কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে গ্লোবাল মাদার ল্যাগুয়েজ লাভার্স সোসাইটির বিশেষ আয়োজন

ছবি: লেখকের পাঠানো

ভাষা আমাদের আত্মমর্যাদার ভিত্তি, আমাদের শিকড়। ভাষা ও মাতৃভাষার সঠিক সংরক্ষণেই টিকে থাকে জাতিসত্তা, ইতিহাস আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয়। বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই বিশেষ দিনটির ইতিহাস গ্রথিত আছে আমাদের ১৯৫২ সালের অমর একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাশহীদ ও ভাষাসৈনিকদের অসামান্য আত্মত্যাগের ওপর।

কানাডায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি গ্রেটার ভ্যাঙ্কুভারের ডেলটা শহরের ক্রসরোডস ইউনিটেড চার্চের কমিউনিটি হলে ১৯৫২ সালের অমর একুশে ফেব্রুয়ারির বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষাশহীদ ও ভাষাসৈনিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারর্স সোসাইটির (জিএমএলএলএস) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬’।

জিএমএলএলএসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে আছেন ড. আবদুল মতিন। ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন দুজন—মাইকেল দীপায়ন মিত্র ও হাসান মামুন। জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্বরত আছেন শফিউল আজম। প্রেসিডেন্ট আবদুল মতিন এই সংগঠনের সঙ্গে বিভিন্ন পদে প্রায় ১৪ বছর ধরে নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সামগ্রিক আয়োজনটি সাজানো হয়েছিল অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও ভাষা দিবসকে ঘিরে আলোচনা, বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান, কবিতা পাঠ ও সংগীত পরিবেশনার সমন্বয়ে এক হৃদয়স্পর্শী পরিবেশে। মঞ্চসজ্জায় শোভা পেয়েছিল বাংলার নারীদের সূচিশিল্পের বিস্ময়, কালো জমিনে বর্ণিল নকশিকাঁথা। এক পাশে ছিল লাল-সবুজ রঙে সংগঠনের লোগো, যার অভ্যন্তরে খচিত বিভিন্ন দেশের বর্ণসংবলিত একটি পোস্টার, যা পুরো আয়োজনকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা ও আবহ।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের ১৯৫২ সালের অমর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে গড়ে ওঠে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি দায়বদ্ধ এক আন্দোলনধর্মী উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা এবং ইউনেসকোতে অন্যতম প্রস্তাবক মরহুম রফিকুল ইসলাম এবং সহপ্রস্তাবক ও সংগঠনের স্থায়ী পরিচালক আবদুস সালামের নিজ হাতে গড়া সংগঠনের উত্তরসূরি এই সংগঠন হলো ‘গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারর্স সোসাইটি-জিএমএলএলএস। পরিবর্তিত সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল সংগঠনের নাম ও নতুন সাংবিধানিক কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও সংগঠনের নীতি, দর্শন ও মূল্যবোধ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

ছবি: লেখকের পাঠানো

সেদিনের এ আয়োজনে গ্রেটার ভ্যাঙ্কুভারের বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নেতৃত্বদানকারী এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার নেপথ্যে অবদান রাখা পাঁচজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় বয়োজ্যেষ্ঠ কমিউনিটি সদস্যকে জিএমএলএলএসের পক্ষ থেকে ‘মরহুম রফিকুল ইসলাম মেমোরিয়াল সম্মাননা’ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। সুন্দরভাবে ক্রেস্টগ্রহীতাদের নামখচিত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় মূল প্রস্তাবক মরহুম রফিকুল ইসলামের অসামান্য স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ তাঁর ছবি দ্বারা সাজানো এই ক্রেস্টের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ডক্টর শাহিদুর রহমান শাহীন। ক্রেস্ট গ্রহীতারা হলেন মেহেরুবা সালাম (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সহপ্রস্তাবক আবদুস সালামের স্ত্রী), মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদীন, জার্মান ভাষাভাষী রেনেট মার্টিন্স (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রস্তাবে একজন সহস্বাক্ষরকারী), জন আমিন বাঙালি এবং দিলরাস বেগম (মূল প্রস্তাবক রফিকুল ইসলামের স্ত্রী)। রেনেট মার্টিন্সের পক্ষে তাঁর ক্রেস্টটি গ্রহণ করেন তাঁর স্বামীর কনিষ্ঠ ভাই জনাব নিজামুদ্দিন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই কানাডা ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে কবিতা পাঠ ও সংগীত পরিবেশনা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। ‘আমি বাংলায় গান গাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এবং মাতৃভাষাবিষয়ক একটি ইংরেজি ভাষার গান পরিবেশিত হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন শ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা।

সংগীত পরিবেশন করেন তানিয়া ঘোষ, মোহর ঘোষ, মানন্যা চক্রবর্তী ও মাইকেল মিত্র। তাঁদের অপূর্ব কণ্ঠমাধুর্যে উপস্থিত সবাই মোহিত হন। মানন্যা ও তানিয়ার সুললিত কণ্ঠে ‘মাতৃভাষা আমার প্রাণ, মাতৃভাষা আমার গান’ এবং মাইকেল দীপায়ন মিত্রের অনবদ্য কণ্ঠে ‘আমি বাংলায় গান গাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এই কালজয়ী পরিবেশনায় শ্রোতারা সবাই কণ্ঠ দেন এবং দেশাত্মবোধের চেতনায় অভিভূত হয়ে পড়েন। উল্লেখ্য যে ‘মাতৃভাষা আমার মাতৃভাষা’ এই গানের রচয়িতা হলেন ডক্টর বার্থোলোমিয় সাহা মোহর গেয়েছিলেন ‘There is a language that gives me a breath’। সাবলীল ও সুন্দরভাবে কবিতা আবৃত্তি করেন দুলাল আল হোসাইন। এই আয়োজনে আমার বাবা ভাষাসৈনিক প্রয়াত ড. মকসুদুর রহমানের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিষয়ে কিছু বলার সুযোগ হয়।

ছবি: লেখকের পাঠানো

আলোচনা পর্বে ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কমিউনিটির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত শ্রদ্ধাভাজন সদস্য ব্যক্তিরা তাঁদের সমৃদ্ধ বক্তব্য দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদীন তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির আলোকে বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেন। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ড. আবদুল মতিন এই সংগঠন গড়ে ওঠার নেপথ্যের ইতিহাস, কারণ এবং আমাদের ও বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, গ্লোবাল মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স সোসাইটির আদর্শ ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং কানাডায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পটভূমি, মূল প্রস্তাবক মরহুম রফিকুল ইসলামের অবদান, এই উদ্যোগের সমস্যা ও সম্ভাবনা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং একুশে ফেব্রুয়ারির বিশেষ স্মৃতি—ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন দিক নিয়ে অন্যান্য বক্তারা মূল্যবান তথ্য ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। বক্তাদের প্রায় সবাই দীর্ঘ সময় ভ্যাঙ্কুভারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সফল করার প্রয়াসে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিবেদিতভাবে আছেন এবং সেই নিরিখে কাজ করে আসছেন। তাই তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ স্মৃতিময় অভিজ্ঞতার নির্যাস। তাঁরা জোর দেন, কানাডায় বাংলা ভাষার চর্চা যেন কেবল একটি দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন না হয়ে প্রতিদিনের চর্চায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোয় আমাদের শিকড়ের ইতিহাস, অমর একুশে ফেব্রুয়ারির মূল ইতিহাস যেন বিস্মৃত না হয়, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পায় তাঁদের আলোচনায়।

যাঁরা বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন প্রেসিডেন্ট আবদুল মতিন, শফিউল আজম, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান উপস্থাপক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম রফিকুল ইসলামের সহধর্মিণী দিলরাস ইসলাম (বুলি ভাবি), ইউনেসকোতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সহ-উপস্থাপক ও সংগঠনের আজীবন সদস্য আবদুস সালাম, গ্রেটার ভ্যাঙ্কুভারে ২০০৭ সালে প্রথম মেকশিফট শহীদ মিনার নির্মাতা আমিন বাঙালি, সৈয়দ নিজামুদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদীন, মাইকেল দীপায়ন মিত্র, আমি ফারজানা নাজ ও বিপুল কামাল। বক্তাদের স্মৃতিচারণা ও মাতৃভাষা বিকাশের নিরিখে মূল্যবান বক্তব্য এই অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে। জন আমিন বাঙালি একটি স্বরচিত স্মৃতিচারণামূলক কবিতা আবৃত্তি করেন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন মাহবুবুল ইসলাম, যিনি ভ্যাঙ্কুভারের একজন সুপরিচিত সমাজসেবী।

ছবি: লেখকের পাঠানো

কানাডার নিউ ওয়েস্টমিনস্টার ও বার্নাবি এলাকার ফেডারেল সংসদ সদস্য জেক সাওয়াটজকি এই বিশেষ আয়োজনে তাঁর বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই বার্তা সুন্দরভাবে পাঠ করে শোনান শফিউল আজম।

সমগ্র আয়োজনের ফটোগ্রাফি ও চিত্রধারণের দায়িত্বে ছিলেন অভিষেক চক্রবর্তী এবং বিভিন্ন কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুদীপ মুখার্জি। এই লেখার সময় আমাকে প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আবদুল মতিন, হাসান মামুন ও মাইকেল দীপায়ন মিত্র। তাঁদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
বাংলা ভাষা আমাদের শিকড়। কানাডার প্রবাসে সেই শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখার এই প্রয়াসের মাধ্যমে গ্লোবাল মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স সোসাইটির এই প্রত্যয় ও আয়োজন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়; মাতৃভাষা বাংলাকে, বাংলাদেশের ইতিহাসকে এবং বিশ্বের মাতৃভাষা রক্ষার নিরিখে এটি আমাদের বিশেষ দায়িত্ববোধ, আমাদের উত্তরাধিকার এবং একটি গভীর অঙ্গীকারের শিক্ষা দেয়।