ঘুরে এলাম নুরেমবার্গ ট্রায়াল

এটাই সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী রুম নম্বর ৬০০। নাৎসি বাহিনীর বিচারিক কোর্ট রুমলেখকের পাঠানো

নুরেমবার্গ ট্রায়াল বাংলায়, যাকে বলা হয় ‘নুরেমবার্গ বিচার’। জার্মান ভাষায় ‘Nürnberger Prozesse’ নুরেমবার্গ ট্রায়াল হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক বিচারিক কার্যক্রম।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫-৪৬ সালে জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের নুরেমবার্গ শহরে এই বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

তৎকালীন সময়ে ‘আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল’ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অপরাধে অভিযোগ গঠন করে এবং তাঁদের বিচার করে।

তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ছিল মূলত চার ধরনের—

১. সমগ্র ইউরোপসহ পৃথিবীর শান্তি বিনষ্ট করা—আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পরিকল্পনা ও যুদ্ধ শুরু করা।

২. মানবতাবিরোধী অপরাধ—লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে বিশেষ করে ইহুদিদের সমূলে বিনাশ করা, বাসস্থান থেকে বিতাড়িত করা ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে গণহত্যা চালানো।

৩. যুদ্ধাপরাধ-তথা যুদ্ধের আইনসমূহ লঙ্ঘন।

৪. উপরিউক্ত তিনটি অপরাধ করার সাধারণ পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র করা।

১৯৪৫ সালের ২০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক এই সামরিক ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ ২২ জন নাৎসি কর্মকর্তার বিচার শুরু হয়। শীর্ষ ২২ জন নাৎসি বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন হিটলারের বেশ কয়েকজন জেনারেল, সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা। যাঁরা যুদ্ধের পুরো সময়ে হিটলারকে সহযোগিতা করেছেন।

এই আদালতের বিচারকাজ পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্র, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন থেকে আসা বিচারকেরা।

প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন মার্কিন আইনজীবী রবার্ট জ্যাকসন। নুরেমবার্গ আদালতে বিচারকার্য চলে প্রায় ২১৮ দিন ধরে। হাজির করা হয় ২৩৬ জন সাক্ষী, উপস্থিত করা হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার নথিপত্র। এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় প্রায় দুই লাখ সাক্ষ্যসহ লিখিত অভিযোগপত্র। আড়াই হাজার পাতার প্রটোকল নথিপত্রের সাহায্যে তুলে ধরা হয়।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর। এই দিন নুরেমবার্গ আদালতের রায় ঘোষণা করা হয়। শীর্ষ সাতজন নাৎসি আসামিকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, ১২ জনকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। বেকসুর খালাস পান মাত্র তিনজন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন ছিলেন হ্যারমান গ্যোয়েরিং, যিনি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগেই তাঁর সেলে সায়ানাইড ক্যাপসুল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এই ঐতিহাসিক বিচারিক কার্যালয় দেখতে আসেন
ছবি: লেখকের পাঠানো

পরবর্তী সময়ে নুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকেই আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালের জন্ম হয়।

১৯৪৫ সালের মে মাসে নাৎসি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর গোটা বিশ্ব ধ্বংসস্তূপ ও মানবিক সংকটের সম্মুখীন হয়। ইউরোপজুড়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও গ্যাস চেম্বারগুলোর বিভীষিকাময় চেহারা উন্মোচিত হতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন বিশ্ব নেতারা এই বিচারকে ইতিহাসের একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হিসেবে একটি আইন প্রণয়ন করতে চান। মিত্রশক্তির নেতাদের দূরদর্শিতা ছিল এই যে বিচারপ্রক্রিয়াটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হলে তা ইতিহাসের ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে। তাই এটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবেই ‘লন্ডন চার্টার’ আসে, যা ‘আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করে।

কেন এই বিচার ‘নুরেমবার্গ’ শহরে অনুষ্ঠিত হয়—

স্থান হিসেবে জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে এই ঐতিহাসিক ট্রাইব্যুনাল বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ছিল গভীর প্রতীকী অর্থ। শহরের ‘প্যালেস অব জাস্টিস’ হলের কোর্ট রুম ৬০০ নম্বর কক্ষে এই ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠিত হয়।

মূলত এই শহরটি ছিল নাৎসি বাহিনীর একসময়কার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে যুদ্ধ চলাকালীন স্বয়ং হিটলার অনেকবার এসেছেন এবং জেনারেলদের নিয়ে বড় বড় সৈন্য সমাবেশ করেছেন। যেখানে নাৎসিবাদ তার সর্বোচ্চ শক্তি ও ঘৃণার প্রদর্শন ঘটিয়েছে, সেখানেই সেই ধ্বংসাত্মক কর্মের বিচার হবে। এই জন্য নুরেমবার্গ শহরেকেই বেছে নেওয়া হয়। এখনো নুরেমবার্গ শহরে রয়েছে নাৎসি সৈন্যদের ব্যবহৃত বিশাল প্যারেড গ্রাউন্ড।

এই বিচার পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে গেছে। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অপরাধ করে কেউ কখনো পার পাবে না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ইমেইল: [email protected]