অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

নতুন বছর এসে গেছে। বাংলা নববর্ষের সাজ সাজ রব চারদিকে। তাড়াহুড়া করে কাজ শেষ করতে চেষ্টা করছি। বন্ধুর বাসায় যাব কাজ শেষ করে আজকে।

হাসপাতালে ব‍্যস্ততাও অনেক। ছয় দিন ধরে একজন রোগী দেখছি, যিনি অসুস্থ। ক‍্যানসার এমনভাবে ছড়িয়েছে, যত বেশি চেষ্টাই করা হোক তাঁর আয়ু বাড়ানো যাবে না। চেষ্টা করছি কথাটা তাঁদের বোঝাতে। কিছুতেই তাঁরা কথা বুঝতে পারছেন না। টাকাপয়সা আছে সীমাহীন। রোগীর লোকজন এত নখরা করেন না সাধারণত। তাঁরা এক দিন নার্সদের বলেন, চিকিৎসককে আগে থেকে জানাতে হবে, কখন দেখতে আসবেন। দেখতে গেলে কোটি কোটি প্রশ্ন করে সব উত্তর শুনে তারপর বলতেন, রোগীর ভাইকে ফোন করো। তিনি সব সিদ্ধান্ত নেবেন রোগীর ব‍্যাপারে। তাঁকে ফোন করি, মেসেজ রাখি। না তিনি ফোন ধরেন, না কল ব‍্যাক করেন। ছয় দিন একই অবস্থা।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আজকে রোগীর ইউনিটে যেতেই দেখি, নার্সরা ছোটাছুটি করছেন। একজন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। সেই রোগীর ভাই আসবেন। হলিউডের বিশিষ্ট একজন। পরিচয় গোপন করে এসেছেন ইত্যাদি ইত‍্যাদি। ভালো ঝামেলা। কত রংঢং করবেন, কে জানে। চোখের সামনে চুড়ি, টিপ, পিঠা, ভর্তা, গানসহ সব কিছুর স্বপ্ন। আহা! যেতে পারব তো?

ভদ্রলোক এলেন। বললেন, হাসপাতালের ব‍্যালকনিতে তোমার সঙ্গে বসতে পারব একটু? কথা বলব। নার্স খুলে দিলেন ব‍্যালকনি। বসলাম। মনে মনে ভাবলাম, গত ছয় দিন কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গেছে। আজকে কী আছে কপালে কে জানে। আমরা বসলাম। বিখ্যাত একজন মানুষ। সাধারণ জিনস টি–শার্ট পরা। আমি বসার পর উনি বসলেন। বলেন, ‘আমি এত ব্যস্ত ছিলাম, যতবার আপনি ফোন করেছেন ধরতে পারিনি। আপনি কি বলেন, সব চিকিৎসা করলেও কি আমার ভাই বাঁচবেন?’ বললাম না। বললেন, ‘ব্যাস, এতটুকুই যথেষ্ট। পুরো টাকা দিয়ে আমি সমুদ্রের পাশে একটা হসপিস ফ‍্যাসিলিটিতে ওকে নিয়ে যাব। আমি দুঃখিত সবাই আপনাকে অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে ফেলেছে গত ছয় দিন।’

লেখক

বলে চললেন, ‘সব ক্ষমতা, টাকাপয়সা সব কিছু থাকলেও যদি সিদ্ধান্ত সঠিক না নিতে পারি, তাহলে পরাজয় হবেই। যেখানে পরাজয় অবধারিত, সেখানে মেনে নিয়ে জীবন চালানোই সহজ হবে না?’ তাঁর চোখে পানি।

বললেন, ‘পৃথিবীর সবাই সত‍্য মেনে নিলে আজকে পৃথিবী এত অশান্ত হতো না, যা চাই সব পাব না, সেটা আমি যেই হই না কেন।’

কাজ মোটামুটি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল এরপর। বাসায় ফিরে বন্ধুর দেওয়া জামদানি শাড়ি পরলাম, গেলাম বন্ধুর বাসায়। ওরা রমনা বটমূলের আদলে বাসার একটা কোনা সাজিয়েছে। টেবিলে বাতাসা, নিমকি, পিঠা, মিষ্টি, ঝালমুড়ির পসরা। গান গাইছে কয়েকজন বন্ধু বসে এসো হে বৈশাখ এসো এসো।

নতুন বছর যুদ্ধহীন হোক, মানবতার জয় হোক, পৃথিবীর সব ভালো মানুষগুলো খুব ভালো থাকুন।

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’