পালকি
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। পশ্চিম আকাশে লালচে আভা মিশে যাচ্ছে ধানের খেতের ওপরে। গ্রামের মাটির পথ ধরে এগিয়ে চলেছে এক পালকি, চার বেহারার কাঁধে দুলছে এক স্বপ্ন, এক নতুন জীবনের শুরু। ভেতরে বসে আছে বর, লাজুক অথচ গর্বিত, বুকের ভেতর কাঁপন, কিন্তু চোখে এক অদেখা ভবিষ্যতের আলো।
এই পথ কেবল যাত্রাপথ নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের সংযোগ। চার বেহারার পদচারণে শুধু ছন্দ ছিল না, ছিল দায়িত্ব, ছিল এক অদৃশ্য সম্পর্কের বন্ধন। তারা শুধু বাহক নয়, তারা সেই গল্পের অংশ, যেখানে একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
গ্রামের লোকজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। কেউ হাসছে, কেউ দোয়া দিচ্ছে, কেউবা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। শিশুদের কৌতূহল, বৃদ্ধদের স্মৃতিভরা দৃষ্টি, আর নারীদের মুখে লাজুক হাসি, সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ। এই ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, কোনো আয়োজনের বাহুল্য নেই, তবু অনুভূতির গভীরতায় অমলিন।
পালকির ভেতরে বসে থাকা বর মাঝেমধ্যে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। সে দেখে তার নিজের শিকড়, এই মাটি, এই মানুষ, এই পথ। শহরের চাকচিক্য, আধুনিকতার ঝলকানি—সবকিছু যেন এখানে এসে ম্লান হয়ে যায়। কারণ, এখানে আছে একধরনের সত্য, যা কৃত্রিম নয়, সাজানো নয়।
এই পালকি শুধু একজন বরকে তার কনের কাছে পৌঁছে দেয় না, এটি বহন করে একটি যুগ, একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য। আজ যখন চারপাশে যান্ত্রিকতা, ব্যস্ততা আর বিচ্ছিন্নতা, তখন সেই পালকির দুলুনিতে আমরা খুঁজে পাই মানুষের কাছে মানুষের ফিরে আসার গল্প।
কিন্তু এই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। বেহারাদের কাঁধ আজ আর তেমন ভার নেয় না, গ্রামের পথ আর সেই ছন্দে কাঁপে না। তবুও স্মৃতির ভেতরে, গল্পের ভাঁজে এই পালকি বেঁচে আছে, একটি সময়ের সাক্ষী হয়ে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
বর একা পালকিতে চড়ে আসে। কিন্তু বিয়ে শেষে যাবার বেলায়, সেই একই পালকিতে কনে আর বর মুখোমুখি বসে। একটি জীবন, দুজন মানুষ, একসঙ্গে চলার পথে তখনই প্রথম সত্যিকারের যাত্রা শুরু হয়। চারজন বেহারার পরিবর্তে ছয়জনের কাঁধে চেপে চলার পথে, কী তারা ভাবছে, কীই–বা ভাবছে, কী চেতনা, কী যাতনা বা কীই–বা ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর বা যৌবনের সেই মুহূর্তের স্মৃতিগুলো, জানিয়ে কে কার কথা ভাবছে!
সেই মুছে যাওয়া দিনগুলো কি মনকে উথালপাতাল করছে নাকি নতুন দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নে, পরস্পরের হৃদয়ে মধুর বাঁশরি বাজছে? দুজন মুখোমুখি বসে আছে, তারপরও তারা জানে না, কে কার কথা ভাবছে। এমনটিও নিশ্চয়ই তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কী ছিল তাদের ফেলে আসা জীবনের কথা?
এসব আমার ছোটবেলার দিনগুলোর স্মৃতি, যার চারণ মনে পড়েছে হঠাৎ সুইডেনের ইস্টার হলিডের ছুটিতে। মনে পড়ছে স্কুলজীবনের স্মৃতিকথা, খুব অল্প বয়সে এক বন্ধুর বিয়ের কথা। আমি স্কুলে গান গাইতাম তখনো। মনে পড়ে সেবার স্কুলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আমি তার সুবাদে গেয়েছিলাম,
বন্ধু তোর বারাত নিয়ে আমি যাব
নওশা সাজাইয়া পালকিতে চড়াইয়া
খুশিতে নেচে নেচে গান শোনাব
হলদি দিয়া মেন্দি দিয়া গোসলও করাইব
সেই গোসলের শেষে নতুন কাপড়ও পরাইব
কাপড়ও পরাইয়া আতরও লাগাইব
আতরও লাগাইয়া সানাই বাজাইব
সানাইয়ের সুরে সুরে পাগল করে দিব
আগে পিছে কত মানুষ যাবে সাথি হইয়া
হাসিমুখে মা রবে দুয়ারে দাঁড়াইয়া
দুয়ারে দাঁড়াইয়া দোয়া দিবে
মায়েরও দোয়াতে দুঃখ যাবে
সুখে দুঃখে দুইজনে একসাথে।
সে বহু বছর আগের কথা, মুছে যাওয়া দিনগুলো কি হঠাৎ করেই মনকে উত্তাল করে তোলে, নাকি অতীতের দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নে, অচেনা এক টানে, পরস্পরের হৃদয়ে নিঃশব্দে মধুর বাঁশরি বেজে ওঠে?
জানি না আজকের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে এই গল্প কেমন লাগবে। তবে সুইডেনের প্রজন্মের কাছে, এটি যেন একেবারেই অন্য জগতের গল্প, এক অদ্ভুত অথচ গভীর আবেগের প্রকাশ।
আমার নিজের বিয়ের কথাও মনে পড়ে। সুইডেনের একটি শহর, লিংকোপিঞ্জ। বাবা, মা, ছোট দুই বোন, বড় ভাই—সবাই ছিল। কোনো সানাই বাজেনি, কোনো বড় আয়োজনও ছিল না। তবু সেই ছোট্ট পরিসরে, বাবা-মায়ের আশীর্বাদে, আমি আর মারিয়া একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছিলাম।
তবে তারও আগে, মারিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল স্টকহোম সিটি হলে। সেদিন পালকি ছিল না, বেহারাও ছিল না, কোনো সানাইও না। কিন্তু তবু মনে হয়েছিল, কিছু একটা শুরু হচ্ছে, খুব নিঃশব্দে, খুব গভীরে।
আজকের এই দুর্দিনে, যখন মানুষ মানুষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন সেই পালকির স্মৃতি আমাদের শেখায়, একসঙ্গে চলার মানে কী। চারজন মানুষের কাঁধে ভর করে একজন মানুষ তার জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখে। এটাই তো বিশ্বাস, এটাই তো ভালোবাসা।
হয়তো আজ আর পালকি নেই, কিন্তু সেই অনুভূতি এখনো বেঁচে থাকতে পারে, যদি আমরা চাই। যদি আমরা আবার মানুষের পাশে দাঁড়াই, একে অপরের বোঝা একটু করে কাঁধে তুলে নিই।
তখনই, এই ভাঙা সময়ের মধ্যেও আমরা আবার খুঁজে পাব, আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া পালকি।
*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন