক্ষীদের থাকার জায়গা—রক্ষী ভবন।

বিরূপাক্ষ বাজারের একদম পাশেই রয়েছে মন্দির বিরূপাক্ষ আর তার পাশেই রয়েছে হেমকুট পাহাড়। কথিত আছে, এ পাহাড়েই শিব-পার্বতীর বিয়ে হয়। পুরো হাম্পিকে একনজরে দেখার জন্য এ পাহাড়ে চড়া আবশ্যক। মন্দিরের সামনে ধরে রাস্তা চলে গেছে তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে। শান্ত–স্নিগ্ধ নদীর পাড় ঘেঁষে এখনো জেগে আছে সেই সভ্যতা, ঐতিহ্য। এ নদীতে স্নান সেরে নিয়ে মানুষ চলে যায় মন্দিরের ভেতর। এ নদীতে ভেসে বেড়ায় ঝুড়িসদৃশ স্থানীয় নৌকা। ভাড়ায় চালিত এসব নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় নদীজুড়ে। স্থানীয় ভাষায় এই নৌকার নাম হারগোল।

ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও হাম্পি যে অবাক করা সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা থেকে সহজেই অনুমেয়, এ হাম্পি কতটা সমৃদ্ধ ছিল সেই সময়। সম্পূর্ণ হাম্পি ঘুরে দেখতে হলে মোটামুটি তিন থেকে চার দিন সময় নিয়ে আসতে হবে। হাম্পির সমস্ত স্থাপনার গল্প এ লেখায় ধরাও সম্ভব নয়। এগুলো ছাড়াও হাম্পিতে অবশ্যই দেখতে হবে পুষ্করিণী, মাতাঙ্গা হিল, হিপ্পি আইল্যান্ড, হাম্পি বাজার, রয়েল এনক্লোজার, তুঙ্গভদ্রা বাঁধ ইত্যাদি।

হাম্পিতে মূলত সারা বছরই গরম থাকে খুব। সঙ্গে পানি রাখা খুব জরুরি। রিজার্ভ অটো অথবা ট্যুরিস্ট বাস পাওয়া যায় পুরো হাম্পি ঘুরে দেখার জন্য। বাসে খরচটা কম। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হাম্পিকে পুরোপুরি জানতে সঙ্গে অবশ্যই একজন গাইড রাখা আবশ্যক। প্রত্যেক গাইডই বেশ সমৃদ্ধ হাম্পির ইতিহাস–ঐতিহ্য সম্পর্কে। হাম্পি এক অসাধারণ নিদর্শন, যার রেশ রয়েই যায়।

কীভাবে যাবেন

বেঙ্গালুরু থেকে সরাসরি ট্রেন বা বাস পাওয়া যায় হসপেটে অবধি। সেখান থেকে বাস ও অটো পাওয়া যায় হাম্পি যাওয়ার জন্য। এরপর হাম্পি ঘোরার জন্য আলাদা অটো বা বাস। রাত্রিযাপন হাম্পিতেও করা যায়, আবার হসপেটেও। হাম্পি থেকে হসপেটে ২০ মিনিটের রাস্তা। পিক সিজনে খুব ভিড় থাকে হাম্পিতে। প্রিবুকিং না থাকলে হসপেটেই কোনো হোটেলে থাকাই উত্তম।

ঘুরুন, মনকে সতেজ রাখুন। অন্যের কৃষ্টি–সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করুন। যেখানেই যাবেন, সে জায়গাকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখবেন।