কানাডায় আশ্রয় আবেদন কমছে ৩৩ শতাংশ, ‘সুরক্ষিত ব্যক্তি’ ক্যাটাগরিতে পিআর নেমেছে ১৭ মাসে
কানাডায় আশ্রয় আবেদনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। সরকারি সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কম মানুষ কানাডায় আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। অক্টোবর ২০২২ থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেন্ড বিশ্লেষণেও একই ধারা স্পষ্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা, ভিসা প্রদানে যাচাই-বাছাই, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারের একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত এ প্রবণতার প্রধান কারণ। সরকারি প্রতিষ্ঠান কানিডিয়ান ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সিটিজেন বিভাগের তথ্যমতে—
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে আশ্রয় আবেদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ধারাবাহিকভাবে আবেদন কমতে শুরু করে।
২০২৫ সালে এসে এই সংখ্যা স্পষ্টভাবে নিম্নমুখী।
এই প্রবণতা প্রমাণ করে, কানাডার আশ্রয়ব্যবস্থায় প্রবেশ আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত।
পিআর প্রসেসিং টাইম নাটকীয়ভাবে কমেছে
তবে আশ্রয় আবেদন কমলেও ইতিমধ্যে স্বীকৃত সুরক্ষিত ব্যক্তি ও কনভেনশন শরণার্থীদের জন্য এসেছে বড় স্বস্তির খবর।
২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারির সরকারি আপডেট অনুযায়ী কুইবেক বাদে সব প্রদেশে ‘প্রটেক্টেড পারসন’ ক্যাটাগরিতে স্থায়ী বাসিন্দা আবেদনের গড় প্রক্রিয়াকরণের সময় এখন মাত্র ১৭ মাস। সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষমাণ আবেদনকারী প্রায় ৯৫ হাজার ৯০০ জন। যেখানে কয়েক বছর আগেও এই ক্যাটাগরিতে পিআর পেতে ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগত, সেখানে এখন সময় নেমে এসেছে দেড় বছরের কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কানাডার শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
কেন এই পরিবর্তন
সরকারি নীতিনির্ধারকদের মতে—
*ফাইল প্রসেসিং অটোমেশন
*অতিরিক্ত ইমিগ্রেশন অফিসার নিয়োগ
*ব্যাকলগ কমানোর বিশেষ টাস্কফোর্স
*ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট
এই চারটি উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) ব্যবস্থা কেন কানাডার জন্য চ্যালেঞ্জ
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আশ্রয় একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব হলেও বাস্তবতায় এ ব্যবস্থা কানাডার জন্য কিছু বড় চাপ তৈরি করছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
১. আবাসনসংকট
আশ্রয়প্রার্থীদের অস্থায়ী আবাসন দিতে গিয়ে বড় শহরগুলোতে হোটেল, শেলটার ও সরকারি ভবনের ওপর চাপ বেড়েছে।
২. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা
নতুন আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
৩. বিচারিক জট
আশ্রয় ট্রাইব্যুনালে হাজার হাজার মামলা জমে থাকায় প্রকৃত শরণার্থীদের ন্যায্যবিচার বিলম্বিত হচ্ছে।
৪. রাজনৈতিক চাপ
কানাডার প্রদেশগুলো ফেডারেল সরকারের ওপর আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যয় ভাগাভাগি নিয়ে চাপ সৃষ্টি করছে।
কেন অনেক শিক্ষার্থী ও ওয়ার্ক পারমিটধারী আশ্রয় আবেদন করছেন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও ওয়ার্ক পারমিটধারী ব্যক্তি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আশ্রয় আবেদন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ—
*পিআর পাওয়ার অনিশ্চয়তা
*এলএমআইএ ও এক্সপ্রেস এন্ট্রির কঠোরতা
*দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
* পরামর্শক চক্রের ভুল দিকনির্দেশনা
তবে সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আশ্রয় আবেদন কোনো অভিবাসন পথ নয়, এটি শুধু জীবন ও নিরাপত্তার প্রকৃত ঝুঁকির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার কী কী ঝুঁকি তৈরি করছে
এই অপব্যবহারের ফলে—
* প্রকৃত শরণার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন
* ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতা কমছে
* সরকারের নীতিতে আরও কঠোরতা আসছে
* ভবিষ্যতে আশ্রয় আইন আরও সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে
ভবিষ্যৎ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে
বিশ্লেষকদের ধারণা—
* আশ্রয় আবেদন আরও কমবে।
* কিন্তু যাঁরা ইতিমধ্যে স্বীকৃত ‘প্রটেক্টেড পারসন’, তাঁদের জন্য পিআর প্রসেস আরও গতিশীল হবে।
*কানাডা মানবিক দায়বদ্ধতা বজায় রেখেই আশ্রয়ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের দিকে এগোচ্ছে।
কানাডার আশ্রয়ব্যবস্থা এখন এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি একদিকে আবেদন কমছে, অন্যদিকে প্রকৃত শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের পথ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত হয়েছে।