বিলেতে সাড়ে তিন দিন!
এবারের বিলেতভ্রমণ কিছুটা ভিন্ন ধরনের তথ্য বহন করেছে। মাত্র সাড়ে তিন দিনে বেশ কিছু ছোট-বড় শহরসহ খুঁটিনাটি কিছু ঘটনা হৃদয়ে বড় আকারে দাগ ফেলেছে। প্রযুক্তির যুগে ঘরে বসেই বিশ্বভ্রমণের সুব্যবস্থা রয়েছে অনলাইনের মাধ্যমে। ইচ্ছা করলেই যখন যেখানে খুশি যাওয়া বা দেখা সম্ভব, তবে বাস্তবে ও সামনে থেকে দর্শনে যে অনুভূতি জাগ্রত হয়, সেটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণতা পায় না।
ভ্রমণে অনেক ছোটখাটো ঘটনা ঘটে, যেমন হঠাৎ রাস্তায় বড় আকারে ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেল। কী ব্যাপার? জানা গেল রাস্তায় দুটি গাড়ি হঠাৎ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল। আবার যেমন দেখা গেল, অনলাইনে প্লেনের চেকিংয়ের সময় পার হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার প্লেন মিস করে বিমানবন্দরে বসে ধুঁকে ধুঁকে কাঁদছে। এ ধরনের ঘটনা সারাক্ষণ কোথাও না কোথাও ঘটে থাকে। সব ধরনের বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে ভ্রমণ শেষে বাড়িতে ফিরে আমরা অতীতের কথাগুলো, পুরোনো স্মৃতিগুলো ভুলে যাই, আবার নতুন উদ্যোগে কোনো জায়গায় নতুন করে ভ্রমণ করি, এটাই জীবন। জীবন চলছে তার গতিতে এবং চলতে থাকবে যত দিন বেঁচে থাকব আমরা ভুবনে।
বহু বছর পর নতুন করে লন্ডনে আবারও থিয়েটার দেখলাম, একটানা তিন ঘণ্টা, তবে মাঝে কিছুক্ষণ বিরতি ছিল, আর তৎক্ষণাৎ সবাই ধুমধাম করে নানা জাতীয় পানীয় খাবার থেকে শুরু করে কথোপকথনে লেগে গেল। আবার ঘণ্টা বাজতেই থিয়েটারে মনোযোগ। ছোটবেলায় বাংলাদেশে যেমন যাত্রাগান দেখেছি, বলতে গেলে একই ধরনের অনুভূতি। পার্থক্য শুধু এদের বিনোদন বিলেতের প্রাসাদের পরিবেশে আর আমাদের সবুজ-শ্যামল বাংলার গ্রামের উন্মুক্ত মাঠে। এ ছাড়া এখানেও সেই একঝাঁক ডানাকাটা পরি এসে রংবেরঙের নাচ–গানে দর্শকদের মাতিয়ে রাখে। আমাকেও রাখার চেষ্টা করেছিল বটে, তবে সারা দিন দৌড়াদৌড়ির পর নিঝুম ওই সন্ধ্যায় মিটিমিটি আলোর মাঝে পুরো সময়টিই নাকি আমি নাক ডেকে ঘুমিয়েছি—এমন মন্তব্য করেছেন তাঁরা, যাঁদের সঙ্গে বসে লন্ডনের পিকাডিলি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত মিউজিক্যাল শো ‘মুলা রুস’ দেখেছি। থিয়েটার শেষে হোটেলে ঢুকেই ঘুম। কারণ, সকালে উঠে গাড়িতে বিলেতপ্রবাসী বন্ধু নাজমুলের সহধর্মিণী রুবি হুদা, মেয়ে আইনা, আমি ও আমার স্ত্রী মারিয়াসহ যাত্রা করতে হবে স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন এবং ওয়ারউইক ক্যাসেল, ওয়ারউইকশায়ারের উদ্দেশে।
নাজমুল থাকে লন্ডনের সাউথ ওয়েস্টে আর আমরা উঠেছি ইস্ট লন্ডনে। ট্রাফিক এত ব্যস্ত যে দুই ঘণ্টা লেগে গেল লন্ডন শহর ছাড়তে। তারপর মোটরওয়েতে উঠতেই রাস্তায় জ্যাম, কী আর করা! শেষে গ্রামের ছোট রাস্তা ধরে ধীরগতিতে যেতে যেতে পথে বিলেতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে করতে স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনে এসে পৌঁছালাম।
শুধু অনুভব হৃদয়ে মনে করিয়ে দিল সেই প্রায় ৪৫৯ বছর আগের এক মহামানবের কথা, যিনি এসেছিলেন ভবে সাহিত্যের এক রসাল চেতনা নিয়ে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (জন্ম ২৩ এপ্রিল ১৫৬৪, মৃত্যু ২৩ এপ্রিল ১৬১৬) ছিলেন একজন ইংরেজ কবি ও নাট্যকার। তাঁকে ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক এবং বিশ্বের একজন অগ্রণী নাট্যকার মনে করা হয়। মনপ্রাণ উজাড় করে দেখলাম তাঁর প্রাণের গ্রাম। শেক্সপিয়ার মরেছেন, তবে মরেনি তাঁর সাহিত্য। তাই তো প্রতিদিন আমাদের মতো হাজারও মানুষ গোটা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে। শেক্সপিয়ারের বাড়ির মাত্র আট মাইল দূরে রয়েছে হাজার বছর আগের এক ক্যাসেল, নাম ওয়ারউইক ক্যাসেল। ফিরতি পথে সেখানেও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে অক্সফোর্ডের পথ ধরে সন্ধ্যায় লন্ডনে ফিরে এলাম। সকালে রয়েছে পরবর্তী আয়োজন, সেটা হলো নতুন প্রজন্মের বিয়ের অনুষ্ঠান। আমার ছোট ভাই শাহীন, সে–ও লন্ডনপ্রবাসী, বহু বছর ধরে ইস্ট লন্ডনে আছে। শাহীনের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের বিয়ে, তাই বিশাল পার্টির আয়োজন করেছে শাহীন। তিন শতাধিক মেহমান সেই পার্টিতে অংশগ্রহণ করছেন। শুধু বিয়ে নয়, সব ধরনের পার্টিতে বিশ্বের সব বাঙালির একটি জিনিসের মধ্যে মিল খুঁজে পেলাম, সেটা হলো বিয়ের কার্ডে লেখা রয়েছে—‘১২.৩০-এ অনুষ্ঠান শুরু হবে’, কিন্তু ১৩.৩০–এর আগে কেউ সেখানে আসেননি এবং এ নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও মাথাব্যথা নেই। পরে অনুষ্ঠান শুরু হলো, শুরু হলো খাওয়াদাওয়া ও ছবি তোলার পালা। লন্ডনের বিয়ে, ভেবেছিলাম, নানা দেশের লোকজনসহ বিলেতিরাও থাকবেন। কিন্তু না, শুধু বাংলাদেশিরাই সে বিয়েতে ছিলেন। বিবাহ পর্ব শেষ হলো বটে, তবে আমার মাথায় যে জিনিসটা আমাকে ভাবাতে শুরু করল, সেটা হলো গোটা বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশি বাঙালিদের বসবাস। তারা সবকিছুই ম্যানেজ করে বেশ ভালোই আছে। কিন্ত এ সত্ত্বেও ইন্টিগ্রেট হতে পারেনি। আর এই না পারার জন্য শুধু যে বাঙালিরাই দায়ী, তা নয়, এর দায়ভার সেসব দেশের রাষ্ট্রেরও রয়েছে।
ভাবুন, ১০ বছর ধরে রোহিঙ্গা জাতি বাংলাদেশে বসবাস করছে। তারা বিদেশি এবং আমাদের দেশ থেকে অর্থনৈতিক সুযোগ–সুবিধাসহ নানা ধরনের সাহায্য পেলেও যেমন বাঙালি হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে হয়তো না মিয়ানমারের নাগরিক বা না বাংলাদেশি হয়ে জীবন যাপন করছে। পরে কোনো এক দিন যদি বিশ্বের থেকে সাহায্য না পায়, তখন শেষে খাতা–কলমে বাংলাদেশের নাগরিক হবে বটে, কিন্তু কোনো দিন কি বাংলাদেশি হতে পারবে? এই না পারার জন্য শুধু কি রোহিঙ্গা জাতি দায়ী থাকবে নাকি আমরাও? বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা আর বিশ্বের নানা দেশে বসবাসকারী পরবাসী বাংলাদেশি মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক ছাড়া আছে কি অন্য কোনো পার্থক্য তাহলে? শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি (হ্যামলেটের জীবনের চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব যেমন ফুটে উঠেছে, তার স্নেহময় পিতার মৃত্যুশোক না কাটতেই মা যখন পিতার হত্যাকারী তাঁর চাচাকে বিয়ে করেন, তখন উন্মাদপ্রায় হ্যামলেটের মধ্যে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। তখন পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন)—‘টু বি ওর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?’ একই সময় মাকে উদ্দেশ্য করে এ–ও বলেছিলেন, ‘দুর্বলতা, তোমার নাম নারী।’ শেক্সপিয়ার ৪৫৯ বছর পরও মানুষের কাছে আজও প্রাণবন্ত, আধুনিক। তাঁর এই কালজয়ী কিছু রচনার জন্য তিনি হয়তো আজীবন থাকবেন মানুষের অন্তরে। তবে আমার ভাবনায় শুধু একটি প্রশ্নই থেকে গেল, সেটা হলো—বিশ্বের নানা বর্ণ, নানা ধর্মের মানুষের মধ্যে সত্যিকার ইন্টিগ্রেশন আদৌ হবে কি কোনো দিন? ‘টু বি ওর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?’