ভানুয়াতুতে কয়েক দিন যেভাবে কাটল

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ৮০টিরও বেশি দ্বীপ নিয়ে বিস্ময়কর এক স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র—ভানুয়াতু। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। স্বচ্ছ নীল সমুদ্র, প্রবালপ্রাচীর, সবুজ অরণ্য এবং সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য পর্যটকদের কাছে এক স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত এই দেশ। প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব ভাষা, নৃত্য, সংগীত ও আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে। ভানুয়াতুতে ১৩৮টিরও বেশি স্থানীয় ভাষা প্রচলিত, যা বিশ্বের অন্যতম ভাষাবৈচিত্র্যময় দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভানুয়াতু তার সক্রিয় আগ্নেয়গিরির জন্যও বিখ্যাত।

প্রাচীন মেলানেশিয়ান জনগোষ্ঠী হাজার বছর আগে এখানে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের আগমন ঘটে এবং দেশটি ফরাসি ও ব্রিটিশ যৌথ শাসনের অধীন ছিল। ৩০ জুলাই ১৯৮০ ভানুয়াতু স্বাধীনতা লাভ করে আজ একটি স্থিতিশীল সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ। ভানুয়াতুর জনসংখ্যা ৩ লাখ আর রাজধানী ‘পোর্ট ভিলা’-য় বসবাস করে ৩৫ হাজার জন মানুষ। ভানুয়াতুর অর্থনীতি মূলত: কৃষি, মৎস্য এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। নারকেল, কোকো, কফি এবং ফলমূল এখানে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়। পর্যটনশিল্প দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনন্য মিশ্রণ উপভোগ করতে। ভানুয়াতুর মানুষ স্বভাবগতভাবে অতিথি পরায়ণ, শান্তিপ্রিয় এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারায় অভ্যস্ত।

ভানুয়াতু ভ্রমণের ইচ্ছা ডিসেম্বর ২০২৪ থাকলেও সুযোগ হয়নি। পোর্ট ভিলাতে ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪। তাই এবারে ডিসেম্বর ২০২৫ অনেকটা হঠাৎ করে পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ‘নিউ ইয়ার’ উদ্‌যাপন ও ভ্রমণ করতে পোর্ট ভিলাতে যাব। সবাই মিলে ফ্লাইট, একোমোডেশন এবং অন্যান্য লজিস্টিক সম্পর্কিত তথ্যবহুল রিসার্চ করে ট্রাভেল প্ল্যান করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। সিডনি থেকে আকাশপথে পোর্ট ভিলার দূরত্ব প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। মাত্র ৩ দিনের প্রস্তুতিতে ভার্জিন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি-ব্রিসবেন-পোর্ট ভিলা ফ্লাইটের টিকিট কিনে, বুকিং ডট কম থেকে ‘ওয়াটার ভিউ’ ৩ বেডরুমের একটি ভিলা বুক করে পরিবারের সবাই চলে আসি ভানুয়াতুতে। ছোট পরিসরের পোর্ট ভিলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (Bauerfield International Airport নামেও পরিচিত) প্লেন থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে, হেঁটে অল্প দূরত্বের এরাইভাল লাউঞ্জে এসে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার মধ্যে লক্ষ্য করেছি হাসিমুখে সবার বিনয়ী ব্যবহার। বিমানবন্দরের বাহিরে এসে দেখি—আমাদের নাম প্রিন্ট করা কাগজ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের নিতে আসা হাস্যোজ্জ্বল-বিনয়ী এক ভদ্রলোক। পরিচিত হয়ে এগিয়ে যাই লিমোজিনের দিকে। পথিমধ্যে আলাপচারিতায় জানলাম আমাদের ড্রাইভার-ফ্রাঙ্ক একজন চায়নিজ বংশোদ্ভূত, অতীত জীবনে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দেশ টঙ্গাতে প্রথমে অভিবাসী হলেও পরবর্তী সময়ে পরিবার–পরিজন নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাস করেন এখানে।

বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরত্বে আমাদের ভিলাতে পৌঁছিয়ে গেলাম মাত্র ১৫ মিনিটে। গেটেড এই প্রপার্টিতে রয়েছে মোট ৭টি ভিলা—৪টি এক বেডরুমের এবং ৩টি তিন বেডরুমের। প্রতিটি ভিলার সামনেই বিস্তৃত লেকের মনোরম ওয়াটার ভিউ। সব ভিলাই দোতলা, আর প্রতিটিতে রয়েছে নিজস্ব প্রাইভেট সুইমিং পুল ও পার্কিং সুবিধা। ফ্রাঙ্কের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানলাম—পুরো ভিলা কমপ্লেক্সটি মাত্র এক মাস আগে (নভেম্বর ২০২৫) নির্মিত হয়েছে এবং এই প্রপার্টির একক মালিক তিনি নিজেই। অতিথিদের বিমানবন্দর থেকে আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে পুরো প্রপার্টি ম্যানেজমেন্টসহ অন্যান্য সবকিছুই দেখভাল করেন ফ্রাঙ্ক নিজেই। তাঁর কাছ থেকে আমরা কিছু দরকারি লোকাল টিপসও পেলাম।

ভানুয়াতুর সবাই ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ আর বিসলামা ভাষায় কথা বলতে পারে। বিসলামা একটি ভাষা—যার শব্দভান্ডারের মূল উৎস ইংলিশ এবং ব্যাকরণকাঠামো মেলানেশীয় ভাষাগুলোর ওপর ভিত্তি করে গঠিত। ফ্রেঞ্চ ভাষার কিছু প্রভাব রয়েছে বিসলামা ভাষাতে। সর্বজনীন ভাষা ইংলিশ হওয়ায় ভাষাগত কোনো সমস্যা নেই ভানুয়াতুতে। মাইক্রোবাস বলতে আমরা যে বাহনকে বুঝি—পোর্ট ভিলাতে তাকে বাস বলে। প্রতিটি বাসে ১২টি আসন। এই বাসের নেই কোনো নির্ধারিত রুট কিংবা টাইমটেবল। রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করলেই, বাসে যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন খালি থাকে তাহলে বাস থামবে, নতুবা না থেমে বাস নিজ গন্তব্যে চলে যাবে। আর তাই একটু অপেক্ষা করলেই অনায়াসে যেকোনো স্থান থেকে বাসে ওঠা-নামা করা যায় শহরের যেকোনো জায়গায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। শহরের মধ্যে যেকোনো জায়গায় যেতে ভাড়া ১৫০ ভাতু—যা প্রায় ২ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সমতূল্য (১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার = ৭৫-৮০ ভাতু)।

ওয়াটারফ্রন্ট রেস্টুরেন্টে ডিনারের মধ্যে সূর্যাস্তের মাধ্যমে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫–কে বিদায় জানিয়ে, স্থানীয় শিল্পীর কণ্ঠে বিখ্যাত ABBA-র জনপ্রিয় গানের লাইভ পরিবেশনা এবং গানের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য উপভোগ করার এক প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। খাবারের স্টল আর নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মিলিয়ে চারপাশে উৎসবের এক প্রাণবন্ত আবহ। ছোট পরিসরের আয়োজন হলেও নিউইয়ারের ফায়ার-ওয়ার্ক যেন পুরো শহরকে নতুন বছরের স্বপ্নে রাঙিয়ে তুলেছে—যা দেখতে ভালোই লেগেছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে পোর্ট ভিলায় ইংরেজি নববর্ষ উদ্‌যাপন সত্যিই অনন্য এবং স্মরণীয়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বেশ কয়েক দিন বাস রিজার্ভ করে আমরা অনেক ট্যুরিস্ট/এট্রাকশন স্পটে গিয়েছি। রেইনফরেস্টের মধ্যে Pepeyo Cultural and Educational Tour তার মধ্যে অন্যতম। সম্মুখযোদ্ধাদের ঐতিহ্যবাহী স্বাগত, নানা গাছগাছালির ঔষধি ব্যবহার, খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি, মাছ ধরা ও শিকার করার সরঞ্জাম ও কৌশল, গান‑নাচ এবং আগুনের ওপর হাঁটার অনুষ্ঠান—এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ভানুয়াতুর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি – ‘বড়দের সম্মান করা আর তাঁদের আনুগত্য করা।’ প্রায় এক ঘণ্টার তথ্যবহুল এই ট্যুর অত্যন্ত শিক্ষামূলক, গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য এবং চমৎকার। রেইনফরেস্টের ঘন সবুজের মধ্যে নানা ট্রপিক্যাল গাছের ভিড়ে ফল ধরা গাছে জাম্বুরা আর কাঁঠাল চোখে পড়ে—যা আমাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইটন সৈকত (Eton Beech) ভানুয়াতুর এফাতে দ্বীপের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এক মনোরম সমুদ্রসৈকত। স্বচ্ছ নীল পানি, সাদা প্রবালবালু এবং শান্ত পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। পোর্ট ভিলা থেকে প্রায় ৩০-৪০ মিনিটের ড্রাইভেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই সৈকতে। এখানে পৌঁছানোর পরে মনে হয়েছে—শহরের সব কোলাহল অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও এটি একটি জনপ্রিয় ডে‑ট্রিপ গন্তব্য। ইটন বিচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে প্রাকৃতিক সাঁতারের লেগুন। প্রবালপ্রাচীরের কারণে ঢেউ তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে। ফলে পরিবার, শিশু এবং সাঁতারপ্রেমীদের জন্য এটি অত্যন্ত নিরাপদ। পানির স্বচ্ছতা এতটাই বেশি যে দাঁড়িয়ে নীচের বালু ও ছোট মাছ দেখা যায়। অগভীর পানিতেই রঙিন সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য চোখে পড়ে। সৈকতের চারপাশে রয়েছে ঘন সবুজ গাছপালা, পিকনিকের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা, বসার বেঞ্চ এবং ছায়াযুক্ত এলাকা থাকায় পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ।

Avi Bay Turtle Sanctuary পোর্ট ভিলা এলাকার একটি কচ্ছপ কনসারভেশন সেন্টার। এখানে কচ্ছপদের ছোট থেকে যত্ন নেওয়া হয় এবং একটু বড় হলে ভানুয়াতু সরকাররের ফিশারিজ অফিসাররা কচ্ছপগুলোকে ট্যাগ করে সুরক্ষার আওতায় তাদের আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেন বলে শুনলাম। এখানে দর্শনার্থীরা সামুদ্রিক কচ্ছপ খুব কাছ থেকে দেখা, খাওয়ানো এবং নিরাপদ পানিতে তাদের সঙ্গে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা পায়। কচ্ছপের পাশাপাশি এখানে নারিকেল কাঁকড়া (Coconut Crab) ও কিছু ইগুয়ানা দেখার সুযোগ রয়েছে। ইগুয়ানা হাতে নিয়ে ছবি তোলার এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে।

পোর্ট ভিলার কাছে ব্লু লেগুন (Blue Lagoon) - লুকিয়ে থাকা এক অপূর্ব রত্ন। উজ্জ্বল নীল-ফিরোজা রঙের স্বচ্ছ পানি দূর থেকেই চোখে পড়ে। চারপাশের ঘন সবুজ জঙ্গল পুরো পরিবেশটিকে করে তোলে আরও মোহনীয়। পানির ওপর ঝুলে থাকা দড়ির দোলনাগুলো যেন মনে হয় সবাইকে ডাকছে - একটু সাহস করে লাফিয়ে পড়ুন, আর প্রকৃতির শীতল আলিঙ্গনে ডুবে যান! সূর্যের আলো পানিতে পড়ে যে নীলাভ ঝিলিক তৈরি করে—তা সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। শান্ত, নির্জন ও ছবির মতো সুন্দর এই স্থান ছবি তোলা, রিলাক্স করা, সাঁতার কাটা কিংবা শুধু নীরবে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য একেবারে নিখুঁত। আমাদের বাচ্চারা যখন ব্লু লেগুনের পানিতে সাঁতার কাটছে, কখনো আবার ঝুলে থাকা দড়ির দোলনা ধরে আনন্দে পানিতে লাফিয়ে পড়ছে, তখন আমার সহধর্মিণী আর আমি চেয়ারে বসে চীনাবাদাম খেতে খেতে চারপাশের সৌন্দর্য, পানির রং, জঙ্গলের গন্ধ, বাতাসের শব্দ উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছি, যা দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো।

প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার আর দৃষ্টিনন্দন ভিউপয়েন্ট যাঁদের পছন্দ, তাঁদের জন্য স্কাইব্রিজ নিঃসন্দেহে পোর্ট ভিলা ভ্রমণের তালিকায় রাখার মতো এক স্মরণীয় গন্তব্য। এখানে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে পুরো শহর, উপকূল আর নীল সমুদ্রের অপূর্ব মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য একনজরে দেখা যায়। নিজ দায়িত্বে ওঠার মুচলেকা দিয়ে স্কাইব্রিজে আরোহন করতে হয়। সবুজ পাহাড়ের ওপর ঝুলে থাকা ১২০মিটার দীর্ঘ এই সাসপেনশন ব্রিজে হাঁটতে হাঁটতে নিচের ঘন জঙ্গল, দূরের সমুদ্ররেখা আর আকাশের রং বদলের খেলা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের ওপর পেতে রাখা সাজানো আরামদায়ক ইজি চেয়ারে বসে আমার সহধর্মিণী আর আমি—সমুদ্র, আকাশ আর প্রকৃতির বর্ণিল সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়েছি।

পোর্ট ভিলার Club Hippique Adventure Park - সবুজ পাহাড়, নারিকেল গাছ আর খোলা প্রান্তরের মাঝ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো—এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ঘোড়ায় চড়ার পুরো রাইডে অভিজ্ঞ গাইডরা অন্য ঘোড়ায় কাছাকাছি থাকে। তাই নতুনরাও নিশ্চিন্তে ঘোড়ায় চড়া উপভোগ করতে পারে। কখনো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, কখনো সমুদ্রতীরের কাছাকাছি পথ ধরে চলার পথে পোর্ট ভিলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক অন্য রকমভাবে চোখে ধরা দেয়। প্রকৃতি আর শান্ত পরিবেশে পরিবারের সবাই মিলে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর জন্য এক শান্ত ও মনোমুগ্ধকর অ্যাডভেঞ্চার স্পট।

পোর্ট ভিলার উপকণ্ঠে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম ‘মেলে’। একটি মসজিদ আছে এই গ্রামে। নাম – Jame Mosque Bladiniere Vanuatu Masjid। নতুন শহরে কিংবা দেশ ভ্রমণে—মসজিদের তথ্য নেওয়া, ভিজিট করা এবং নামাজ পড়া আমাদের এজেন্ডাভুক্ত থাকে। পোর্ট ভিলাতেও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। মেলের মুসলিমরা ১৯৯২ সালে এই এলাকায় একটি ‘প্রেয়ার-হল’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানলাম—২০১৪ সালে ১,২৫০ স্কয়ার মিটারের জমি ১.২ মিলিয়ন ভাতু (প্রায় ১৬,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার) মূল্যে কিনে ২০১৫ সালে মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ৫০০ জন মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভানুয়াতুর মুসলিমরা এই মসজিদে প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজসহ প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। শুনলাম—জুমার নামাজে প্রায় ১০০ জন মুসল্লি আসেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি।

পোর্ট ভিলায় ভানুয়াতুর পার্লামেন্ট হাউস অবস্থিত। আর তার কাছেই রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন। এই দুটি ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মনে হয়েছে—এই গুরুত্বপূর্ণ ভবন দুটি উভয় দেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতির শক্তিশালী প্রতীক। দুই দেশের বন্ধুত্ব, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এখান থেকে।

পোর্ট ভিলা সেন্ট্রাল মার্কেট—ভানুয়াতুর আসল প্রাণস্পন্দনের জায়গা। শাকসবজি—টমেটো, বেগুন, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, বরবটি, লাউ, মুলা, কাঁচা মরিচ, ইয়াম, ট্যারোসহ বিভিন্ন ধরনের ফল—আম, কাঁঠাল, কলা, চাম্পা কলা (মানকি বানানা), আতা, আনারস, তরমুজ, ডাব, নারকেল, জাম্বুরা, এভোগাডো, চীনাবাদাম, ইত্যাদি ছাড়াও নানা ধরনের স্থানীয় ফুল পাওয়া যায় এখানে। সবকিছু একেবারেই তরতাজা। মনে হয় বাগান কিংবা খেত থেকে এইমাত্র তুলে আনা হয়েছে। সবকিছুর সঙ্গে মিশে আছে স্থানীয় বিক্রেতাদের ও মানুষের সহজ-সরল হাসি আর অনাবিল আন্তরিকতা। বাজারে নেই কোনো কাদাপানি, নেই কোনো হাঁকডাক-চেঁচামেচি। বিক্রেতারা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন, কেউই জোর করে কিছু বিক্রি করতে চান না। ডাব, নারকেল, আনারস, তরমুজ, চীনাবাদাম, ইত্যাদি কেনার মধ্যে বাজারের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে আমরা সবাই আন্দন্দিত।

কেনাকাটার জন্য চেইন স্টোর/সুপারমার্কেট – ACM, Tropical Market ইত্যাদিতে গিয়ে দেখি—স্থানীয় ও পর্যটকদের কাছে পরিচিত কেনাকাটার জায়গা, যেখানে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন গৃহস্থালি ও ব্যবহারিক সামগ্রী পাওয়া যায়। সব ধরনের প্যাকেজকৃত অস্ট্রেলিয়ান ব্র্যান্ডেড প্রোডাক্ট পাওয়া যায় এখানে। ব্রাজিলের বিখ্যাত “Sadia” ব্র্যান্ডের হালাল—চিকেন ও চিকেন সসেজ ফ্রোজেন রেফ্রিজারেটরে দেখে অভিভূত হয়েছি। দোকানের পরিবেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বচ্ছন্দ, আর কর্মীরা খুবই সহায়ক, যা ভানুয়াতুর মানুষের স্বাভাবিক আন্তরিকতারই প্রতিফলন। কয়েকটি এক্সক্লুসিভ জাপানিজ ইমপোর্টেড দোকানে গিয়ে আমাদের প্রিয় প্রোডাক্ট পেয়ে আনন্দিত হয়েছি। লক্ষণীয় বিষয়, এখানে নেই কোনো প্লাস্টিকের তৈরি কিংবা ‘রি-ইউসএবল/ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক’ লেখা ব্যাগের ব্যবহার।

পোর্ট ভিলায় এক দিন ইঞ্জিনচালিত নৌকাভ্রমণ করে ভানুয়াতুর সৌন্দর্যকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ হয়েছে। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানি, চারপাশে সবুজ দ্বীপ আর হালকা সমুদ্রের বাতাস—ছোট ছোট উপসাগর, জেটি, স্থানীয় বাচ্চাদের পানিতে খেলা এবং মাছ ধরার দৃশ্য চোখে পড়ে, যা ভ্রমণকে আরও জীবন্ত করে তোলে। শান্ত পানির ওপর দিয়ে চলার পথে মনে হয়েছে—ঘড়ির কাঁটা যদি একটু ধীরে ধীরে চলতো তাহলে প্রকৃতির ছন্দ ও গল্প গুলো আরও বেশি সময় নিয়ে উপভোগ করা যেত!

পোর্ট ভিলাতে (ডিসেম্বর ২০২৪) শক্তিশালী ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতের চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। পোর্ট ভিলার প্রধান জেটিতে ভূমিকম্পজনিত ক্ষতির পর থেকে পোর্ট ভিলা অস্থায়ী অফশোর পোর্ট হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ—ক্রুজ জাহাজগুলো উপকূলের বাইরে নোঙর করে এবং যাত্রীদের তীরে আনার জন্য ছোট নৌকা ব্যবহার করতে হচ্ছে। পূর্ণ মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ভানুয়াতু একটি শক্তিশালী ক্রুজ মৌসুমের প্রত্যাশা করছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ভানুয়াতুর বিভিন্ন বন্দরে ১২৫টিরও বেশি ক্রুজ জাহাজ (কার্নিভাল, রয়্যাল ক্যারিবিয়ান, ইত্যাদি) আগমনের সূচি রয়েছে। ভানুয়াতুতে বাৎসরিক মোট ভিজিটরের ৬৬ শতাংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। প্রতিবছর আনুমানিক ১ লাখ মানুষ অস্ট্রেলিয়ান ভানুয়াতুতে ভ্রমণ করেন—যার অধিকাংশ ক্রুজ জাহাজে। আর তাই ছোট দোকান কিংবা বাজার ছাড়া ট্যুরিস্ট/এট্রাকশন স্পটের প্রবেশ ফি দেওয়াসহ যেকোনো জায়গায় কিংবা কেনাকাটায় অস্ট্রেলিয়ান ডলার অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডাটা (২০২৪–২৫) অনুযায়ী, ভানুয়াতু ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনা করলে দেখা যায়—জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার (৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ভানুয়াতুর (১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) তুলনায় অনেক বড় হলেও, মাথাপিছু আয়ে ভানুয়াতু (৩ হাজার মার্কিন ডলার) বাংলাদেশের (২ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার) চেয়ে এগিয়ে। তবে বেকারত্বের হার দুই দেশেই প্রায় একই রকম (৫ শতাংশ)। জীবনমানের দিক থেকে ভানুয়াতু কম জনসংখ্যা ও উচ্চ মাথাপিছু আয়ের কারণে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি হয়েছে, বিশাল জনসংখ্যার জন্য সেবা সম্প্রসারণে ধারাবাহিক উন্নতি দেখা যায়, যদিও মানগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অন্যদিকে ভানুয়াতুতে সেবাকাঠামো ছোট হলেও জনসংখ্যা কম হওয়ায় মৌলিক সেবার অ্যাক্সেস তুলনামূলকভাবে সহজ। পর্যটন খাতে ভানুয়াতু অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক ভিজিটর সার্ভে অনুযায়ী, ভানুয়াতুর প্রধান আয়ের উৎস—পর্যটন। বাংলাদেশেও পর্যটন খাত বাড়ছে, তবে অবকাঠামো, প্রচারণা ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

পোর্ট ভিলায় এক সপ্তাহ অবস্থানকালে অনেক জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে—কিন্তু কোথাও কোনো ভিক্ষুক কিংবা হোমলেস দেখিনি। অনেক স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের সঙ্গে দেখা এবং কথা হয়েছে। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম—ভানুয়াতুর ২১ থেকে ৪৫ বয়সীরা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে আসেন ৬ থেকে ৯ মাস ভিসা নিয়ে—ফ্রুট পিকিং, শেফ, বার টেন্ডার, কফি মেকার, হসপিটালিটি, হাউস কিপিং, ইত্যাদি পেশায় কাজ করার জন্য। অধিকাংশ পরিবারের এক কিংবা একাধিক সদস্য, এমনকি স্বামী–স্ত্রী একসঙ্গেও অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। অস্ট্রেলিয়া ও ভানুয়াতু সরকারের মধ্যে থাকা কর্মসূচির আওতায় এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভানুয়াতুর দক্ষ জনশক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শিল্পে অবদান রাখার পাশাপাশি নিজেদের জীবনমান উন্নত করেন এবং তাঁদের পাঠানো কিংবা সঙ্গে নিয়ে আসা রেমিট্যান্স ভানুয়াতুর অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লক্ষণীয়—স্থানীয় সবার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার জীবনধারা সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে।

পোর্ট ভিলাতে রাস্তার ওপর ছোট সাইজের ‘রাউন্ড-এবাউট’ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যানবাহনের চলাচল। পুলিশ, ট্রাফিক লাইট, ক্যামেরা কিংবা স্পিড-লিমিট সাইন চোখে পড়েনি কোনো রাস্তায়। স্পিড-লিমিট নেই বলে রাস্তায় কাউকে বেপরোয়া কিংবা দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতেও দেখিনি। রাস্তায় চলমান যানবাহনের মধ্যে নেই কোনো ওভারটেক করার প্রতিযোগিতা কিংবা ভেঁপু বাজানো। মনে হয়েছে—এখানে বসবাসকারী সবাই এক অলিখিত নিয়মের সুশৃঙ্খল অনুসারী।

পোর্ট ভিলার বর্ষাকাল সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির সময় জানুয়ারি থেকে মার্চ। এ সময়ে আবহাওয়া থাকে গরম ও আর্দ্র, ঘন ঘন ট্রপিক্যাল বৃষ্টি এবং ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা থাকে। আমরা পোর্ট ভিলাতে পৌঁছানোর তিন দিন আগে পর্যন্ত টানা অনেক দিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে শুনলাম। তবে আমরা যে সপ্তাহ পোর্ট ভিলাতে ছিলাম তখন এক দিনও বৃষ্টি হয়নি, আর তাপমাত্রা ২২ থেকে ২৯ডিগ্রি। ফলে আমাদের পুরো ভ্রমণটাই ছিল বেশ আরামদায়ক ও উপভোগ্য।

ভানুয়াতু ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’–এর ওপর অবস্থিত বলে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়া এবং উপকূল ক্ষয়ের মতো সমস্যায় দেশটি আরও বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই দ্বৈত চাপ ভানুয়াতুর মানুষের জীবনযাপন, অবকাঠামো এবং পরিবেশকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি তার অপূর্ব সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় পরিবেশ এবং এখানে বসবাসরত মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা সহজেই যে কাউকে মুগ্ধ করে। ভানুয়াতু শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয় বরং এক সমৃদ্ধ জীবন্ত সংস্কৃতি ও অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়ের ভান্ডার। ভানুয়াতুর উষ্ণ আবহাওয়া ও আগ্নেয় মাটির পুষ্টিতে বেড়ে ওঠা—কচি ডাবের পানি যেন অমৃতধারা; নারকেলের কোমল শাঁসে নিখাদ মাধুর্য; আনারস রসালো, মোলায়েম, মিষ্টি স্বাদের এবং তীব্র সুবাসের; তরমুজ অসাধারণ; চীনাবাদাম সাধারণের তুলনায় আরও ক্রিস্পি—একমুঠো খেলেই অনন্য জাদু; এখানকার চাম্পা কলা (মানকি বানানা) আকারে ছোট হলেও অবিশ্বাস্যভাবে মিষ্টি, সাধারণ কলার তুলনায় আরও সুগন্ধি ও নরম। সব কিছুতেই—ভানুয়াতুর প্রকৃতির বিশুদ্ধ স্বাদের অনুপম অনুভূতি!

ভানুয়াতু থেকে ফেরার সময় আমাদের সবার মনে হয়েছে—ভানুয়াতু শুধু সমুদ্র আর দ্বীপের দেশ নয়, এটি মানুষের উষ্ণতা আর সরলতার দেশ। এই দেশ চোখে দেখার পাশাপাশি হৃদয় দিয়ে অনুভব করার জায়গা।