ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সিটি মালাক্কা ভ্রমণ, ক্ল্যাবাং সৈকতের চালুচরে তারুণ্যে ফেরা: পর্ব ২

এবার মালাক্কা শহরে এসে এখানকার অন্যতম আকর্ষণ লিভারক্রুজ বন্ধ পেলাম। লিভারক্রুজ বন্ধ থাকায় আশেপাশের এলাকায় পর্যটকদের জন্য বিনোদনের যা যা ছিল, সবই বন্ধ। লিভারক্রুজ বন্ধ থাকার কারণ সম্ভবত পর্যটন এলাকাটি সংস্কার করা হবে। সংস্কার মানেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও নতুনত্বের, আরও অভিনবত্বের সংযোগ হবে। যাঁরা আগে এসেছিলেন, দেখেছিলেন এখানকার রঙিন সৌন্দর্য, তাঁরা যেন আবারও আসেন। তাঁদের যেন একই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বিরক্ত না লাগে। সংস্কার শেষ হলে আসতেই হবে নবরূপে কেমন সাজে মালাক্কা শহরে বয়ে চলা মালাক্কা নদী। মালাক্কা নদীর জলে ঢেউয়ের তালে তালে বোটে চড়ে দেখব নদীর দুপাশের রেস্তোরাঁয় বসে থাকা পৃথিবীর নানা দেশের পর্যটকদের। মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাব। এবার নদী এলাকায় সবকিছু বন্ধ হওয়ায় আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল কিছুটা। নদীর ওপারে এসে আমরা মালয় তমিয়াম রেস্তোরাঁয় খেতে বসলাম। আমাদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম রতন ভাই মালয়েশিয়ায় আছেন দীর্ঘ ৩০ বছর। মালয় খাবারের স্বাদ সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞ। তিনি দারুণ কিছু মজাদার খাবার অর্ডার করলেন। খাবারের তালিকায় সাদা ভাত, ডিম ভাজি, শাক ভাজি, সবজি, সামুদ্রিক কোরাল মাছের তিগা রাসা (একই মাছে টক-ঝাল-মিষ্টি) চারটা, স্যুপ তমিয়াম সি-ফুড চারটা, আয়াম কুনিদ ও চার প্রকারের জুস।

কুয়ালালামপুরে মালয় খাবার ও সি-ফুডের জন্য বিখ্যাত এলাকা হচ্ছে কামপুং বারু। পেট্রোনাস টু ইন টাওয়ারের পাশেই কামপুং বারু। কামপুং বারুতে খাবারের অনেক দাম। মালাক্কার এই রেস্তোরাঁয় একই খাবার একটু কম দামেই খেলাম। স্বাদ-ও কামপুং বারুর চেয়ে অনেক ভালো। মোটামুটি সবাই তৃপ্তি পেয়েছেন রাতের খাবার খেয়ে। বলা যায়, অনেক দিন পর মজাদার সি-ফুড বা ভালো একটি কেডায় তমিয়ামে খাবার খেলাম। সবাই স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বেশি খেয়েছেন। কেউ কেউ মুখে বলছেন, কারও কারও শরীরের অঙ্গভঙ্গি বলে দিচ্ছে! মালাক্কায় মালয় রেস্তোরাঁয় অনেকক্ষণ সময় নিয়ে খাওয়াদাওয়ার পর মনে হলো, মালাক্কার স্থায়ী নাগরিকেরা মালয়েশিয়ার অন্যান্য জায়গার মালায়ুর চেয়ে বেশি ভালো। পর্যটকদের জন্য সবকিছু বন্ধ হওয়ায় রেস্তোরাঁয় অন্য যাঁরা কাস্টমার ছিলেন, তাঁদের সবাই স্থানীয় নাগরিক। ঈদের রাতে পরিবার নিয়ে বাইরে খেতে এসেছেন। আমাদের কথায়, গল্পে কাউকে বিরক্ত হতে দেখলাম। এখানকার মানুষ উদার বলা যায়। বিশেষ করে কুয়ালালামপুরের মানুষের চেয়ে তাঁরা সহজসরল কিছুটা।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আমাদের রাতের খাওয়ার পর্ব শেষ। এখনো রাত সড়ে দশটা মাত্র। তাই সেখানেই সিদ্ধান্ত হলো এখনই হোটেলে না গিয়ে গাড়ি নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরে এলে ভালো হয়।

সবাই চলে গেলাম কৈশোর বেলার খোঁজে, তারুণ্যের প্রথম দিকের দুরন্ত সময়গুলোর খোঁজে, কলেজজীবনের প্রেমময় স্মৃতিগুলোর খোঁজে। চলে গেলাম ক্ল্যাবাং বিচে। ক্ল্যাবাং বিচ মূল শহর থেকে তেমন দূরে নয়। আধাঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেলাম বিচে। ক্ল্যাবাং বিচে এর আগে যাওয়া হয়নি, এবারই প্রথম। দারুণ জায়গা।

মালয়েশিয়ার যত সৈকতে গিয়েছি সব সৈকত-ই শান্ত প্রকৃতির। ক্ল্যাবাং সৈকতও শান্ত। কক্সবাজারের মতো সমুদ্রে বড় বড় ঢেউ নেই, ঢেউয়ের গর্জন নেই, হইচই নেই। কিন্তু সৈকতে আছে রাতজাগা মানুষের আনাগোনা। এই মধ্যরাতেও সৈকতের বালুচরে অনেক মানুষ। সেটা ভালো লেগেছে। সৈকতে মানুষ কম থাকলে হয়তো ভালো লাগত না। সৈকতে শুধু বড়রা নয়, শিশুরাও আছে। ঈদের দিন গড়িয়ে রাত। একেবারে মধ্যরাত। কিছু তরুণ তাদের আতশবাজি নিক্ষেপ করছে সমুদ্রজলে। জলেও আতশবাজি ফোটানো যায় আগে জানতাম না। তাদের আতশবাজির ছোঁয়ায় শান্ত সমুদ্রজলে আলোকোজ্জ্বল আভা ফুটে উঠছে। আতশবাজি কখনো ছুটে মারছে দূর আকাশপানে। আতশবাজির ঝলকানিতে আকাশ আলোকিত হয়ে যাচ্ছে। আওয়াজে মুখর হয়ে যাচ্ছে সৈকতের বিশাল চালুচর পেরিয়ে ঝাউবাগান পর্যন্ত। মূল সড়কের দুই পাশে আছে দুটি প্লে গ্রাউন্ড। ছোটবড় সবার নানা মজার রাইটস ও নানা খেলার আয়োজন সেখানে। চারদিকে দেখলে মনে হচ্ছে আমাদের বৈশাখী মেলা বা বিজয় মেলার মতো। রঙিন আলোয় আলোকিত পুরো এলাকা। অন্যদিকে সৈকতে সোডিয়াম লাইটের নরম আলোয় পরিবেশ দেখাচ্ছে সন্ধ্যা পেরুলো মাত্র। অথচ তখন দিবাগত রাত একটা।

সৈকতের বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় কয়েকটা ফাটা টায়ার পেলাম। সেখানেই বসে পড়ল আমাদের কয়েকজন। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে। শুরু হলো গানের আসর। নব্বই দশকের গান থেকে শুরু করে হালে আলোচিত গান যে যেভাবে পেরেছেন, যতটুকু পেরেছেন গেয়ে শুনিয়েছেন। বয়সে সবার সিনিয়র আমিন ভাই, যত গান গেয়েছেন সবই প্রেমের গান, ভালোবাসার গান। তিনি সত্যি সত্যিই ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর তারুণ্যে, তাঁর প্রেমের সময়ে, একেবারে আশির দশকে; কখনো নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে! তাঁকে মাঝে মাঝে সেখান থেকে টেনে এনেছেন নব্বই দশকে ও একুশ শতকের প্রথম দিকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মোস্তফা ইমরান রাজু ভাই , কাদের ভাই, জহিরুল ইসলাম হিরণ ভাই ও মোস্তাক রয়েল শান্ত ভাই। তাঁরা গানে গানে নব্বই ও শূন্য দশকে ডুব দিলে তাঁদের চেয়ে অধিকতর তরুণ কায়সার হামিদ হান্নান, সাঈদ হক, বাপ্পী ও জনি নতুন গান ধরে তাঁদের উদ্ধার করেন। চল্লিশোর্ধ্ব বড় ভাইদের ফিরিয়ে আনেন বর্তমানে। আমি হাততালি দিয়ে তাঁদের সবাইকে প্রেরণার মধ্যে রেখে মধ্যরাতের এই আনন্দ-আয়োজন দীর্ঘ করার প্রয়াস করেছি। ভ্রমণ দলে রাজু ভাইয়ের সহধর্মিণী ছিলেন। তিনি সৈকতে যাননি, ছেলে রিশানকে নিয়ে হোটেলেই ছিলেন আমাদের আরবিনা ইমরান ভাবি। এতে আমাদের লাভ হয়েছে ঢের। রাজু ভাই নির্ভয়ে মুক্ত মনে ফিরে যেতে পেরেছিলেন নব্বই দশকে; আরবিনা ভাবির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পূর্বের সময়ে। মৌমাছির মতো ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্নময় দিনে। মনে মনে হারিয়ে যাওয়া বেহিসাবি অসংখ্য খুচরা প্রেমের স্মৃতি রোমন্থনে কোনো বাধা ছিল না। মধ্যরাতে মালাক্কার ক্ল্যাবাং সৈকতে নাচে-গানে-কৌতুক, হাসি-ঠাট্টা ও কথামালায় স্মরণীয় একটা অধ্যায় শেষ করে আমরা ফিরে এলাম হোটেল রুমে। ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম ঈদের নামাজ পড়ার জন্য। তখন থেকে এখন রাত তিনটা পর্যন্ত টানা দারুণ সচল ছিলাম আমরা। হোটেলে এসে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ক্লান্ত শরীর বিছানায় ছেড়ে দিলাম।

পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় ঘুম থেকে জেগে আবারও গোসল সেরে তৈরি হলাম বের হওয়ার জন্য। আমাদের রুমের চারজন খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে লবিতে এলেও অন্য রুমের হিরুরা বের হতে হতে ঘড়ির কাঁটা ১১টা পেরিয়ে যাওয়ার দিকে ঘুরছে। শেষ পর্যন্ত সবাই হোটেলের পাট চুকিয়ে মালাক্কা রায়ায় গিয়ে পৌঁছালাম সাড়ে ১১টার দিকে। সেখানে একটা বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় মাছ, মাংস, সবজি দিয়ে গরম গরম ভাত খেয়ে নিল সবাই। সকালের নাশতা বাদ গেল দেরি হওয়ার কারণে। তাই খরচ কিছুটা বেঁচে গেল। আমাদের খরচাপাতির হিসাবের দায়িত্বে থাকা হিরণ ভাই মনে মনে খুশি। তাঁর খুশি দ্বিগুণে পরিণত হয়েছে—খাবার টেবিলে আমিন ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো মালাক্কায় ব্যবসা করেন এমন এক বাংলাদেশি ভাইয়ের। শেষ পর্যন্ত তিনিই আমাদের খাবারের বিল দিয়ে দিলেন। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ ভাইটির আয়-রোজগারে বরকত দান করুক। আমার খাওয়া শেষে অন্যরা খাওয়ার ফাঁকে রেস্টুরেন্ট রেখে বের হয়ে চারিপাশে একটু হেঁটে এলাম। ছিমছাম শহর। মালাক্কা শহরে কুয়ালালামপুরে মতো আকাশছোঁয়া ভবন নেই। ইদানীং কিছু কিছু জায়গায় আকাশের দিকে মুখ করে অল্পকিছু ভবন হয়েছে। তা-ও কুয়ালালামপুরের তুলনায় নগণ্য। সেটাই ভালো লেগেছে।

কুয়ালালামপুরে অসংখ্য সুউচ্চ ভবনের ভিড়ে থাকতে থাকতে ছিমছাম মালাক্কা শহরে ঘুরতে ভালো লাগছে। মালয়েশিয়ার ১৩টি প্রদেশের মধ্যে চারটি প্রদেশের মধ্যে সুলতান বা রাজপরিবার নেই। এর মধ্যে দুটি হচ্ছে বরনিউ দ্বীপে—সাবাহ ও সারাওয়াক। অন্য দুটি হচ্ছে পেনাং ও মালাক্কা। মালাক্কার প্রাদেশিক প্রধান হচ্ছেন গভর্নর। দেশের রাজা কর্তৃক গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রশাসন পরিচালনার জন্য রয়েছে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার। কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার জাতীয় জাদুঘরে গেলে সমগ্র মালয়েশিয়ার নানা ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মৃতিস্মারকগুলো দেখা যায়। মালয়েশিয়ার নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে জাতীয় জাদুঘর ‘মিউজিয়াম নেগারায়’। মিউজিয়াম নেগারায় এককভাবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মালাক্কা প্রদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন। মালাক্কার সুলতানি আমল থেকে শুরু করে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক, ডাচ ঔপনিবেশিক, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকসহ নানা ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। মালয়েশিয়ায় ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আসে মালাক্কা। এ ছাড়া বন্দর ও বাণিজ্য ইতিহাস তো আছেই।

আরও পড়ুন

খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করে আমরা গেলাম মসজিদ সেলাতে। মসজিদ সেলাত হচ্ছে মালাক্কার প্রাদেশিক মসজিদ বা প্রধান মসজিদ। এটির স্থাপত্যশৈলী খুবই চমৎকার। সাগরের কূল ঘেঁষে জলের ওপরে নির্মিত মসজিদটি অনেকটা ভাসমান। যে কেউ প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হবেন। দেশি-বিদেশি অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন মসজিদ সেলাত পরিদর্শন করতে আসেন। পড়ন্ত বিকেলে খুবই চমৎকার দেখায় এটি। একবার গোধূলিবেলায় গিয়ে দেখলাম, সাগরে ডুব দিতে প্রস্তুত হওয়া সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে মসজিদেও। এটি মালয়েশিয়ার সুন্দর মসজিদগুলোর একটি। মালাক্কা ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য মসজিদ সেলাত অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। মসজিদ সেলাত হচ্ছে ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যের শহরে আধুনিক ও নতুনত্বের এক নিদর্শন। মালাক্কা শহরের অদূরে কামপুং বান্দার হিলিরে ২০০৬ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ২০ বছর হয়ে গেলেও এখনো নতুনের মতোই। সমুদ্রে পানির স্তর ভেড়ে গেলে মসজিদটিকে পুরোই ভাসমান দেখায়। এর সামনে খোলা মাঠ। মাঠের চারিদিকে সবুজ গাছের ছায়ায় পাতানো আছে কাঠের বৈঠকখানা। বিকেলে বৈঠকখানায় বসে বসে মসজিদের সৌন্দর্য উপভোগ করুণ, আর গোধূলিবেলায় মসজিদের বারান্দা পেরিয়ে সাগরের পাশে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখুন। সূযাস্ত দেখা শেষে মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে ফিরে আসুন। দারুণ উপভোগ্য হবে ভ্রমণ। ছোট ভাই নাছির ও তার মালাক্কাবাসী এক মালায়ু বন্ধুসহ আমরা একবার এভাবে মসজিদ সেলাতের সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলাম। এবার আমরা এসেছি দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে। চারদিকে তীব্র গরম। গাছতলায় ছাড়া কোথাও ছায়া নেই। ছায়াময় মায়াময় বিকেলে এলেই দারুণ উপভোগ্য হয় মসজিদ সেলাত পরিদর্শন।

মসজিদ সেলাত থেকে এবার আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য পুলাউ বেচার দ্বীপ। চলবে...