মাতৃভাষা: উপেক্ষা আলিঙ্গন অর্জন
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি। দিনটির উদ্যাপনে ও আয়োজনে আলোচনা-পর্যালোচনা, কবিতা-গান—সবকিছুর কেন্দ্রে মূল বিষয় হবে মাতৃভাষা। সেটি কাদের মাতৃভাষা? নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর বা জাতির ভাষা কি? না এবং অবশ্যই না। আজ থেকে প্রায় ২৫ কি ২৬ বছর আগে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো যখন অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে চিহ্নিত করল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে, তখন এতে নতুন মাত্রা যোগ হলো। বাংলাভাষী মানুষের তীব্র ভালোবাসা ও আত্মত্যাগে সৃজিত একুশে ফেব্রুয়ারির অমরত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও নিশ্চিত হলো। একই সঙ্গে পৃথিবীর যেকোনো ভাষীর জনগোষ্ঠীও এই দিনে নিজ নিজ মাতৃভাষার লালন, উন্নয়ন ও সৃজন নিয়ে নানা কর্মকাণ্ডে দিনটি উদ্যাপন করতে পারে। এভাবেই একুশে ফেব্রুয়ারির অমরত্ব আজ সর্বব্যাপী বিস্তৃত ও প্রতিষ্ঠিত।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
মায়ের মুখের বুলি রক্ষায় অবিস্মরণীয় লড়াই ও রক্তদানের অমর কাহিনি সবারই কমবেশি জানা। তবে মাতৃভাষার জন্য মানুষের আকুতি প্রত্যক্ষ করা যায় শত বছর আগেও। মায়ের ভাষাকে উপেক্ষা দেখিয়ে আবার এই ভাষাকেই প্রণতি জানিয়ে এরই মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে শ্লাঘা অনুভব করেছেন, সম্মান অর্জন করেছেন—এমন নজিরও রয়েছে ইতিহাসে। অন্য রকম নজির হচ্ছে মাতৃভূমিতে উপেক্ষিত। বলা যায়, নিজ ভূমি থেকে বহিষ্কৃত, পলাতক, অনাবাসী; তবু মাতৃভাষাই মননে, মেধায়, চর্চায় ধরে রেখেছেন কেউ কেউ। এমন কেউও আছেন, যাঁরা সারা জীবন নিজ ভূমিতে বাস করে নিজের ভাষায় কাজ করেও সীমান্ত পেরিয়ে ভিনভাষীদের মধ্যেও স্বীকৃতি পেয়েছেন, সম্মানিত হয়েছেন। এতে মনে হয়, মাতৃভাষার চর্চা বিফলে যায় না। এমনই চারজনের কথা সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা হবে।
মধুসূদন দত্ত ১৮২৪—১৮৭৩
বাংলা ভাষা আন্দোলনের বহু আগে যশোরের সাগরদাড়ির জমিদারনন্দন মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষাকে অপাঙ্ক্তেয় গণ্য করে ইংরেজিকে আঁকড়ে ধরলেন। পশ্চিমা দেশের সবকিছুর আকর্ষণে মধুসূদন দত্ত নিজস্ব সবকিছু বিসর্জন দিয়ে হলেন মাইকেল আর ইংরেজি ভাষায় শুরু করলেন সৃজনশীল সব কর্ম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যদিও অসাধারণ মেধা ও গুণের অধিকারী ছিলেন ও বহু ভাষা জানতেন; তবু ইংরেজি ভাষায় সৃষ্ট তাঁর কর্ম আদৃত হয়নি। মধুসূদন দত্ত, যিনি মাতৃভাষাকে একদিন অবজ্ঞা করেছিলেন, উপেক্ষা দেখিয়েছিলেন, তিনিই আদর করে সেই মাতৃভাষাকেই আলিঙ্গন করলেন। নিজেকে ‘অবোধ’ বলে তিরস্কার করে লিখলেন ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;- তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি, পর-ধন- লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ’। বাংলা ভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন ইংরেজিতে কী লিখেছিলেন, তা নিয়ে কেউই তেমন মাতামাতি করেননি। তবে ‘অবোধ’ মাইকেল মধুসূদনের বাংলায় রচিত ও ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য ১৪৩ বছর পর ২০০৪ সালে ক্লিনটন বুথ সিলি ইংরেজিতে ‘The Slaying Of Meghanada’ নামে অনুবাদ করেছেন। মাতৃভাষায় চর্চাই মাইকেল মধুসূদনকে দিয়েছে যশ, খ্যাতি ও স্বীকৃতি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাত্র ৪৯ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
আলেকজান্ডার সোলজেনিৎসিন ১৯১৮—২০০৮
এখন এমন একজনের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যিনি বিতর্কিত ও নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে পরবাসী হন। নিজ দেশের প্রশাসন ও অনুসৃত পন্থার সমালোচনার করেন সাহিত্যে। রুশ শ্রমশিবির বিষয়ে লিখিত সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হন। হ্যাঁ, সেই লেখক আলেকজান্ডার সোলজেনিৎসিন। তিনি ১৯৭৪-এ তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড হয়ে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঠাঁই নেন। দীর্ঘ ২০ বছর দেশের বাইরে ইংরেজিভাষীদের মধ্যে ছিলেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ওই সময়ে তাঁকে অনারারি লিটারেরি ডিগ্রিও প্রদান করে। ওই সময়ে রুশ ভাষাতেই আমেরিকার সমাজের বস্তুবাদের কড়া সমালোচনা করে ওখানেও বিতর্কিত হন। কৈশোরেই পশ্চিমা, তথা ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। তবে ইংরেজি কথনে উৎসাহী ছিলেন না মোটেই। ফলে দুই দশক ইংরেজদের মধ্যে থেকেও ইংরেজি কথনে তুখোড় হননি। তাঁর বিশেষত্ব এ–ই, মাতৃভূমি থেকে উপেক্ষিত হয়েও মাতৃভাষাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, অন্য কোনো ভাষায় কখনোই কিছু লেখেননি। তারপর ১৯৯৪ সালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর আবার স্বদেশ রাশিয়াতে ফিরে আসেন। আলেকজান্ডার সোলজেনিৎসিন ২০০৮ সালে ৮৯ বছর স্বদেশেই মৃত্যুবরণ করেন।
সেলিম আল দীন ১৯৪৯—২০০৮
সেলিম আল দিন আজীবন মাতৃভাষা ও নিজ সংস্কৃতিতে নিবেদিত এক অমূল্য প্রাণ। বাংলাদেশের গুণী সন্তান বাংলা ভাষাতেই তাঁর বহু নাটক ও নাটকবিষয়ক গবেষণা প্রকাশিত করেন। সেলিম আল দীন বিশ্ব খুঁজতে বের হননি। তবে বিশ্বই তাঁকে খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন এই গুণী নাট্যকার। বলা হয়, ডক্টরেট থিসিসে আকাশ–পাতাল তোলপাড় করে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সেলিম এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করেন যে বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাস ইউরোপীয় নাট্যচর্চার চেয়েও পুরোনো। সেলিম আল দীনের সৃষ্টিকর্ম বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে সেলিম আল দীনের সৃষ্টিকর্ম পড়ানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের দেশ পত্রিকাতে একাধিকবার সেলিম আল দীনের রচিত নাটকের প্রশংসা বেরিয়েছে। ভারতের কলকাতায় বাংলায়, দিল্লিতে হিন্দিতে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কটি জায়গায় ইংরেজিতে তাঁর নাটক অভিনীত হয়েছে। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে এই প্রতিভাদীপ্ত মানুষটি চিরবিদায় নেন।
সুফিয়া কামাল ১৯১১—১৯৯৯
সুফিয়া কামাল বাংলা ভাষাতেই আমৃত্যু লিখে গেছেন। কবিতাচর্চা ছাড়াও দেশ, সমাজ ও মেয়েদের জীবনের নানা সমস্যা, নানা সম্ভাবনাবিষয়ক কর্মে ছিলেন সক্রিয় কর্মী। এই লেখাতে ভিনভাষী অন্য কোনো একজন, যিনি মাতৃভাষায় নিবেদিত আজীবন তাঁর কথা বলব ভেবেছিলাম; কিন্তু প্রিয় অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাওয়া একটি ই–মেইল সুফিয়া কামালকে নিয়েই লিখতে উৎসাহিত করল। হাজার মাইল দূর থেকে শেখর হাট্টানগাটি নামের একজন মেইল করেন। যোগাযোগের পেছনে কারণ হলো, আমার একটি কবিতা বিষয়ে আগ্রহ, প্রশ্ন। যোগাযোগের একপর্যায়ে সুফিয়া কামালের একটি কবিতার বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ চেয়ে পাঠালেন। আমার কাছে কেন চাইলেন? ওই ওয়েবসাইটে কবির বিষয়ে আমার একটি ছোট্ট প্রবন্ধ ছিল। তা দেখে হয়তো ওই মেইল প্রেরক ভেবেছেন, আমি এ বিষয়ে সাহায্য করতেই পারব। আসলে তা নয়। আমি সুফিয়া কামালের গুণী পুত্র সাজেদ কামালের আন্তরিক সহযোগিতায় কবির ‘বেনী বিন্যাসের সময় এখন নয়’ কবিতাটির মূল বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ সংগ্রহ করে পাঠাই। কৌতূহল হলো জানতে, এই ভিনভাষী মানুষ বাংলা কবিতা কেন চাইছেন, বুঝবেন কি না, তা নিয়ে কী করবেন? উত্তর পেয়ে আমার বিস্ময় লাগল, গর্ব হলো। উত্তর বাংলায় করলে এই হয়, ‘যে কবিতা ইংরেজিতে এত চমৎকার, মাতৃভাষায় না জানি কত মনোরম।’
শেষ কথা হলো, মায়ের ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখের বুলিতে আর ঋদ্ধ হয় গুণীজনের কলমের কালিতে।