প্রবাসীর ঈদ: ভিডিও কলে স্নেহ–ভালোবাসার প্রকাশ আছে, পরশ নেই
রোজা। মুসলিম বিশ্ব কিংবা বাঙালি মুসলমানদের জন্য পুরো রমজান মাসটাই যেন আনন্দের। এই মাসে অধিকাংশ মানুষ ইসলামি রীতিনীতি অনুসরণে মনোযোগী হয়। ধর্মীয় অনুশাসনে থেকে দিনগুলো পার করতে যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। আমার কাছে রোজার পুরো মাসটাই উৎসবের। এই উৎসব অন্য উৎসবের মতো নয়। এটা ইবাদতের উৎসব। মনপ্রাণকে পবিত্র করা ও পবিত্র রাখার উৎসব। রমজান মাস রোজা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তারাবিহ, তাহাজ্জুদের নামাজ, সাহ্রি, ইফতার, জাকাত-ফিতরা, পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনাকাটা, উপহার দেওয়া-নেওয়া সব—মিলিয়ে এক মহা উৎসবের মাস এটি। আবারও বলি, এই উৎসব পবিত্র উৎসব।
দেখতে দেখতে রোজার দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। পশ্চিম আকাশে ঈদের বাঁকা চাঁদ উঠেছে। চলে এল ঈদ। ঈদ শব্দটাতে কেমন জানি লেপ্টে আছে খুশি-আনন্দ-উৎসবের আমেজ। শুধু উৎসব নয়, মহা উৎসব। শুধু আনন্দ নয়, অপরিসীম আনন্দ। শুধু খুশি নয়, অফুরন্ত খুশি। সেই শৈশবে ঈদ শব্দের সঙ্গে উৎসব-হাসিখুশি-আনন্দ জড়িয়ে গিয়েছিল, তা আর বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপায় নেই। হয়তো ঠিক আগের মতো উদ্যাপন করা হয় না, যেমনটা কৈশোরে হতো। পরিণত বয়সে এসে নিজে সেভাবে বাঁধনহারা ঈদ আনন্দ করতে না পারলেও শিশু–কিশোরদের থইথই আনন্দ দেখতে ভালো লাগে। ঘরের-বাড়ির-পাড়ার ও আত্মীয়স্বজনের ছোটদের আনন্দ-উল্লাস উদ্যাপন দেখেই বড়রা ছোটদের সমপরিমাণ আনন্দ উপভোগ করে। এই যেমন, পরিবারের শিশুদের ঈদের নতুন জামা কিনে দিলে তাদের খুশি দেখেই মা–বাবা অথবা চাচা–চাচি, মামা–মামিদের হৃদয়ে আত্মতৃপ্তি আসে। ঈদের দিন এই বাড়ির, সেই বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা আসে, ঈদের নানা পদের খাবার খেয়ে যাওয়ার সময় কম-বেশি যা-ই হোক, বখশিশ পেলেই খুশি মনে পকেটে ঢুকিয়ে নেয় তারা। বখশিশ পাওয়া টাকাগুলো নতুন কেনা মানিব্যাগে যত্নে রাখে, মেয়েরা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে রাখে। এসব দেখে বড়দের মন পুলকিত হয়। নতুন আত্মীয়বাড়িতে ঘরের ছোটদের নিয়ে দল বেঁধে যাওয়া, কিংবা আত্মীয়বাড়ি থেকে দল বেঁধে যারা আসে তাদের মেহমানদারি করা, ছোটদের বখশিশ দেওয়া—সবই মহা আনন্দের। আসলেই ঈদকে ঘিরে কত কত আনন্দ! সীমাহীন আনন্দ।
সেই খুশি, সেই আনন্দ কিছুই দেখা হয় না; উপভোগ করা হয় না—দূর পরবাসে থাকা মানুষগুলোর! হয়তো ভার্চ্যুয়ালি দেখা হয়, কথা হয়। কিন্তু ভার্চ্যুয়ালি ভাববিনিময়, আনন্দ ভাগাভাগি করা যে সুযোগ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ভালোভাবে শুরু হয়েছিল, সেটা আজ আরও বেশি অবারিত হলেও তা এখন আর সে রকম তৃপ্তি দেয় না। কারণ, বাস্তবতার সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালের তুলনা হয় না। বাস্তবে জায়গায় উপস্থিত থেকে যে আনন্দ হয়, তার তুলনাই হয় না। সন্তানদের কিংবা পরিবারের ছোটদের কাছে থেকে আদর করা আর ভিডিও কলে আদর করা কখনো কি এক হয়? কখনোই না। ভার্চ্যুয়ালি দেখা ও কথা বলা আর বাস্তবের স্নেহ-ভালোবাসার পরশে বিরাট তফাত।
প্রবাসেও যে যেভাবে পারেন হাসিখুশির মধ্য দিয়ে ঈদ উদ্যাপন করতে চান প্রবাসীরা। প্রবাসে আপনজন ছাড়া নতুন প্রবাসীদের হয়তো তেমন ভালো কাটে না ঈদের দিনটি। কিন্তু যাঁরা প্রবাসে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করেন, সঙ্গে ভাই ও অন্যান্য আত্মীয় কিংবা পাড়া–প্রতিবেশী স্বজনেরা একই সঙ্গে থাকেন তাঁদের ঈদ আয়োজন মোটামুটি উৎসবের হয়। আনন্দের হয়। তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে। প্রবাসে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনেরও ঈদ পুনর্মিলনীর মাধ্যমে ঈদের খুশি প্রবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। কোনো কোনো সংগঠন ঈদ–আনন্দ ভ্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করে থাকে।
এখন যেসব দেশে বাংলাদেশি প্রবাসী আছেন, সেসব দেশে দেশীয় খাদ্যসামগ্রী প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়। যেমন এই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কী কী খাদ্যপণ্য পাওয়া যায় তার তালিকা দীর্ঘ হবে, কী কী পাওয়া যায় না তার তালিকা ছোট হবে। কুয়ালালামপুরের অধিকাংশ জায়গায় এখন ছোট–বড় বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে। সেসব রেস্টুরেন্টে ঈদের দিন দেশের মতো সেমাই, ফিরনি, পায়েস, হালিম, চটপটিসহ ঈদের নানা পদের নানা স্বাদের খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানেও যেটা নেই সেটা হচ্ছে নিজের ঘরের পাশের ঘরের ও আত্মীয়বাড়ির পরম মমতাময়ী, স্নেহময়ী, ভালোবাসাময় নারীদের হাতে যত্নে বানানো ঈদের খাবার নেই। ঈদের খাবার আসলে কিনে খাওয়ার ব্যাপার নয়। আমরা দেশে ঈদের খাবার তৈরি করার জন্য কাঁচামাল কিনি; কিন্তু তৈরি করা খাবার নয়। ঘরে-ঘরে খাবার তৈরি হয় পরম মমতাময় হাতে।
প্রবাসে রেস্তোরাঁয় তৈরি খাবারে স্বাদ, গন্ধ সবই আছে; নেই শুধু স্নেহময় হাতের ছোঁয়া, মমতাময়ী মা-চাচি-বোন-ভাবিদের আন্তরিক পরশ। তাই তো বলি, প্রবাসীর ঈদে স্বজন আছে ভার্চ্যুয়ালি, বাস্তবে তাদের স্নেহ-ভালোবাসার পরশ নেই। যতক্ষণ ভিডিও কল চালু থাকবে ততক্ষণ এক বা একাধিক আপনজনের চেহারা দেখা যায়, কথা বলা যায়, তারা কী করছে, কী খাচ্ছে তা দেখা যায়, ছেলেমেয়েদের হাসি-কান্না দেখা যায়, কিন্তু কল বন্ধ করলেই তারা আর দৃশ্যমান নেই। তবে তারা আছে, তারা থাকে— কেবল অন্তরজুড়ে। তারা আছে চোখের কোনায় টলমল করা আবেগের জলোচ্ছ্বাসে!
যে বছর ঈদ দেশে করা সম্ভব হয় সে বছর আনন্দের সীমা থাকে না। তখন আগের বছর বা আগে টানা কয়েক বছর দেশে ঈদ করতে না-পারার বেদনা প্রশমিত হয়ে যায়। ফের যদি ঈদের সময় প্রবাসে থাকি, যোজন যোজন দূরে স্বজন থাকার ব্যথা উথলে ওঠে। মনের ভেতরের শূন্যতা অনুভূতির দরজা খুলে যায়। মনের শূন্যতা ছড়িয়ে পড়তে চাই শরীরজুড়ে। মনের ভেতরের এই শূন্যতা-অনুভূতিকে চরম চেষ্টায় মনের গহিনেই ধামাচাপা দিয়ে রেখে প্রবাসের আঙিনায় প্রবাসী বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে প্রবাসীর ঈদ আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়—কখনো নীরবে, কখনো সরবে।
লেখক: মালয়েশিয়াপ্রবাসী
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]