হেসেখেলে জীবনটা যদি চলে যায়

ছবি: লেখকের পাঠানো

আমি আমার দাদাকে চোখে দেখিনি। দাদা আমার জন্মের অনেক আগেই মারা যান। দাদার কথা আমি জেনেছি আমার মায়ের মুখে। মা বলতেন, দাদা প্রায়ই বলতেন, ‘আমাদের বড় ভাই বড় হয়ে মৃধা বাড়ির চেরাগ জ্বালাবেন।’ ছোটবেলায় এই কথার অর্থ আমি বুঝিনি। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মা, চেরাগ কী।’ মা বলেছিলেন, গ্রামের ভাষায় চেরাগ মানে বাতি। আমি তখন আবার জিজ্ঞেস করলাম, বাতি মানে কী। মা বললেন, ‘বাতি মানে আলো।’ এখানেই আমার সঙ্গে মায়ের তর্ক শুরু। আমি বললাম, ‘সন্ধ্যা হলেই তো মৃধা পরিবারের সব ঘরেই বাতি জ্বলে। তাহলে বড় ভাই বড় হয়ে নতুন করে কীভাবে চেরাগ জ্বালাবেন।’

মা তখন বুঝেছিলেন, আমি কথাটার গভীরে পৌঁছাতে পারিনি। বয়স তখন খুব কম। একাত্তরের যুদ্ধেরও আগের কথা। মা খুব যত্ন করে আমাকে বোঝালেন, চেরাগ মানে শুধু ঘরের আলো নয়, চেরাগ মানে দায়িত্ব। চেরাগ মানে পথ দেখানো। চেরাগ মানে পরিবার সমাজ আর দেশের জন্য আলোর উৎস হয়ে থাকা।

সময় গড়িয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হলো। আমাদের বড় ভাই ১৯৭৪ সালে সরকারি ভাতা পেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে গেলেন। তখন আবার সেই পুরোনো কথা ফিরে এল। মা খুব দৃঢ় কণ্ঠে বড় ভাইকে বলেছিলেন, ‘তুমি পরিবারের বড় সন্তান। তোমার দাদা তোমার কাঁধে এই বংশের আলো জ্বালানোর দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। বিদেশে পড়তে যাওয়া ভালো; কিন্তু ভুলেও জন্মভূমিকে ভুলে যেয়ো না। দেশের জন্য কাজ করবে। আলোটা যেন নিভে না যায়।’

আজ এত বছর পর আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বড় ভাই সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। শুধু কথায় নয়, কাজে। নিজের জীবন নিজের মতো গড়েও তিনি জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নহাটা।

ছবি: লেখকের পাঠানো

নহাটায় আমরা শুধু নিয়মিত কাজ করি, এমনটা নয়। সেখানে পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন করা হয়। ডিম, মাছ, দুধ ও মুরগি পালন করা হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের বাইরেও একটি বিষয় সেখানে খুব সচেতনভাবে লালন করা হয়েছে। তা হলো সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

নহাটার ক্যাম্পাসের চারপাশে ১০০টির বেশি খেজুরগাছ রোপণ করা হয়েছে। শুধু গাছ লাগানোতেই বিষয়টি থেমে থাকেনি। সেসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা চলছে।

নহাটায় গ্রামীণ আইসিটিভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ২০০৬ সালেই সেখানে ই–লার্নিং কার্যক্রম শুরু হয়েছিল; অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর গ্রামীণ সংস্কৃতি এখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নেই; বরং একে অপরের পরিপূরক হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ও শেখার পরিবেশ তৈরি করেছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo. com

খেজুরগাছ গুড় আর গ্রামীণ ঐতিহ্য আমাদের সমাজে একসময় খুব স্বাভাবিক ছিল। শীত এলেই গ্রামবাংলার বাতাসে খেজুরের রস আর গুড়ের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। গুড় আর পাটালি ছিল শুধু খাবার নয়; ছিল সামাজিক সম্পর্ক উৎসব আর পারিবারিক বন্ধনের অংশ।

আজ সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। খেজুরগাছ কমে যাচ্ছে। গাছির সংখ্যা কমছে। এই পেশা আর আগের মতো সম্মান বা নিরাপত্তা পাচ্ছে না। আধুনিক জীবনের চাপ, বিকল্প পেশার টান আর পরিকল্পনার অভাবে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় নহাটার উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে পাঠদানের পাশাপাশি সংস্কৃতি, প্রকৃতি আর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ এটি। শিক্ষার্থীরা এখানে শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে। টেকসই জীবনধারা আর ঐতিহ্যের মূল্য শিখছে।

খেজুরের গুড়ের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কম নয়। এটি পরিবেশবান্ধব স্থানীয় সম্পদনির্ভর এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি টেকসই উৎস। স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন ন্যায্যমূল্য আর আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে এর বাজার আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।

খেজুরগাছ রোপণ আর গুড়শিল্প সংরক্ষণকে নস্টালজিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সরকার স্থানীয় প্রশাসন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে এই ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ পেতে পারে।

দাদার বলা সেই চেরাগ আজও জ্বলছে। রূপ বদলেছে মাত্র। কোথাও তা শিক্ষায়, কোথাও প্রযুক্তিতে, কোথাও সংস্কৃতি আর গ্রামীণ জীবনের আলো হয়ে। হেসেখেলে জীবনটা যদি যায়, তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু জীবনের আলোটা যদি অন্যের পথে পড়ে, সেটাই আসল সার্থকতা।

আমি আশা করি, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে আমাদের বড় ভাইয়ের মতো মানুষ জন্ম নেবে। যারা শুধু নিজের সফলতার কথা ভাববে না, পরিবার সমাজ এবং দেশের দায়িত্বকেও নিজের জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে। যারা জানবে বিদেশে পড়া, কাজ করা বা বড় হওয়া মানেই শিকড় ছিঁড়ে ফেলা নয়; বরং যেখানে থাকুক না কেন, জন্মভূমির জন্য একটি আলো জ্বালিয়ে রাখা। এমন দেশপ্রেমী মানুষেরাই পারে নীরবে কাজ করে সমাজ বদলাতে। তাদের কাজ কোনো স্লোগান নয়, কোনো প্রদর্শনী নয়। তবু সেই কাজই একদিন গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় দায়িত্ব আর মানবিকতার আলো কীভাবে জ্বলে থাকে।

*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক এবং লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন