নতুন প্রজন্ম কি আর বই পড়ে? প্রযুক্তির যুগে হারিয়ে যাচ্ছে পাঠাভ্যাস!

একটা সময় ছিল, যখন শিশুর হাতে স্মার্টফোন নয়, থাকত একখানা গল্পের বই। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বা ‘সুকুমার রায়’-এর ছড়া পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে পড়ত। আজকের শিশুর ঘুম আসে ইউটিউবের ভিডিও দেখে। স্কুলপাঠ শেষ করেই তারা ঝুঁকে পড়ে ট্যাবলেট বা মুঠোফোনের পর্দায়।

প্রশ্ন ওঠে—এই প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে নতুন প্রজন্ম কি আর বই পড়ে? নাকি বইয়ের গন্ধটাই ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে?

বইয়ের জায়গা দখল করে নিচ্ছে রিলস, গেমস, শর্ট ভিডিও, তরুণদের হাতে এখন মুঠোফোন, চোখে ইনস্টাগ্রাম রিলস আর টিকটকের ঝলক। তথ্য এখন হাতে মুঠোফোনেই, কিন্তু মনোযোগ নেই। কেবল স্ক্রলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে ‘পড়া’।

গভীর পাঠের চর্চা কমছে, দ্রুত বিনোদন হয়ে উঠেছে নতুন স্বাভাবিক। অথচ বই পড়া মানেই ছিল ধৈর্য, মনোযোগ ও চিন্তার অনুশীলন।

পরিসংখ্যান যা ভাবায়—

জাতিসংঘের ইউনেসকো ও ওয়ার্ল্ড রিডিং হ্যাবিটস রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ বছরে একটি বইও পড়ে না। বাংলাদেশের শহরকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ তরুণ দৈনিক গড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় মোবাইল স্ক্রিনে কাটায়। পাঠাগার ব্যবহারের হার গত এক দশকে প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

কী হারাচ্ছে এই প্রজন্ম?

ভাষাজ্ঞান ও শব্দভান্ডার সংকুচিত হচ্ছে, চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। কল্পনাশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে মনোযোগও ক্ষয় হচ্ছে। তরুণদের মানসিক চাপ ও একাকিত্বের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে। অথচ বই পড়া মানসিক প্রশান্তির এক কার্যকর উপায়।

প্রযুক্তি কী দিচ্ছে, বই কী দিচ্ছে?

প্রযুক্তি আমাদের দ্রুত জানাচ্ছে তথ্য, কিন্তু বই শেখায় ধৈর্য ধরে ভাবতে। স্ক্রিন দেখায় রঙিন ছবি, বই তৈরি করে ভাবনার ছবি। সোশ্যাল মিডিয়া দেয় ক্ষণিক আনন্দ, বই দেয় দীর্ঘস্থায়ী উপলব্ধি। তবে পরিবর্তনের আশাও আছে, বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধরনের পাঠ-আন্দোলন শুরু হয়েছে: বুকটিউবার ও বুক ইনফ্লুয়েন্সাররা তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করছেন।

অডিও বুক, ই–বুক, অনলাইন বুক ক্লাব—এসব প্ল্যাটফর্মে তরুণেরা বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ, গ্রাফিক নভেল সংস্করণ ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কল্পনা ও বাস্তব মিলছে নতুনভাবে।

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

করণীয় কী?

পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে পাঠ-সংস্কৃতি। শিশুর হাতে খেলনার সঙ্গে বই তুলে দিন। শিক্ষাপদ্ধতিতে পরিবর্তন দরকার—বইকে বোঝা নয়, আনন্দ হিসেবে উপস্থাপন করুন। লাইব্রেরিকে জীবন্ত করে তুলতে হবে—আধুনিক পাঠাগার, বই নিয়ে আড্ডার ব্যবস্থা দরকার। বইমেলাকে তরুণদের উৎসবে রূপ দিতে হবে, যেন সেটা হয় নতুন প্রজন্মের মিলনমেলা। সাহিত্যকে তরুণদের ভাষায় ও রুচিতে উপস্থাপন করা জরুরি, যাতে তারা নিজেরাই খুঁজে পায় আনন্দ।

বই কোনো প্রযুক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বই হতে পারে প্রযুক্তির বিকল্প নয়, সম্পূরক। তরুণ প্রজন্ম যদি বই না পড়ে, তাহলে তারা শুধু তথ্যভিত্তিক মানুষ হবে, চিন্তাশীল মানুষ নয়। যে সমাজে পাঠ নেই, সেখানে প্রকৃত প্রজ্ঞা জন্ম নেয় না। তাই আজকের প্রযুক্তির যুগেও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা মানে ভবিষ্যতের একটি আলোকিত সমাজ নির্মাণ করা। আমরা কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?