এতিমের কেক ও টাউট ভাই

অলংকরণ: মাসুক হেলালগ্রাফিকস: প্রথম আলো

সকাল ১০টা প্রায় বাজে। নাশতার টেবিলে সবে বসেছি। গৃহকর্মী মেয়েটি এসে বলল,

‘আপনার কাছে কে একজন আইছে, বইতে কব?’

‘হ্যাঁ বলো, আর নাম কী জিজ্ঞেস করবে কেমন?’

ত্বরিতকর্মা ইমারন ফিরে এসে বলল, ‘নাম কইলো না। কইলো, বল গিয়া পচো ভাই নাকি পাছা ভাই পাঠাইছে!’

‘বসতে বলো, আমি চা খেয়ে যাই। আর শোনো, একটা স্কার্ফ বা চাদর দাও তো।’

গত রাতে ঘণ্টার বেশি সময় লাগিয়ে শাওয়ার নিয়েছি। তারপর রোদে শুকানো এই কাফতানটা পরেছি। রাত ১১টাতেও এতে রোদের উষ্ণতা ও গন্ধ লেগেছিল। সূর্যের ক্ষমতা অসাধারণ। রোদে শুকানো কী যে ভালো, তা সবাই জানেও না। ধনী সব দেশে ড্রায়ারে কাপড় শুকানো রেওয়াজ। ওই সব দেশে দরিদ্র এলাকাগুলো ছাড়া অন্য এলাকায় ব্যালকনিতে দড়ি টাঙিয়ে কাপড় শুকাতে দিলে স্থানীয় মিউনিসিপালিটি থেকে সতর্ক করে চিঠি পাঠায়। তবে ড্রায়ারে কাপড় শুকানোতে ওদের সুবিধা হলো জ্বালানিশক্তি বা ইলেকট্রিসিটির দাম কম। চারদিকে যুদ্ধ–হাঙ্গামার ফায়দা লুটে নিজেদের জন্য পেট্রল-বিদ্যুতের সস্তা সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। সূর্যের খুব একটা ধার ওরা ধারে না। আমার এ দেশে সূর্যের ওপর ভরসা। শস্য-পাট বাদ দিলাম, এই রোদে শুকানো কাফতানটাই কি আমেজমাখা! ইমারন গত রাতে ফ্যানের মৃদু হাওয়ার নিচে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে আঁচড়ে শুকিয়ে দিয়েছে। এমন আদর–আপ্যায়ন বিদেশে জোটে না। ওর কাছে আমি রোদ আর ড্রায়ারে কাপড় শুকানোর গল্প করেছি। মেশিনে কাপড় শুকানোর কথা শুনে ও হেসে কুটিকুটি। ইমারন ভেবেছে চুল শুকানোর ড্রায়ারের মতো করে হাতে ড্রায়ার ধরে গরম বাতাস ভেজা কাপড়ে বারবার বুলিয়ে কাপড় শুকাতে হয়। জানতে চাইল,

‘ওরা ধান–পাট কেমনে শুকায় আফা?’

আমি নিজেও জানি না কীভাবে ধান–পাট শুকায়? তাই আমার উত্তর ছিল মূর্খের মতো।

‘আমি তো খেতখামারে কাজ করি না, তাই জানি না।’

ইমারন ফিরে এল ওড়না হাতে।

‘এইটা আমার নতুন উড়না, পিন্ধি নাই, ধুইও নাই আপনি পিন্ধেন আইজ, আমি খুব খুশি হব।’

বাসায় এখন কেউ নেই। তাই নিজের ওড়নাটাই এনেছে। কাফতানের ওপর ওড়নাটা পরে যাব।

‘আচ্ছা নামটা কী যেন বললে, পাসা না পাশা?’

‘ওই রকমই একটা কিছু হইব।’

‘শোনো, মেহমানকে নাশতা দিয়ো।’

বলে আমি ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ালাম। ধোপদুরস্ত প্যান্ট–শার্ট পরা কালোপনা রোগামতো লম্বা লোকটি উঠে দাঁড়াল।

‘বসুন।’

আমি বসতেই সে–ও বসল। তারপর বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে জোরালো কণ্ঠে শুরু করল।

‘ম্যাডাম, পাশা ভাই বললেন, আপনার কী...

আমি নিষেধের ভঙ্গিতে হাত তুলতেই থেমে গেল।

‘শুনুন, ম্যাডাম বলবেন না; আপা, খালা, ফুপু বাংলা শব্দ তো জানা আছে।’

আমার কথায় কেমন যেন থিতিয়ে গেল লোকটা। এবার সে সাবধানে যথেষ্ট নম্র গলায় কথা শুরু করল।

‘পাভেল শামস ভাই বললেন আপনার কি প্রজেক্টে সাহায্য দরকার, কী করতে হবে যদি বলেন?’

একটু চিন্তিত। কিসের প্রজেক্টে? কার প্রজেক্টে? মাথামুণ্ডু বুঝলাম না।

‘আমার কী প্রজেক্টের কথা?’

‘এতিমদের জন্য কী যেন করার কথা?’

‘ও হ্যাঁ, এতিমদের...আচ্ছা আপনার কাজটা কী?’

‘আমার একটা ছোটখাটো কোম্পানি আছে। বিদেশ থেকে যাঁরা আসেন বা বিদেশে যাঁরা থাকেন, তাঁদের নানা সার্ভিস দিয়ে থাকি।’

‘কী রকম?’

‘এই যেমন আপনার অ্যাপার্টমেন্টে ভালো ভাড়াটে বসানো, বদ ভাড়াটে উচ্ছেদ, ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়ার জমা দেওয়া, পলিসি ম্যাচিউর হলে টাকা আদায়...’

‘ওহ! শুধু দাঙ্গাবাজি আর হুজ্জুতি কাজ করে বেড়ান।’

‘না, অন্য কাজও করি। যেমন ছবি মানে জয়নুল-কামরুলের চিত্রকর্মের নকল কিনে দেওয়া, যারা বিদেশে থাকে, তারা ছবিটবি টাঙিয়ে দেশকে মনে রাখতে চায় তো বা বিদেশিদের দেখাতে চায়, হবে কোনো একটা। বই ছাপাতে চান যদি আমাদের হাতে প্রকাশক-লেখক দুই দলই আছে সাহায্য করার জন্য।’

‘প্রকাশক দরকার বুঝলাম, লেখক কেন?’

‘মুখবন্ধ লেখার জন্য একদল রাইটার ঠিক করা আছে, অস্ট্রেলিয়ার জন্য একদল, আমেরিকা, বিলাত, জাপান, সুইডেন অন্য দল। যেখান থেকেই আসেন, বই বের করতে আমাদের লেখকেরা তৈরি মুখবন্ধ লিখে দেওয়ার জন্য। তবে এসব প্রজেক্টের খরচপাতিও করতে হয়, আপনার প্রজেক্টের ব্যাপারটা যদি বলেন।’

‘আমার বড় কোনো ব্যাপার নয়। আমার খুব প্রিয় একজনের জন্মদিনে এতিমদের কেক খাওয়াতে চাই।’

আমার নম্র বয়ান শুনে লোকটির বিষিত উক্তি, ‘বিদেশে থাকলে মানুষের আত্মা কত বড় হয় দেখেন! এতিমদেরও কেক খাওয়াতে চায়!’

লোকটির জ্ঞান সীমিত। তার ধারণা, বিদেশবাসী বড়লোকেরা বড় আত্মার মানুষ হয়। অথচ যে এতিমখানাতে কেক দেব ভাবছি, সেটি তৈরি করেন এই দেশেরই এক ধনী লোক। সেই কবে ১৯৩৭ সালে। ওই ধনাঢ্য ব্যক্তিটিই ১৯৩৫ সালে ইতালি ও আয়ারল্যান্ডে দুর্গতদের জন্য এ দেশ থেকে অর্থসাহায্য পাঠিয়েছিলেন। মানুষটি নবাব সলিমুল্লাহ। তাঁর বিষয়ে এসব তথ্য জানা থাকলে এ লোকটা বিদেশবাসীর বদান্যতায় এত বিগলিত হতো না বোধ হয়। মানুষ আমিরখানার বিষয়ে জানতে যতটা কৌতূহলী এতিমখানা বিষয়ে তত আগ্রহী কেন হয় না ভেবে পাই না। এই এতিমখানাতে মাংস–ভাত পাঠানো হয়। মানুষের দানে অনেক উপকার হয় এতিমদের। একবার এতিমখানা পরিচালনাকারী কর্মীরা বলল,

‘মাংস প্রায়ই আসে। আপনারা যদি এতিমদের জন্য এক বেলা মাছ–ভাতের ব্যবস্থা করতেন, ভালো হতো।’

সেবার ওখানে ছিল ৩১৫ বাচ্চা। বাচ্চাদের সংখ্যা সব সময় এক থাকে না। তবে মাছ দেওয়া বেশ ঝক্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাওয়া ঘাট থেকে তাজা পাঙাশ নাকি রুই মাছ কিনে নিউমার্কেটে গিয়ে মাছওয়ালাকে দিয়ে ঠিক এক মাপে ৩৩০ টুকরা করিয়ে কাটানো। তারপর চাল-ডাল, তেল-সবজিসহ এতিমখানায় পৌঁছানো। বাড়ির ড্রাইভাররা খুব বেজার হয়েছিল এই মাছের আবদারের ঝামেলা সামলাতে গিয়ে। মাংস–ভাত হলে একবারে এক বাজার থেকে সব কিনে পৌঁছে দেয়, উপকরণ পরিমাণে কিছুটা বেশি দিয়ে আসে। রান্না হলে তরকারি, সবজি, ডাল সব পদ আইসক্রিমের বক্সে করে নিয়ে আসে তখন মাথাপ্রতি হিসাবমতো জিলাপি দিয়ে আসে। ওই দিন আমরা সবাই এতিমদের মতো ওই একই খাবার খাই।

কেক দেওয়াটা অভিনব, তবে ঝামেলার। এবার তাই একজনকে দায়িত্ব দিতে চাই যে ভালো মানের সুস্বাদু কেক এতিমদের জন্য ব্যবস্থা করবে। যে কেউ এতিমদের জন্য কেক চাই শুনলেই হয়তো নিম্নমানের যাচ্ছেতাই কিছু গছিয়ে দেবে। এতিমরা নালিশই–বা জানাবে কাকে? আমি আমার ইচ্ছাটা লোকটিকে গুছিয়ে বললাম।

‘অসুবিধা নাই, দামি হোটেল থেকে টপ কোয়ালিটির কেক অর্ডার দিব মিনিস্টারের বাড়ির নামে, বাজে কেক দিলে ধড় ঘাড়ে থাকবে না জানবে। ম্যা...ওহ, সরি আপা, কতজন এতিম আছে আর কোন তারিখে কেকটা যাবে, আপনি যদি বলে দেন, তাইলেই হবে আর...’

ওকে কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

‘এখানে মিনিস্টারের কথা কেন আসছে!’

‘মিনিস্টারের নামটা ব্যবহার করব মাত্র! এইটা ভালো জিনিস ম্যানেজ করার একটা উপায় বা ফন্দি বলতে পারেন আর এতে কারও কোনো ক্ষতি হবে না। আচ্ছা আপা সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার জোগাড় করব?’

‘কেন?’

‘আপনি যখন এতিমদের কেক দিবেন ছবি তুলবে, পত্রিকায় নিউজ করবে।’

আমি কঠিন গলায় বললাম,

‘না’

লোকটি আবার থতমত খেয়ে চিমসে গেল। তাকে আগামী দিন আসার কথা বলে বিদায় করলাম। ও চলে যাওয়ার পর পাশাকে ফোন করলাম,

‘হ্যালো পাশা, কাকে পাঠিয়েছ ভাই? এ তো দেখি মহা চালিয়াত!’

‘আপা ও ভালো ম্যানেজ করে, এভাবেই ওর পেট চলে। তবে শোনো, সৎভাবে করে সেটা দেখার বিষয়। কারও ক্ষতি সে করে না। টাউট ভাইটি মন্ত্রী থেকে মস্তান, পীরসাহেব থেকে চোরসাহেব—সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখে; আল্লাহ থেকে ইবলিস সব বিষয়ে কিছু না কিছু জানে। তবে কারও ক্ষতি করার কন্ট্র্যাক্ট সে নেয় না। তোমার কাজটা সে সততার সাথেই করবে, পারিশ্রমিক তুমি ভালোই দেবে জানি। ওর ওপর ভরসা করতে পারো, আমাকে কখনো ঠকায়নি।’

পাশার কথায় আস্থা বাড়ে, নিশ্চিত হই এতিমেরা এই টাউট লোকটির কল্যাণেই ভালো মানের কোয়ালিটি কেকই পাবে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]