অনেকক্ষণ মাথার ভেতর যুদ্ধ করে মৃদুল নিজেই অর্থ উদ্ধার করতে পারল। তানিশা মানে হলো উচ্চ আকাঙ্ক্ষা। তবে তানিশা নামের মেয়েটির কোনো উচ্চ আকাঙ্ক্ষা আছে কি না, তা বোঝার উপায় নেই। বেশি সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে অনুমান করা খুব সহজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা হয় কিছুটা বোকা প্রকৃতির। সেই সঙ্গে অহংকারী। তবে তানিশাকে দেখে বোকা কিংবা চালাক কোনোটাই বোঝা যাচ্ছে না। যাদের দেখে অনুমান করা যায় না, তারা হয় বিপজ্জনক। মৃদুল আজই জুড়ী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। সে কোনো বিপদে জড়াতে চায় না।

-স্যার, আপনাকে আরও একটু সময় বসতে হবে। এখনো আপনার রুম পরিষ্কারের কাজ চলছে। কয়দিন ধরে যে পরিমাণ তুফান আর বৃষ্টি হচ্ছে, আমরা ভেবেছিলাম আপনি আসতেই পারবেন না।

মৃদুল মুখে কিছু বলল না। শুধু ওহ্‌ বলে মাথা ঝাঁকাল। সমস্যা নেই অথবা খুব সমস্যা। এর মানে দুটোই হতে পারে। যা–ই বুঝুক। কয়েক দিন ধরে আবহাওয়ার যা অবস্থা। আসলে আজ জুড়ী আসতে পারবে, তা নিজেও বিশ্বাস করেনি। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে যায় যায় অবস্থা। সুনামগঞ্জে বন্যা শুরু হতে সময় নেয় না। আর একটু দেরি করলে আসার কোনো উপায় ছিল না। তাহিরপুর থেকে কিছু রাস্তা মোটরবাইকে আর কিছু রাস্তা নৌকায়—এভাবেই আসতে হয়েছে। তারপর সুনামগঞ্জ শহর থেকে বাসে করে সোজা জুড়ী এসেছে। ওর জন্য আপাতত থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে কলেজ কমিটির সভাপতির বাসায়। মৃদুল অবশ্য এসব নিয়ে আর মাথা ঘামাচ্ছে না। শুধু একটু পরপর দেয়ালে টাঙানো বিশাল ঘড়িটায় চোখ বোলাচ্ছে। আর দরদর করে ঘামছে।

-স্যার, গান শুনতে পারছেন?

মৃদুলের কানে স্পষ্টভাবে গানের আওয়াজ এল। পাশের বাসায় মান্নাদের কণ্ঠে গান বেজে চলেছে। মৃদুল আশ্চর্য হলো। আগে ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। এবার তানিশার পা দোলানোর কারণ বুঝতে পারল। এখন আর খারাপ লাগছে না। এখন মনে হচ্ছে চোখের সামনে এক অপ্সরী গানের তালে পা দোলাচ্ছে। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু হতে পারত? মোটেই না। মৃদুল গানের কথাগুলো শোনার চেষ্টা করল। গভীর বিষাদের গান। মনে হচ্ছে বুকের খুব গভীর থেকে ভেসে আসছে গানের কলিগুলো। এখন নিজেরই গানের তালে পা দোলাতে ইচ্ছা করছে। মৃদুল ভীষণ লজ্জা পেল। তানিশা মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে।

–স্যার, আপনি কি লজ্জা পাচ্ছেন?

তানিশা সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল। সমস্যা হলো, এত সুন্দর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যায় না। প্রেমে পড়ে যেতে হয়। মৃদুল চোখ সরিয়ে ফেলল। মাথা নিচু করে বলল,

-লজ্জা পাব কেন?

বলার সময় গলাটা একটু কেঁপে গেল। সে মিথ্যা বলেছে। এমনিতেই কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলতে হলো। খুব গুছিয়ে বলতে পারেনি তা নিজেই বুঝতে পারল। তবে তানিশা সম্পর্কে একটা ব্যাপার পরিষ্কার, মেয়েটি অসম্ভব সুন্দরী হলেও কোনোভাবেই অহংকারী মনে হচ্ছে না।

-স্যার পাশের বাসায় কে বাজাচ্ছে শুনবেন?

-কে?

-আচ্ছা আমি বলে দেওয়ার আগে আপনি একটু ধারণা করুন তো?

-আমি কীভাবে বলব? আমি তো আগে কখনো তোমাদের বাসায় আসিনি।

-তাতে কী হয়েছে, আপনি জাস্ট একটু অনুমান করে বলুন।

-নাহ্‌, আমি পারব না। আমার অনুমানশক্তি দুর্বল।

-তা অবশ্য আপনাকে দেখেই বোঝা যায়। সবাই আমাকে কী বলে জানেন?

-কী বলে?

-আপনিই বোঝার চেষ্টা করুন।

মৃদুল বুঝতে পারল তার ছাত্রী অসম্ভব বুদ্ধিমতী। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলল না।

-আমি বললাম না আমার অনুমানশক্তি খুব দুর্বল।

-আচ্ছা, তাহলে আমিই বলে দিই। সবাই বলে আমি খুব বুদ্ধিমতী।

বলেই হি হি করে হাসল। হাসির শব্দে মৃদুল ভয় পেয়ে গেল। বাসার অন্যরা কী ভাববে? প্রথম দিনেই টিচারের সামনে হাসাহাসি কেউ ভালোভাবে নেবে না।

-স্যার, পাশের বসার রুপম ভাই আমার জন্য পাগল।

-তোমার জন্য পাগল মানে?

তানিশা আকাশ থেকে পড়ল। এ যুগে এ রকম বোকা মানুষ কীভাবে হয়!

-মানে হলো উনি আমাকে অনেক পছন্দ করেন। তাই রাতে আমাকে গান শোনান।

-তোমাকে শোনানোর জন্য গান বাজায় কীভাবে বুঝতে পারছ? হতে পারে ওই ছেলের এটা প্রিয় গান।

-স্যার, আপনি এসব বুঝতে পারবেন না।

মৃদুলের আর বোঝার ইচ্ছাও হলো না। কেন জানি রাগ লাগছে। কিছুটা কী হিংসা? হয়তো বা। এতক্ষণে থাকার জায়গা পরিষ্কার শেষ হয়েছে। জায়গা বলতে তানিশাদের বাসার ছাদের চিলেকোটার রুম। মৃদুল রুমে এসে লাইট বন্ধ করে জানালার পর্দা খুলে দিল। এখনো মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। রাতের আঁধারে তা দেখা যাচ্ছে না। তবে মাঝেমধ্যে বজ্রপাতের গগনবিদারী শব্দ আর আকাশজুড়ে বিজলির রেখা ঝোড়ো আবহাওয়ার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

রাতে খুব ভালো ঘুম হলো। এমনকি ঘুমের ভেতর একটি চমৎকার স্বপ্ন দেখলাম। তবে কাউকে বলার মতো না। বেশ লজ্জার।

বাহারি ফুল দিয়ে সাজানো বাসরঘর। মনে হচ্ছে কারও বিয়ের প্রথম রাত। একটু পর মৃদুল নিজেকে বরের বেশে দেখে বুঝতে পারল আজ তার নিজেরই বিয়ে। বেশ লজ্জা লজ্জা একটা ভাব নিয়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। দেখল, সুন্দর করে সাজানো বিছানার এক কোনায় একটি মেয়ে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। বোঝাই যাচ্ছে মেয়েটি খুব লজ্জা পাচ্ছে। মৃদুল কী করবে বুঝতে পারছে না। অনেক সাহস করে নববধূর কাছে এসে বসল। কাছে আসতেই একটা অদ্ভুত মাদকতা মেশানো পরিচিত একটা সুগন্ধি নাকে এল। খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। তবে মনে করতে পারল না। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর নববধূর ঘোমটা তুলে চমকে গেল। নববধূর বেশে মেয়েটি তানিশা। মৃদুল ঘোরের ভেতর চলে গেল। বুঝতে পারছে না এ কী করে সত্যি হয়! ভালো করে চেয়ে দেখল তানিশা পা দোলাচ্ছে কিশোরী মেয়ের মতো। তবে কোথাও কোনো গান ভেসে আসছে না; বরং পায়ের নূপুরের শব্দ সুরেলা আবেশ তৈরি করেছে। মৃদুল সাহস করে তানিশাকে জড়িয়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত মাদকতা মেশানো সুগন্ধিটি ঘরময় ছেয়ে গেল।

মৃদুলের যখন ঘুম ভাঙল, তখন ভোররাত। মসজিদ থেকে ফজরের আজান হচ্ছে। পাশে হাত দিয়ে তানিশাকে খুঁজল। না পেয়ে বুঝতে পারল এত সময় যা দেখেছে পুরোটাই স্বপ্ন। বেশ লজ্জার ব্যাপার। প্রথমে লজ্জা পেলেও একটু পর অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করতে শুরু করেছে। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে, ভোররাতের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। মৃদুল আর কিছু ভাবতে পারল না। আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের ভেতর কানে এল শোরগোলের শব্দ, অনেক হইচই। তবে এর কোনো কিছুই মৃদুলের ঘুম পুরো ভাঙাতে পারল না।

সকালে তানিশার বাবা বসে আছে মৃদুলের সামনে। ওনার মুখ গম্ভীর। কোনো কথা বলছেন না। গতকাল রাতে বাসায় ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ওনার বড় মেয়েটির নাম তানিশা। মেয়েটি পাশের বাসার একটি ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে। মৃদুল কিছু না বলে জানালা দিয়ে দূরের মেঘালয়ের পাহাড়ে দিকে তাকাল। সেখানে স্তরে স্তরে আরও কালো মেঘ জমা হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে চলা আষাঢ়ের বৃষ্টি। সহসা থামবে বলে মনে হচ্ছে না।

*লেখক: এ টি এম বদরুজ্জামান, মলিকুলার মেডিসিনের ওডর পিএইচডি করছেন তাইওয়ানে

***দূর পরবাসে লেখা পাঠাতে পারেন [email protected]