কেউ পালায় স্বেচ্ছায়, কেউ অনিচ্ছায়। মরে গিয়ে জীবন থেকেও কেউ কেউ পালায়। কেউ পালায় কর্ম থেকে। কেউ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির থেকে। কেউ জেল পালায়। কেউ পরিবারের হাত থেকে। সন্তান পালায় পিতার হাত থেকে। স্বামী-স্ত্রী পালাতে চায় একে অপরের কাছ থেকে কিংবা সংসারের শিকল থেকে।

প্রেমিক-প্রেমিকা পালায় প্রেমের সন্ধানে। সাধু পালায় দেবতার উদ্দেশ্যে। পৃথিবীতে একমাত্র ভবঘুরেরা পালাতে চায় না। যদিও কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। ভবঘুরদেরও পালাতে হয় শহরের পুলিশের হাত থেকে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বেশির ভাগ মানুষই ঘর থেকে পালিয়ে আবার নতুন ঘরে ঢোকে। অনেক বছর পরে সেই ঘর থেকেও কেউ একজন বা দুজনেই পালাতে চায়।

আজব দুনিয়া। যে কাঙ্ক্ষিত প্রেমিকের জন্য প্রেমিকা তার বাবা–মার ঘর থেকে পালায়, সেই প্রেমিকের কারণেই সে আবার অন্যত্র পালায়। পালিয়েই–বা যায় কোথায়? কার কাছে? কিসের খোঁজে? কিসের আশায়? এই আর্তনাদের কারণ মানুষ কোনো দিনই খুঁজে পায় না।

বই পড়া বন্ধ করে আজমল সাহেব এখন একদল রাজহাঁসের ঝগড়া দেখছেন। একটা হাঁস মাটি থেকে কিছু খুঁজে পেয়ে অন্যগুলোর কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কোনোভাবে বাকিরা টের পেয়ে যায়। ব্যস, অন্য হাঁসগুলোও তাকে ধাওয়া করে। উনি লক্ষ করলেন খাবার খুঁজে পাওয়া হাঁসটির ডানা থাকতেও উড়ে না গিয়ে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য দেখে হঠাৎ তার মনটা হাহাকার করে উঠল কোনো কারণ ছাড়াই।

default-image

ইদানীং তাঁর মনটা এমনিতেই কারণে–অকারণে খারাপ হয়। অল্পতেই খুব অনুভূতিপ্রবণ হওয়ার মতো বয়স এখনো তাঁর হয়নি। মাত্র ষাট ছুঁই ছুঁই। তা ছাড়া তিনি বুঝে ওঠেন না কেন তাঁর এমনটি হয়।

জীবনে তাঁর সবকিছুই পূর্ণতা পেয়েছে। কর্মক্ষেত্রে সফলতা, বিদ্বান ও সুন্দরী স্ত্রী, পরিবার–সন্তান, অর্থবিত্ত, সুস্থতা, সম্মান—সবকিছুই। কোনো কিছুতেই বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। তবুও ইদানীং তাঁর মনে একটা পলায়নরত চরিত্র সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করে। সময়ে–অসময়ে সেই চরিত্রটা মাথার মধ্যে এসে হইচই শুরু করে দেয়। বারবার তাগাদা দেয় কোথাও পালিয়ে যাওয়ার।

আজমল সাহেবের বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত পরিবারে। ঢাকার মালিবাগে। শৈশবে একই এলাকায় একসঙ্গে বেড়ে ওঠা একটা গরিব বন্ধুর কথা ইদানীং খুব মনে পড়ে। তাঁর নাম ছিল টুকু। বাবা ছিল না। মা ছিল নামমাত্র। আপন বলতে এক দূরসম্পর্কের খালা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাঁর মা দ্বিতীয় বিয়ে করে সেই ঘরে বাচ্চা কাচ্চা থাকায় সে নিজেকেই সামলাতে হিমশিম খেত।

রেললাইনের পাশে পিঠা বিক্রি করত। স্বাভাবিকভাবেই অভাবী পরিবার। বস্তিবাসী বললেও ভুল হবে না। কিশোর আজমলের পরিবারের চরম আপত্তি সত্ত্বেও সুযোগ পেলেই সে টুকুর সঙ্গে চলাফেরা করত। টুকু আজমলকে নিয়ে ফুটপাতে বসা তার মায়ের দোকান থেকে অনেক সময় ফ্রি পিঠা খাওয়াত। কোনো কারণে টুকু ও আজমলের মধ্যে সেই সময়ে একটা অলৌকিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

টুকুর ছিল ঘর পালানোর স্বভাব। প্রায়ই উধাও হয়ে যেত। বাসে, ট্রেনে কিংবা লঞ্চে চড়ে। কখনো কয়েক দিন, সপ্তাহ বা মাসখানেক পরে আবার ফিরে আসত। টুকু ফিরে এলে আজমলকে তার হারিয়ে যাওয়া নিয়ে অনেক মজার মজার গল্প শোনাত। সেই গল্পগুলো ছিল রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর। কীভাবে বিনা পয়সায় লঞ্চে, ট্রেনে বা বাসে চেপে দূরদূরান্তে হারিয়ে যেতে হয়।

কীভাবে বিনা পয়সায় খাবার খেতে হয়, কীভাবে অপরিচিত বা আগন্তুকদের সঙ্গে কথা শুরু করতে হয় এসব। টুকুর সেসব গল্প শুনে ছোট আজমলের অনেক ইচ্ছে হতো সেও একদিন টুকুর মতো উধাও হয়ে যাবে। প্রয়োজন হলে টুকুর সঙ্গেই বেরিয়ে যাবে। পাড়া-মহল্লা, অলিগলি, শহর-গ্রাম, পুরো দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও তার পাত্তা পাওয়া যাবে না।

কিন্তু জীবনকে পরিপূর্ণ করতে করতে তাঁর সেই ইচ্ছা অপরিপূর্ণই রয়ে গেল। এ বয়সেও এসে সেই বন্য ইচ্ছেটা মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ যেমন এখন তাঁর ইচ্ছে করছে এ সুবিশাল নিউইয়র্ক শহরের মধ্য থেকে অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়ার। তিনি আবার টুকুর স্মৃতি রোমন্থন করলেন। চিন্তা করতে করতে একবারে টুকুর ভেতর ঢুকে গেলেন।  

টুকু যখন প্রথম প্রথম পালানো শুরু করল তখন তার মা ও খালা কিছুদিন চিন্তিত ছিল। কিন্তু কোনো সুরাহা করতে পারেনি। কিই–বা করতে পারতেন। রাতে সে বস্তিতে না ফিরে এলে এ–বাড়ি ও–বাড়ি গিয়ে ছেলেটির খবর নিত।

টুকুকে যারা চিনত তারা ধীরে ধীরে তার পলায়নপর স্বভাবকে মেনে নেয়। একবার সে পালিয়ে গিয়ে আর ফিরে এল না। কোনো দিনই না। তার উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে কারও মধ্যে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া হলো না। তার মা ও খালা কিছুদিন এদিক-ওদিক খোঁজ করে ক্ষান্ত হয়ে নিজেদের জীবনে ফিরে যান।

আজমল সাহেব পার্কের যেদিকে বসে ছিলেন তার অদূরেই একটা ভিক্ষুক কালো নোংরা ওভারকোট পরে চিৎকার করে চলেছে, গড ব্লেস ইউ, গড ব্লেস ইউ, গড ব্লেস ইউ...

পার্কে আসা মানুষদের সে অবিরত আশীর্বাদ দিয়ে যাচ্ছে। ভিক্ষার থলি হিসেবে এক হাত দিয়ে একটা অপরিষ্কার ওয়েস্টার্ন টুপি ধরে আছে। ভিক্ষুককে দেখে আজমল সাহেবের মনে হলো যে মানুষের মধ্যে খুব সম্ভবত ভিক্ষুকেরাই অন্য মানুষদের সবচেয়ে বেশি আশীর্বাদ দেয়। হয়তো জন্মদাতা মায়ের চেয়েও ভিক্ষুকের আশীর্বাদ বেশি।

আজমল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। কলহলরত রাজহাঁসের দল এখন আর নেই। তিনি পার্কের ট্রেইল ধরে হেঁটে চলেছেন।

তাঁর মাথার ভেতর শৈশবের টুকু এসে টুকুর টুকুর শুরু করে দিয়েছে। উনি অনবরত তাঁর সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। টুকুও বেশ উচ্ছ্বসিত। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, টুকুর বয়স এতটুকুও বাড়েনি। একদম আগের মতোই আছে। এখনো সে লাল হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া স্যান্ডেল পরে আছে। তিনি লক্ষ করলেন টুকুর স্যান্ডেলের দুই ফিতা দুই রঙের। এখনো তাদের মধ্যে তুই–তুই সম্পর্ক। আজমল সাহেবই প্রথমে কথা বলা শুরু করলেন:

—কী রে টুকু, তুই কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি? এত দিন কোথায় ছিলি? আমাকে যে নিয়ে গেলি না? আমাকে তো নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, নাকি? একসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন করে গেলেন।

আমি তো তোরেই নিতে আইছি। সেই দিন একটু সমস্যায় পইড়া গেছিলাম। সে বিরাট কিচ্ছা। কমলাপুর-বাসাব ব্রিজের লগে রেললাইন ধইরা যাইতাছিলাম। লাইনের ওপর হাঁটতে হাঁটতে দেহি একটা লাল রঙের শান্টিং টেরেন যাইতাছে। হয়তো লাইন বদলাইত।

ভাবলাম একটু ফ্রি আরাম লই। উইঠা পড়লাম। বগির ভেতর দেহি পুরাই খালি। অনেকগুলি বেঞ্চ। দিলাম এক ঘুম। কতক্ষণ খুমাইছি বা কোন ইস্টিশনে আইছি কিছুই মনে নাই। পুলিশের লাঠির বাড়ি খাইয়া জাইগা দেহি নতুন জায়গা। আগে জীবনেও আসি নাই।

—তারপর?
—তারপর আর কী? পুলিশ আমারে লইয়া গেল একদল মহিলার কাছে। ওরা আমারে কিছুদিন ফ্রি থাকতে দিল। অনেক মজার মজার খাবার দিত। অনেক আদর করত। পরে জানলাম ওইটা রংপুর না দৌলতদিয়ার কোনো এক বেশ্যাপল্লি। ওইহানে কিছুদিন ফ্রি থাকলাম। তারপরে আবারও আরেকটা লাল টেরেনে উঠলাম। আমার জীবনভর শুধু টেরেন আর ইস্টিশন। শুধু টেরেনে টেরেনে ঘুইরা বেড়াই। এইডাই আমার কাম। অনেক অনেক কিচ্ছা জমা আছে। তোর লগে শেয়ার করুম।

আজমল সাহেব দেখলেন টুকু তার গল্প বলতে বেশ উচ্ছ্বসিত। আজমল সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কিন্তু আমি তো শুনেছি তুই সেদিনই ট্রেনে কাটা পড়ে মরে গিয়েছিলি। তোর মরার কয়েক দিন পর এলাকায় পুলিশ আসে। তোর মৃতদেহের ছবি নিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করেছিল তোকে কেউ চেনে কি না?

—তোরেও কি পুলিশ আমার মরা ছবি দেখাইছিল?
—হ্যাঁ

তুই কী উত্তর দিছিলি?
—আমি ভয় পেয়েছিলাম উত্তর দিতে। বাসার সবাই আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল…
—তার মানে তুই আমারে চিনস নাই? নাকি চিনতে চাস নাই?
—না, মানে আমি তোকে চিনেছিলাম ঠিকই কিন্তু ওই যে আমার পরিবার সাবধান করে দিয়েছিল যে অনেক পুলিশি ঝামেলা হবে….
—হ, বুজছি। তুই ঠিক কাজই করছিলি।
—টুকু আর আজমল সাহেব পার্ক ছেড়ে একটা ছোট রাস্তায় এসে উঠল। তার পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে। টুকু অনবরত বলেই চলেছে:

—বুঝলি, তোরে একটা নতুন জিনিস শিখাই। টুকু বলে চলেছে...
শান্টিং টেরেনে ওঠার একটা নিয়ম আছে। আগে টেরেনের সাথে সাথে একটু দৌড় দিবি। তারপর এক পাও সিঁড়ির মইধ্যে দিয়াই সাথে সাথে দুই হাত দিয়া হ্যান্ডেল ধরবি...
হেই দিন তুই হ্যান্ডেল ধরতে না পাইরা হঠাৎ আমার হাত ধইরা টান দিলি। আমি ব্যালেন্স করতে না পাইরা চাক্কার নিচে পইড়া গেলাম। তুই আমারে মরা রাইখা বাসায় চইলা গেলি। আমি কিন্তু মরার আগে তোরে অনেকবার ডাকছি। তুই শুনতে পাস নাই।

—যাক গা, আমি মইরা গেলাম তো কী হইসে? তুই তো বাঁইচা গেছস। মজাডা এই হানেই।

—আমি বাঁইচা থাকলে আমিই থাকতাম। কিন্তু তুই দেখ। জীবনে কত বড় একটা মানুষ হইলি। কত কী করতে পারলি।

আজমল সাহেব নিউইয়র্ক শহরের ব্যস্ত রাস্তায় আনমনে হেঁটে চলেছেন আর বিড়বিড় করে টুকুর সাথে কথা বলে চলেছেন। টুকুও তার হারিয়ে যাওয়ার কিচ্ছা শুনিয়ে যাচ্ছে:
...মইরা যাওয়ার পর ওরা আমারে আরেকটা লাল টেরেনে উঠায়। অনেক সুন্দর আর গদিআলা সিট। আমি বাদে কোনো যাত্রী নাই। অনেক মজার মজার খাবারও আছিল।
আমি খাই আর সিট বদলাই।

ওই টেরেন একটা নীল সাগরের ওপর দিয়া উইড়া যাইতেছিল। কী যে সুন্দর! কী যে সুন্দর!

আজমল সাহেব টুকুর সেই ট্রেনে উঠতে যায়। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। উনি দৌড় শুরু করেছেন। প্রথমে এক পা। তারপর দুই হাত দিয়ে হ্যান্ডেল ধরতে হবে। টুকু উঠে গেছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাকে ধরে ট্রেনে উঠাতে। হঠাৎ হাত ফসকে যায়। একটা চিৎকার ভেসে আসে....আ জ ম ল।

ট্রেনের হুইসেলে সেই চিৎকার কেউ শুনতে পায় না।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন