সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল মিউজিয়ামে উদ্যাপিত হলো অভিবাসী কর্মীদের ‘একফ্রাসিস’ উৎসব
সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ‘দ্য স্যালন’ হলে গত ৩০ আগস্ট এক অনবদ্য ‘একফ্রাসিস’ উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবে সিঙ্গাপুরে বহুভাষিক সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। অভিবাসী কর্মীদের জীবন, স্বপ্ন, বাস্তবতা ও আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ উৎসবে নৃত্য, কবিতা ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ধরা দেয় এক গভীর মানবিক আখ্যান।
‘নিওবা এইজ’ নৃত্যদলের নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এক অসাধারণ নৃত্যশিল্পের মাধ্যমে উপস্থিত দর্শকেরা মুগ্ধ হন। তাঁদের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, তাল ও ভঙ্গিমায় যেন ফুটে ওঠে জীবনের গতিপ্রকৃতি ও সংগ্রামের ছাপ। দৃষ্টিনন্দন পোশাক ও সুসংহত ছন্দে নৃত্যশিল্পীরা যখন মঞ্চে আবির্ভূত হন, তখন যেন ‘দ্য স্যালন’ হলের দেয়াল স্পন্দিত হয়ে ওঠে। দর্শকদের করতালি আর অভিনন্দনে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এ পরিবেশনা শুরুতেই আনন্দের মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। যা পরবর্তী পর্বগুলোর জন্য এক সুন্দর ভিত্তি তৈরি করে।
নৃত্যশিল্পীদের নৃত্য শেষ হতেই শুরু হয় স্বরচিত আবেগঘন কবিতাপাঠের পর্ব। অভিবাসী বাংলাদেশি কবি বেলাল হাসানের কণ্ঠে শোনা যায় মাতৃভূমিতে রেখে আসা প্রিয়জনদের স্মৃতি আর ভালবাসার গভীর মর্মস্পর্শী অনুভব। তারপর ইন্দোনেশিয়ার কবি আদে রায়ানি ও উদিয়া রেত্নওয়াতি তাঁদের কবিতায় তুলে ধরেন দ্বীপবাসী মানুষের রূপকথা ও জীবনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা মুহূর্ত। ফিলিপাইনের কবি ক্রিস্টিন আলকাবাসার কবিতায় ফুটে ওঠে সমুদ্রপাড়ি দেওয়া এক জনপদের আশা-আকাঙ্ক্ষা। এ বছর কবিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘আওয়ার ফেবারিট হান্টস’। প্রতিটি কবিতাই ছিল জীবনের অমূল্য মুহূর্তগুলোর জমে থাকা না–বলা সংলাপ। যে মুহূর্তগুলো জীবন থেকে অতীত স্রোতে হারিয়ে যায়।
কবিতাপাঠের পর্ব শেষ হতেই স্যালন হলের বড় পর্দায় প্রদর্শিত হয় অভিবাসী বাংলাদেশি মাইনুল ইসলাম পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রাজার আগমন’। চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু উপস্থিত দর্শকদের আকৃষ্ট করে। সিঙ্গাপুরে এ ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটাই প্রথম বলে অনেকে মন্তব্য করেন। চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু অভিবাসী কর্মীদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে হুবহু মিল রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। নিখুঁতভাবে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যাটারিং খাবারের অনুন্নত মান তুলে ধরেছেন পরিচালক মাইনুল ইসলাম ও অভিনয়শিল্পীরা। অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সহজ–সরল অভিবাসী কর্মীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা প্রতারকেরা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছে চলচ্চিত্রটি। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর সরকারের সব নিয়মকানুন মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্রের মূল সংলাপ বাংলা ভাষায় থাকলেও সব দেশের ভাষাভাষীর সুবিধার্থে বড় পর্দায় সংলাপের ইংরেজি অনুবাদ ভেসে ওঠে।
‘দ্য স্যালন’ হলের বাইরে দর্শকদের জন্য প্রদর্শিত হয় অভিবাসী কর্মীদের তোলা অসাধারণ আলোকচিত্রের প্রদর্শনী। প্রতিটি ফটোফ্রেম যেন বন্দী করে রেখেছে জীবনের কোনো না কোনো গভীর মুহূর্ত—ক্লান্ত এক কর্মীর চোখের ভাষা, নির্মাণস্থলের ধূলিমাখা এক হাসি। আলোকচিত্রীদের নিখুঁত ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিটি ছবিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। সবশেষে উৎসবে অংশগ্রহণকারী নৃত্যশিল্পী, কবি ও ‘রাজার আগমন’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সনদ। আবেগঘন ও আনন্দময় পুরো আয়োজন অত্যন্ত সাবলীল ও হাস্যোজ্জ্বলভাবে উপস্থাপনা করেন সিঙ্গাপুরিয়ান উপস্থাপক জে ওং। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্ব দর্শক-নৃত্যশিল্পী, কবি ও অভিনয়শিল্পীদের মিলনমেলার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]