ভোটের মূল্য, মানুষ ও গণতন্ত্র: বাংলাদেশ কী শিখতে পারে সুইজারল্যান্ড থেকে

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবেছবি: বাসস

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকের সচেতন সিদ্ধান্ত ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

ভোটের আসল উদ্দেশ্য কী—এই প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভোটকে প্রায়ই উৎসব, আবেগ কিংবা নিছক দলীয় প্রতীকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। অথচ প্রকৃত অর্থে ভোট হলো একজন নাগরিকের কণ্ঠ, তাঁর বিবেক এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। একজন সচেতন ভোটারের দায়িত্ব কেবল কোনো দল বা প্রতীককে সমর্থন করা নয়; বরং প্রশ্ন তোলা—কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কেন নিচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্তের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে।

এবারের নির্বাচনের একটি বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট। সরকার এই প্রস্তাবের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, আবার সমাজে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—এখানে একমত হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, আছে যুক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো কোনো আবেগ বা প্ররোচনায় না পড়ে তথ্য, যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সুইজারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে চারটি শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, ভোটকে কেবল এক দিনের উৎসব হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের প্রচারণা থাকলেও অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে তথ্য যাচাই ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, আবেগের বশবর্তী না হয়ে যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া। চতুর্থত, ভোট শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নির্বাচনের পরও জনপ্রতিনিধিদের কাজের ওপর নাগরিক নজরদারি ও সক্রিয়তা বজায় রাখা।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বের অন্যতম পুরোনো ও কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। সেখানে নিয়মিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে—করব্যবস্থা, পরিবেশ, অভিবাসন কিংবা সংবিধান সংশোধনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডে সরকার অনেক সময় কোনো প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং প্রচারণা চালায়। তবে সেই প্রচারণা হতে হয় তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ এবং নাগরিকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সীমার মধ্যে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পুরোপুরি জনগণের হাতে। সরকার মত দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। আর ভোট দেওয়া সেখানে কেবল একটি অধিকার নয়, বরং একটি সামাজিক ও নাগরিক অভ্যাস। নাগরিকেরা জানেন, তাঁরা ভোট না দিলে তাঁদের হয়ে সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিয়ে নেবে এবং সেটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

সুইজারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে। প্রথমত, ভোটকে কেবল এক দিনের উৎসব হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের প্রচারণা থাকলেও অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে তথ্য যাচাই ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, আবেগের বশবর্তী না হয়ে যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া। চতুর্থত, ভোট শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নির্বাচনের পরেও জনপ্রতিনিধিদের কাজের ওপর নাগরিক নজরদারি ও সক্রিয়তা বজায় রাখা।

গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনের কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভোটের আগে সচেতন হওয়া, ভোটের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ভোটের পরে প্রশ্ন করা—এই তিনের সমন্বয়েই গণতন্ত্র টিকে থাকে। মনে রাখা প্রয়োজন, নীরবতাও একধরনের সিদ্ধান্ত। ভুল দেখে চুপ থাকাও একধরনের পরোক্ষ সমর্থন।

আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়, গণতন্ত্র হলো মানুষের দ্বারা, মানুষের জন্য শাসন। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

*লেখক: সোহেল আজাদ, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]