নারীর সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নিতেই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন
নারীর সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৫ সালে আমি ‘ওমেন কালচারাল এমপাওয়ারমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ (ডব্লিউসিইআই) নামে একটি অনলাইনভিত্তিক বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করি। এটি কানাডাভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা। তারপরও আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত নবীন–প্রবীণ নাগরিক কাজ করতে এগিয়ে আসেন।
‘ওমেন কালচারাল এমপাওয়ারমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ বা ডব্লিউসিইআইর (https://wceia.org) অন্যতম লক্ষ্য হলো পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য ও সাংস্কৃতিক অবিচারের শিকার নারীদের ক্ষমতায়ন। সেই সঙ্গে উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ মডেলে নারীদের ব্যবসায়ের পথ দেখানোর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শও দিতে চাই। কারণ, আমরা মনে করি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর গতানুগতিক ঐতিহ্যনির্ভর সমাজে শুধু আর্থিক ও আইনি সহায়তা–সমর্থনই নারীদের পরিবার ও সমাজে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়িত করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁদের জন্য আরও কিছু করার আছে।
আমাদের এসব মহতী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে ওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস অব কানাডা ‘গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট ও মেন্টরশিপ অ্যাওয়ার্ড’ (https://www.woea.ca/awards) শীর্ষক পুরস্কারের জন্য সম্প্রতি আমাকে মনোনীত করেছে। সংস্থাটি নারীর ক্ষমতায়ন ও বৈশ্বিক মেন্টরশিপ তথা পরামর্শ সেবার উন্নয়নে পরিচালিত কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আমাকে একটি অনারারি বা সম্মানসূচক নমিনি ব্যাজ প্রদান করেছে। আমি মনে করি, এই মনোনয়ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; এটি আমাদের সমন্বিত প্রচেষ্টার অর্জন। আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও নারীর ক্ষমতায়নের সংযোগ কোথায় এবং কীভাবে তা টেকসই পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
ওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস অব কানাডার অধীনে গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট ও মেন্টরশিপ অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পাওয়া নিঃসন্দেহে সম্মানের। তবে এই স্বীকৃতির আসল তাৎপর্য লুকিয়ে আছে তার কাজের ধরনে। আমরা যে মডেল তৈরি করেছি, তা কেবল নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক–সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতাকেও একসঙ্গে বিবেচনায় আনে। উন্নয়নের আলোচনায় এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, এখানেই আমাদের কাজের মৌলিকতা। আমি অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটতে পিএইচডি অধ্যয়নের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
আমরা, মানে ডব্লিউসিইআই মনে করে, কালচারাল এমপাওয়ারমেন্ট বা সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন শুধু তাত্ত্বিক শব্দ নয়; এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে নারীরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান ও পরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করতে পারে। বিশেষ করে গতানুগতিক সমাজে যেখানে নারীরা নানা অদৃশ্য বাধারও সম্মুখীন হন, সেখানে এই মডেল বা পদ্ধতি একধরনের বিকল্প পথ দেখাবে।
আমাদের চিন্তার পেছনে অবশ্য বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা দর্শনের প্রভাব রয়েছে। লাভের বাইরে গিয়ে সামাজিক সমস্যার সমাধানকে ব্যবসার কেন্দ্রে রাখার যে ধারণা, সেটিই তাঁর উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে তাঁর কাজ কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে।
আমাদের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একাডেমিক মেন্টরশিপ। উন্নয়নশীল দেশের বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখলেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাবে পিছিয়ে পড়েন। গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরি, উপযুক্ত সুপারভাইজার খোঁজা বা আন্তর্জাতিক বৃত্তির জন্য আবেদন—এসব ক্ষেত্রে সহায়তার অভাব প্রকট। তিনি এই শূন্যতাকে লক্ষ্য করে যে মডেল তৈরি করেছেন, তা একদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক হয়, অন্যদিকে একাডেমিকদের সময় ও শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে।
পেশাগত জীবনের শুরুতে আমি ইউনাইটেড নেশন্স এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (ইউনেসকো) বাংলাদেশ অফিসে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা আর ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা নতুন কাজের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। হস্তশিল্প, মৌখিক ঐতিহ্য ও প্রথাগত জ্ঞানের মতো ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ বা বাস্তব ঐতিহ্যকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যে ধারণা, সেটি এখন বৈশ্বিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। আমরা এই ক্ষেত্রকে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন দিক উন্মোচন করতে চাই।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও আমার কিছুটা সম্পৃক্ততা রয়েছে। যেমন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচারের (আইইউসিএন) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ নমিনেশন বোর্ডে কাজ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছি।
আমি মনে করি, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়। নারীর ক্ষমতায়নও কেবল অর্থনৈতিক সূচকে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাঁদের সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত।
সব শেষে বলব, ওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস অব কানাডার ‘গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট ও মেন্টরশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পাওয়া শুধু আমার একার সাফল্য নয়; এটি একটি ধারণার স্বীকৃতি—যে ধারণা আমাদের ভবিষ্যতের উন্নয়ন চিন্তাকে নতুনভাবে তুলে ধরবে।
লেখক: শাহিদা খানম, সিইও ও ফাউন্ডার, ওমেন কালচারাল এমপাওয়ারমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (ডব্লিউসিইআই)