চীনের পথে এক বাংলাদেশি: সৌন্দর্য, সভ্যতা ও অভিজ্ঞতার গল্প

কুনমিং শহরের দিয়ানচি হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন প্রথম নীল পানির বুকে ভোরের সোনালি রোদ পড়তে দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল যেন কোনো প্রাচীন চীনা চিত্রকর্মের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। ২০১৮ সালের সেই নভেম্বরের সকাল, ইউনান ল্যান্ড অ্যান্ড রিসোর্স ভোকেশনাল কলেজে ডিপ্লোমা করার প্রথম মাস আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অভিঘাতের সাক্ষী হয়ে আছে। পাশেই এক বয়স্ক চীনা ভদ্রলোক তাইজি ব্যায়াম করছিলেন, ধীর আর ছন্দময় ভঙ্গিতে। পেছনে দূরে পশ্চিম পাহাড়ের নীলচে আবছায়া, সামনে লাল-হলুদ পাতায় মোড়া জিনকো গাছের সারি। বাংলাদেশের পুকুর-নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা এক তরুণ ছাত্রের কাছে এই দৃশ্য ছিল অবিশ্বাস্য, ছিল একেবারে স্বপ্নের মতো।

সেই সকালটা এখনো চোখে লেগে আছে। কারণ, সেটাই ছিল প্রথম মুহূর্ত, যখন আমি টের পেয়েছিলাম যে চীন শুধু পড়াশোনার গন্তব্য নয়; বরং এক জীবন্ত সভ্যতার পাঠশালা।

আরও পড়ুন

পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার স্পর্শ

চীনকে বোঝার প্রথম শর্তই হলো তার সভ্যতার ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশের ইতিহাসেও আমরা গর্ব করি প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধবিহার, মসলিন–বাণিজ্য, বারো ভূঁইয়ার স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে। কিন্তু চীনে পা রাখার পর যে জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে, তা হলো একটা গোটা সভ্যতার টানা পাঁচ হাজার বছর ধরে নিজের ভাষা, লিপি, দর্শন, খাদ্যাভ্যাস আর শিল্পকে ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা।

নানজিংয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ছিল মিং রাজবংশের পুরোনো শহরপ্রাচীর, প্রায় ছয় শ বছরের পুরোনো ইটের গাঁথুনি, যার ওপর দিয়ে আজও মানুষ হাঁটে, সাইকেল চালায়, সন্ধ্যাবেলায় প্রেমিক-প্রেমিকা হাত ধরে সময় কাটায়। বাংলাদেশে যেমন আমরা ষাট গম্বুজ মসজিদ বা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের গন্ধ পাই, তেমনি এখানে দাঁড়িয়ে টের পাওয়া যায় মিং আর চিং রাজবংশের ইতিহাসের স্বাদ। পার্থক্যটা শুধু দেশের, চীনে এই ইতিহাস ছড়িয়ে আছে প্রতিটি প্রদেশে, প্রতিটি শহরের অলিগলিতে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বেইজিংয়ে প্রথমবার নিষিদ্ধ নগরীতে ঢোকার অভিজ্ঞতা আমার কাছে একেবারে পারিবারিক গল্পের মতো লেগেছিল। ৯ হাজারের বেশি কক্ষের এই প্রাসাদ চত্বর বাংলাদেশের লালবাগ কেল্লার চেয়ে প্রায় এক শ গুণ বড়, যেন স্থাপত্যের মহাসমুদ্র। হলুদ টালির ছাদ, লাল দেয়াল, সিংহাসন কক্ষের সোনালি ড্রাগন...; কিন্তু যে জায়গাটা আমার মন কেড়েছিল, সেটা হলো ইম্পেরিয়াল গার্ডেন। যেখানে সম্রাটের উপপত্নীরা বিকেলে চা পান করতেন, পাথরের সাঁকোয় দাঁড়িয়ে মাছ দেখতেন। সেই বাগানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, ইতিহাস শুধু যুদ্ধ আর রাজনীতির নয়; বরং নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরের গল্পও।

আর গ্রেট ওয়াল, আহা, সেই প্রাচীর! ‘যে মানুষ প্রাচীরে ওঠেনি, সে প্রকৃত মানুষ নয়’- মাও সে তুংয়ের এই উক্তি বাদালিং সেকশনের সেই পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বারবার মনে পড়ছিল। বন্ধু সিফাতের সঙ্গে গিয়েছিলাম, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের কোনো এক ঝকঝকে দিনে। প্রাচীর যেন পাহাড়ের মেরুদণ্ড বেয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। যে পর্যন্ত চোখ যায়, শুধু পাথর, সবুজ আর নীল আকাশ। সেখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ খুব ইচ্ছা করছিল আব্বুকে ফোন করে বলি, ‘আব্বু, জানেন, আমি সেই চীনের প্রাচীরে দাঁড়িয়ে আছি, যেটা চাঁদ থেকেও নাকি দেখা যায়!’ সত্যি না হলেও সেই অনুভূতিটা সত্যি ছিল।

যেসব জায়গা মন কেড়েছে

চীনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এত বৈচিত্র্যময় যে এক দেশের ভেতর যেন পাঁচটা মহাদেশে ঘুরছেন। বাংলাদেশের সবুজ সমতল ভূমি, সুন্দরবনের গহিন অরণ্য, কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, বান্দরবানের উঁচু–নিচু পাহাড়, এগুলো আমাদের অভ্যস্ত প্রাকৃতিক দৃশ্য। কিন্তু চীনে প্রথমবার ট্রেনে করে নানজিং থেকে গুয়াংঝৌ যাওয়ার পথে জানালার বাইরে তাকিয়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পাহাড়, নদী, চা-বাগান, ধানের জমি, তারপর হঠাৎ বিরাট ইন্ডাস্ট্রিয়াল শহর, আবার পাহাড়, একটানা চব্বিশ ঘণ্টার যাত্রায় দৃশ্যপট কখনো একঘেয়ে হয়নি।

চাংজিয়াজিয়ে: জায়গাটার নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সেই অবাস্তব পাথরের স্তম্ভগুলো, যেগুলো দেখে জেমস ক্যামেরন ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার ভাসমান পর্বতের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। ক্যাম্পাসের চার বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম, চীনা নববর্ষের ছুটিতে। কাচের স্কাই ব্রিজে পা রাখার আগে হাঁটু কাঁপছিল, নিচে তাকালে প্রায় চার শ মিটার সোজা উপত্যকা। কিন্তু ভয় কেটে গেল যখন আশপাশের চীনা পর্যটকদের হাসিমুখ দেখলাম, একজন মধ্যবয়সী নারী বললেন, ‘ভয় পেয়ো না ছোট ভাই, আকাশ তো তোমায় ধরেই রেখেছে!’ চাংজিয়াজিয়ের কোয়ার্টজ-বেলেপাথরের এই স্তম্ভগুলো, কুয়াশায় মোড়া চূড়াগুলো—পৃথিবীতে এমন জায়গা খুব কম আছে। ফিরে আসার পর অনেক দিন মনে হয়েছিল যেন কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্পের ভেতর দিয়ে ঘুরে এলাম।

হাংঝৌয়ের পশ্চিম হ্রদ: এটা আরেক রকমের ভালোবাসা। পশ্চিম হ্রদ উত্তাল নয়, নাটকীয় নয়; সে শান্ত, ধীর, কাব্যিক। সু রাজবংশের কবি সু দোংপো লিখেছিলেন, ‘পশ্চিম হ্রদের সঙ্গে হাংঝৌয়ের সম্পর্ক চোখের সঙ্গে মুখের মতো’—কথাটা কত সত্যি সেটা বোঝা যায় যখন আপনি বিকেলে হ্রদের পাড়ে উইলোগাছের নিচে বসে চা পান করেন, দেখেন দূরে লেইফেং প্যাগোডার ছায়া জলে কাঁপছে। আমার এক চীনা বন্ধু লি শু–ও বলেছিল, ‘পশ্চিম হ্রদে প্রতিটি ঋতুতে আসতে হয়; বসন্তে পিচ ফুল, গ্রীষ্মে পদ্ম, শরতে চাঁদ, শীতে বরফের ওপর লণ্ঠন।’ বাংলাদেশের হাওরের সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করলে, হাওর বিশালত্বের সৌন্দর্য, আর পশ্চিম হ্রদ নৈকট্যের, ঘনিষ্ঠতার।

সাংহাই বান্ড: এটা পুরোপুরি ভিন্ন জগৎ। এক পাশে ১৯৩০-এর দশকের ইউরোপীয় স্থাপত্য, অন্য পাশে পুডং-এর ভবিষ্যৎ–মুখী আকাশছোঁয়া দালানগুলোর আলোকসজ্জা। রাতে হুয়াংপু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে যে বৈপরীত্য দেখবেন, সেটা গোটা আধুনিক চীনের প্রতিচ্ছবি; ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মাঝে দাঁড়িয়ে এক অবিশ্বাস্য ভারসাম্য। নিচে পর্যটক, ওপরে অফিস-কর্মী—দুই জগতের টানাপোড়েনে বান্ড যেন সময়ের দুই প্রান্ত ছুঁয়ে থাকে।

সিয়ানের টেরাকোটা আর্মি: ইতিহাস আর প্রত্নতত্ত্বের ছাত্রদের জন্য স্বর্গ। আট হাজারের বেশি মাটির সৈন্য, প্রত্যেকের মুখভঙ্গি আলাদা, প্রত্যেকের পোশাক-অস্ত্র সজ্জিত—সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের সমাধি পাহারায় দাঁড় করানো এই নীরব বাহিনী দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়। বাংলাদেশে আমরা সোনারগাঁয়ের প্রত্নস্থলে দাঁড়িয়ে মধ্যযুগ কল্পনা করি, এখানে দাঁড়িয়ে আড়াই হাজার বছর আগের এক সম্রাটের মৃত্যুভয় আর অনন্তকালীন ক্ষমতার স্বপ্ন, সব যেন চোখের সামনে মূর্ত।

কুনমিংয়ের দিয়ানচি হ্রদ আমার কাছে সবচেয়ে ব্যক্তিগত, সবচেয়ে কাছের। কারণ, এখানেই আমার চীন-জীবন শুরু। শীতকালে সাইবেরিয়া থেকে লাল ঠোঁট সিগাল পাখির ঝাঁক আসে দিয়ানচিতে; ঠিক যেন বাংলাদেশের হাকালুকি হাওরে শীতের অতিথি পাখিগুলোর মতো! এই মিলটা দেখে কতবার যে মন ভরে গেছে, সে হিসাব নেই।

উৎসব, খাবার, আর দৈনন্দিন জীবনের রং

বসন্ত উৎসব, মানে চীনা নববর্ষ। চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব সম্পর্কে কিছু না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। বাংলাদেশের ঈদের সঙ্গে এর তুলনা করি সব সময়: পরিবারের সবাই এক হওয়ার, নতুন জামা পরার, বিশেষ খাবার রান্নার, বড়দের পায়ে হাত দিয়ে সম্মান জানানোর রীতি যেন দুই ভিন্ন সংস্কৃতি একই আবেগের ভাষায় কথা বলে। শুধু চীনে লাল রঙের উৎসব হয়, আমরা পাই সাদা পাঞ্জাবি আর রঙিন শাড়ি; ওরা জিয়াওজি (ডাম্পলিং) বানায়, আমরা সেমাই-পায়েস রান্না করি; ওরা আতশবাজি ফোটায়, আমরা নামাজ শেষে কোলাকুলি করি—ভিন্ন আচার, একই মানবিক উষ্ণতা।

আর খাবারের গল্প! ওহ্, এ এক মহাসমুদ্র। বাংলাদেশি হিসেবে আমার স্বাদগ্রন্থি একেবারে প্রশিক্ষিত, মসলা আর ঝাল আমাদের রক্তে। চীনা খাবার প্রথম প্রথম একদমই চিনতে পারিনি। ইউনানে প্রথম যে জিনিসটা ভালো লেগেছিল, সেটা হলো ‘গুও চিয়াও মি সিয়ান’ ব্রিজ পার হওয়া চালের নুডলস নামে পরিচিত, এক গরম ঝোলের সঙ্গে আলাদা আলাদা বাটিতে মাংস, ডিম, সবজি, নুডলস নিজে মিশিয়ে খেতে হয়। ব্যাপারটা অনেকটা ঢাকায় আমরা যেমন ফুচকার সঙ্গে তেঁতুল পানি, মরিচ, ডিম সব আলাদা করে একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করি। তারপর ধীরে ধীরে শিখেছি, সিচুয়ানের ঝাল হটপট, বেইজিংয়ের পাতলা প্যানকেকে মোড়া হাঁসের মাংস, সাংহাইয়ের স্যুপ-ভরা শিয়াওলংবাও (কামড় দিলে গরম ঝোল ছিটকে পড়ে মুখে, প্রথমবার খেতে গিয়ে জিব পুড়িয়েছিলাম!)। নানজিংয়ের সল্টেড ডাক, কুনমিংয়ের রাস্তার পাশে কাঠকয়লার আগুনে পোড়া মাছ, সিয়ানের বিয়াংবিয়াং নুডলস; প্রতিটা শহরের একটা আলাদা খাবারের আত্মা আছে। এখন চপস্টিক দিয়ে ভাত খাওয়া আমার কাছে ছোটবেলার হাত দিয়ে খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক।

আর ট্রেনে চড়ার গল্প তো মহাকাব্যিক। চীনের হাই-স্পিড ট্রেন, ঘণ্টায় তিন শ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ছুটতে থাকা এক রুপালি তির। নানজিং থেকে বেইজিং, প্রায় বাংলাদেশের সমান দূরত্ব; সাড়ে তিন ঘণ্টায়! ট্রেনের ভেতর চুপচাপ, পরিষ্কার, সময়ানুবর্তী। প্রথমবার এই ট্রেনে চড়ে ভাবছিলাম, কবে বাংলাদেশের রেল এত উন্নত হবে! আর রাতের ট্রেনে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা; পাশের বার্থে এক দাদু, হাতে থার্মাস থেকে গরম চা ঢালছেন, আমাকেও দিলেন এক কাপ, সঙ্গে বললেন, ‘চীন তোমারও তো দেশ, এই পৃথিবী আমাদের সবার।’ এই সরল মানবিকতার মুহূর্তগুলোই আসল পর্যটন, আসল সাংস্কৃতিক বিনিময়।

আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো, যখন প্রযুক্তি ঐতিহ্যকে বাঁচায়

চীনের পর্যটনের সবচেয়ে চোখা অস্ত্র হলো তার অভূতপূর্ব অবকাঠামো। প্রতিটা বড় দর্শনীয় স্থানে পৌঁছানোর জন্য আছে দ্রুতগামী ট্রেন, মেট্রো, কেব্‌ল কার। ইংরেজি সাইনবোর্ড, মুঠোফোন অ্যাপে টিকিট বুকিং (আলিপে আর উইচ্যাট পে ছাড়া তো জীবন অচল!), ভার্চ্যুয়াল ট্যুর গাইড। যে দেশে মোটামুটি সব জায়গায় ক্যাশলেস পেমেন্ট কাজ করে, সেখানে পর্যটনও পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর।

ঝাংজিয়াজিয়েতে সেই স্কাই ব্রিজ, বানানো হয়েছে অত্যাধুনিক সেফটি ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে। নিষিদ্ধ নগরীতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য আগে থেকে অনলাইন বুকিং বাধ্যতামূলক, দৈনিক আশি হাজারের বেশি দর্শক ঢুকতে পারে না, যেন ইতিহাস শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায়। দুনহুয়াংয়ের বৌদ্ধ গুহাচিত্রগুলো সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে একেবারে জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল প্রদর্শনী কেন্দ্র, যেখানে মূল গুহায় ঢোকার আগে থ্রি–ডি প্রজেকশনে সবকিছু ব্যাখ্যা করা হয়।

অথচ এই আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্য বিলীন হচ্ছে না; বরং এক আশ্চর্য সহাবস্থান তৈরি হয়েছে। কুনমিংয়ের রাস্তায় পুরোনো চা-ঘরে বসে বৃদ্ধারা মাহজং খেলেন, আর ঠিক পাশের টেবিলেই তরুণীরা ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে। নানজিংয়ের ফুজি মিয়াও (কনফুসিয়াস মন্দির) চত্বরে সন্ধ্যার লন্ঠন জ্বালানো হয় হাজার বছর আগের রীতিতে, আর দর্শনার্থীরা সেটা আইফোনে লাইভ স্ট্রিম করছে, যেন সময়ের দুই স্তর একসঙ্গে বইছে। বাংলাদেশেও আমরা এখন কক্সবাজারে আধুনিক রিসোর্ট, সুন্দরবনে ইকো-ট্যুরিজম দেখছি, কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি আর পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্যে আমরা এখনো শিখছি। চীন এই ভারসাম্যের এক অসাধারণ কেস স্টাডি।

এত বছর চীনে থাকার পর, এখন যখন বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের কাছে চীনের গল্প করি, তখন সবচেয়ে সুন্দর যে মন্তব্যটা পাই সেটা হলো: ‘তুমি তো অর্ধেক চীনা হয়ে গেছ!’ সেটা শুনে হাসি পায়, কিন্তু সত্যিটা অন্য। আমি চীনা হইনি, আমি বরং একজন সেতু হয়েছি—দুই সংস্কৃতির মাঝে।

চীনা পর্যটকেরা এখন বাংলাদেশেও আসতে শুরু করেছেন। কক্সবাজারে চীনা ট্যুরিস্ট দলের সঙ্গে দোভাষী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাঁরা সৈকত দেখে মুগ্ধ (চীনে এত দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত নেই!), ইলিশ মাছ ভাজা খেয়ে অবাক, রিকশায় চড়ে ছবি তোলেন। আর বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্যও চীন ধীরে ধীরে সহজ হচ্ছে—কুনমিং, বেইজিং, গুয়াংঝৌ থেকে সরাসরি ফ্লাইট, ভিসাপ্রক্রিয়ায় ছাড়, ছাত্র বিনিময় প্রকল্প।

চীনা সরকারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশে পদ্মা সেতু রেল লিংক, কর্ণফুলী টানেল এগুলো শুধু অবকাঠামো নয়; বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা। যে চীনকে আমি ভালোবাসি, সে চীন শুধু ইকোনমিক পার্টনার নয়, সে এক শিক্ষক, এক বন্ধু। আর পর্যটন এই বন্ধুত্বের সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে কোমল মাধ্যম। যখন একজন সাধারণ চীনা কৃষক ইউনানের জমিতে দাঁড়িয়ে একজন বাংলাদেশি ছাত্রকে আপন ভাইয়ের মতো চা খাওয়ান, তখন কোনো রাষ্ট্রীয় চুক্তির দরকার পড়ে না কূটনীতি বুঝতে।

শেষ কথা: যে চীন আমার চোখে বাসা বেঁধেছে

২০২৬ সালের এই বসন্তে, নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকসের ল্যাব থেকে বের হয়ে যখন ক্যাম্পাসের চেরি ফুলের গাছগুলোর নিচে দিয়ে হাঁটি, তখন ইদানীং খুব বেশি করে মনে পড়ে ২০১৮ সালের সেই কুনমিংয়ের সকালটা। আট বছরে চীন আমাকে অনেক দিয়েছে—ডিগ্রি, ক্যারিয়ার, বন্ধু, ভাষা, এক নতুন করে বাঁচার সাহস। কিন্তু তার চেয়েও বড় উপহার হলো, চীন আমাকে তার সভ্যতার জানালা দিয়ে উঁকি মারতে দিয়েছে। আর আমি সেই উঁকি থেকে একটি গোটা জগৎ খুঁজে পেয়েছি।

আপনি যদি কখনো চীন ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, একটা ছোট্ট অনুরোধ রাখি: শুধু ক্যামেরার লেন্স দিয়ে নয়, একটু খোলা মন নিয়ে যাবেন। গ্রেট ওয়ালে দাঁড়িয়ে শুধু সেলফি নয়, চোখ বন্ধ করে কল্পনা করবেন সেই সৈন্যদের কথা, যাঁরা শীতের রাতে পাহারায় দাঁড়িয়ে বাড়ির কথা ভাবতেন। পশ্চিম হ্রদের পাড়ে বসে শুধু চা নয়, কবি সু দোংপোয়ের কবিতার একটা লাইন খুঁজবেন মনে মনে। সাংহাই বান্ডে দাঁড়িয়ে এক পাশের ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের নিদর্শন, আর অন্য পাশের আধুনিকতার গর্ব—দুই-ই একসঙ্গে অনুভব করবেন।

এমন এক চীন অপেক্ষায় আছে আপনাদের জন্যও।

লেখক: মোহাম্মদ মনসুর আলম শিক্ষার্থী, নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস এবং এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বার, বাংলাদেশ-চায়না ইউথ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।

তথ্যসূত্র: ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ (২০১৮-২০২৬)

চীন জাতীয় পর্যটন প্রশাসন (CNTA) প্রকাশিত পর্যটন তথ্য

‘চায়না ডেইলি’ ও ‘গ্লোবাল টাইমস’ পর্যটন বিভাগের প্রতিবেদন।