যুদ্ধের পরে পৃথিবী
রাতের আকাশে আজও কিছু তারা মিটিমিটি জ্বলে—
যেন মৃত সৈনিকের চোখ—
যে চোখ শেষবার পৃথিবীকে দেখেছিল—
একটি ধানের শিষের মতো সরল,
একটি পাখির ডানার মতো নির্দোষ।
পৃথিবী তখনো সুন্দর ছিল—
দীঘির জলে চাঁদ ভাসত, বটের শিকড়ে ঘুমিয়ে
থাকত অন্ধকার, আর কোনো এক অচেনা গ্রামের
উঠানে মা তার ছেলের জন্য ডাল-ভাত ঢেকে রাখত।
হঠাৎ যুদ্ধ এল—
ইতিহাসের বুক চিরে লোহার দাঁত বসাল;
মানুষ মানুষের মুখে খুঁজে পেল শত্রু,
নিজেরই ছায়াকে ভেবে নিল মৃত্যুর দূত হিসেবে।
তারপর আগুন জ্বলল—
ঘর পুড়ল, গ্রাম পুড়ল, পুড়ল সেই চিঠি—
যেখানে লেখা ছিল: ‘ফিরে এসো—বন্ধু, শীত পড়েছে, পিঠা খাওয়াব।’
কিন্তু কে জয়ী হলো? যে সৈনিক শত্রুর বুকে
গুলি চালিয়ে পদক নিয়ে ফিরে এল—
নাকি যে রাজা মানচিত্রে নতুন সীমারেখা টানল?
প্রশ্নটি রাখলাম, উত্তর অপ্রাসঙ্গিক।
মানুষ বড় আশ্চর্য প্রাণী—
মাটির ভেতর শস্যের মতো জন্মায়,
আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে,
তারপর সেই আকাশেরই নিচে
অন্য মানুষের রক্তে নিজের অহংকারকে খুঁজতে যায়।
কতকাল ধরে এই পৃথিবী হরিণের চোখে ভোর দেখেছে,
লতার গায়ে জন্ম নিতে দেখেছে ফুল আর পাতা;
তবু মানুষের হাতে মানুষেরই রক্ত শুকিয়ে
সভ্যতার পতাকা হয়েছে লাল।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি ভাবি—
যে বাতাসে আজ বারুদের ঝাঁজ,
সেখানেই কোনো একদিন একটি শালিক তার ছানার
জন্য খাবার নিয়ে ফিরবে নীড়ে; ধ্বংসস্তূপের পাশে
ফুটে উঠবে কচি কিশলয়, কোনো বিধবার জানালায়
নিঃশব্দে এসে বসবে এক ক্লান্ত ফড়িং—শান্তির বাণী নিয়ে।
প্রকৃতি হয়তো এর সবই ভুলে যাবে,
অথবা কিছুই ভুলবে না।
তারই নীরবতার ভেতরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
জমে থাকবে মানুষের আর্তনাদ, যেমন নদীর
তলায় জমে থাকে পলি, যেমন অন্ধকারের গভীরে
ঘুমিয়ে থাকে বিলুপ্ত নক্ষত্রের আলো।
তথাপি যুদ্ধ থামবে না; কারণ মানুষ মরে,
কিন্তু মানুষের ভেতরের পশুটির জন্য
কোনো শ্মশানে জায়গা হয় না; কোথাও
একটা কবর খুঁজে পাওয়া যায় না।
শিশুর চোখে পৃথিবী আবার প্রথমবারের মতো জন্মায়—
সে জানে না সীমান্ত কী, জানে না পতাকা কেন ওড়ে—
দেশে দেশে; কেন একটি নাম উচ্চারণ করলেই
অন্য একটি নাম ঘৃণায় কেঁপে ওঠে।
তার এক হাতের মুঠোয় একদিন হয়তো
থাকবে একটি লাল গোলাপ; আর অন্য হাতে
পৃথিবীর সমস্ত সেনাপতি, সমস্ত বিজয়ী রাজা,
সমস্ত মৃত সভ্যতা।
সেদিন দূর থেকে সে তাকিয়ে দেখবে, কত সহজে শিউলি
ফুলের একটু সুবাস যুদ্ধের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
তখন সন্ধ্যা নামবে—
জোনাকির আলোয়, ঝিলের জলে ফিরে আসবে বিকেলের পাখি,
দূরের মাঠে বাতাসের গায়ে দল বেঁধে ভেসে বেড়াবে অসংখ্য প্রজাপতি।
কেউ হয়তো আর মনে রাখবে না—
কোন সৈন্য কোন দিকে গিয়েছিল,
কোন রাজা কার শহর দখল করেছিল।
শুধু মাটির গভীরে কিছু হাড় নীরবে শুয়ে থাকবে—
যেন তারা আজও অপেক্ষা করে আছে—
কোনো এক অনাগত ভোরের জন্য,
যে ভোরে মানুষ প্রথমবার বুঝবে:
সেনাপতির যুদ্ধ জয়ের খুশির চেয়ে একটি শিশুর মুখের
হাসি অনেক বড়; আর পৃথিবীটা তার চেয়েও বড়।
আরও বুঝবে—মাটির ধরা কারও জয় করার বস্তু নয়—
এখানে একটু শান্তিতে বেঁচে থাকার জন্যই
মানুষের জন্ম হয়েছিল।