লন্ডনে গণমাধ্যমকর্মীদের বৈশাখী আড্ডা: আনন্দ যেখানে বাঁধ ভেঙেছিল তুমুল উচ্ছ্বাসে

একটি আনন্দ-আড্ডা কতটা প্রাণবন্ত হতে পারে, তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় গত বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) পূর্ব লন্ডনের মাইক্রো বিজনেস সেন্টারে। তুমুল আনন্দ-উৎসাহের এক অনুপম সন্ধ্যা। লন্ডনে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের সম্মিলনে এক নির্মল বিনোদনের উৎসব। এ যেন যেমন খুশি তেমন সাজোর আদলে যেমন খুশি তেমন আনন্দ করা!

আয়োজনটি ছিল নববর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে। সৈয়দ নাহাস পাশার নেতৃত্বে এই বৈশাখী আড্ডার আয়োজন করে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের গত নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাঈম-সালেহ পরিষদ। গান, কবিতা, নৃত্য, গল্পকথা ও খুনসুটিতে প্রাণময় হয়ে উঠেছিল আড্ডাটি। তিন ঘণ্টার এক অনবদ্য আয়োজন; যেখানে অভ্যাগতদের দেখে মনে হলো, সবাই উপভোগ করছেন সর্বান্তঃকরণে। সহজাত ভাবগাম্ভীর্যের অবগুণ্ঠন সরিয়ে প্রায় সবাই নিজেদের মেলে ধরেন আপন মনের আমন্ত্রণে, মধুর হাস্যরসে-কাব্যরসে সহকর্মীদের সঙ্গে। বয়সের ব্যবধান ডিঙিয়ে অগ্রজরা বাঁধভাঙা আনন্দে মিশে যান অনুজদের সঙ্গে। ফলে বৈশাখী আড্ডাটি ক্রমে সুন্দর থেকে সুন্দরতর হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানটি শুরু হয় নির্ধারিত সময় থেকে দুই ঘণ্টা পর। যদিও পরবর্তী সময়ে মচমচে ইলিশভাজা ও কয়েক প্রকার ভর্তাসহ মজাদার খিচুড়ি খাইয়ে সে বিলম্ব পুষিয়ে দেওয়া হয়। আমন্ত্রক সাঈম চৌধুরীর সাবলীল ও প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় শুরুতে অভ্যাগতদের শুভেচ্ছা জানান সৈয়দ নাহাস পাশা ও সালেহ আহমেদ। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় বাউলগান, দেশাত্মবোধক গান ও প্রেমের গান। পরিবেশিত হয় বিভিন্ন গানের প্যারোডি, কবিতা আবৃত্তি ও নাতিদীর্ঘ যাত্রাপালা। শেষটা হয় অতিথিদের অংশগ্রহণে ধামাইল নৃত্যের ঝংকারে। সে কী নৃত্য, আহা!

সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হয়ে রাত ১০টায় শেষ হওয়া এ আনন্দ-আড্ডা শেষ হয়েও যেন শেষ হতে চাইছিল না।

এতে বাউল শহীদ অন্যান্য গানের পাশাপাশি পরিবেশন করেন বৈশাখ নিয়ে রচিত তাঁর একটি স্বরচিত গান। গানের কথাগুলো এ রকম—বৎসর ঘুরে ফিরে এল আবার বৈশাখ মাস,/হাওরে হাওরে বইছে ধান কাটার উল্লাস...। নিঃসন্দেহে সুন্দর অর্থবোধের কথা!

ডা. জাকি রেজওয়ানা আনোয়ার পরিবেশন করেন দেবব্রত সিংহের ‘তেজ’ কবিতাটি। আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত কবিতাটি তাঁর আবৃত্তিতে আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

মামুনুর রশীদ পাঠ করেন স্বরচিত ‘পুঁথি’। তাঁর ‘পুঁথি’তে আবহমান বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য চিত্রিত হয় ছন্দময়তায়।

‘সুজন সখী’ গানটি পরিবেশন করেন জিয়াউর রহমান সাকলায়েন। উদয় শংকর দাস হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘আমায় প্রশ্ন করে’ গানটিসহ কয়েকটি গানের প্যারোডি উপস্থাপন করে অনুষ্ঠানের আনন্দে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। বিভিন্ন গানের প্যারোডি পরিবেশনাকালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর সঙ্গে আনন্দে শামিল হন সহকর্মীদের অনেকেই।

ঊর্মি মাযহার ও সারওয়ার-ই আলম পরিবেশন করেন বৈশাখ ও মেঘবালিকা নিয়ে রচিত সারওয়ার-ই আলমের কবিতা ‘বোশেখ’ ও ‘মেঘবালিকার কথোপকথন’।

এরপর এলেন আহমেদ ময়েজ। মূলত কবি হলেও মরমি ধারার সংগীতে তাঁর রয়েছে গভীর একাগ্র। তিনি পরিবেশন করেন ‘একখান বাঁশির সুরে গো মন মথুরা নাচে বৃন্দাবন’ গানটি।

এরপর কবিতা নিয়ে আসেন মিসবাহ জামাল। রূপি আমিন তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন সাবিনা ইয়াসমীনের গান দিয়ে। বহুল জনপ্রিয় ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ গানটি তাঁর কণ্ঠে আড্ডায় সুরের আবেশ ছড়িয়ে দেয়। তাঁকে তবলায় সঙ্গ দেন সুবাস দাস। তাঁর কণ্ঠে ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’ গানটিও ছিল বেশ উপভোগ্য।

গানের ধারাবাহিকতা চলছে তো চলছেই। মঞ্চটি ছিল অনেকটা সবার জন্য উন্মুক্ত। সহকর্মীদের কে কীভাবে মুগ্ধ করতে পারবেন, এ নিয়ে ছিল এক নীরব প্রতিযোগিতা। আর এ মধুর প্রতিযোগিতাই সন্ধ্যাটিকে নির্দিষ্ট কারও নয়, সবার করে তোলে; করে তোলে সর্বজনীন।

বাংলা সিনেমার বহুল জনপ্রিয় ‘নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম’ গানটি হেলেদুলে আনন্দচিত্তে পরিবেশন করেন লুৎফুন্নাহার বেবি। দর্শকসারি থেকে সহকর্মীদের অনেকেই সমস্বরে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে এ পরিবেশনাকে আরও উপভোগ্য করে তোলেন।

‘আইলারে নয়া দামান আসমানেরও তারা’ গানটির পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিকে বেশ প্রাণিত করে। বাউল শহীদের কণ্ঠে পরিবেশিত এ জনপ্রিয় গান পরিবেশনের সময় নয়া দামানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সৈয়দ আনাস পাশা। বর্ণিল লুঙ্গি পরে এবং মুখে ধার করা রুমাল নিয়ে গানের সুরে সুরে, তালে তালে কয়েকজন বরযাত্রীসহ লাজুক ভঙ্গিতে সমগ্র হলে তাঁর ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যটি ছিল দারুণ উপভোগ্য।

ততক্ষণে রাত প্রায় ৯টা। হলভর্তি দর্শক। প্রায় সবাই গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমকর্মী। একেবারে উপচেপড়া ভিড়। আনন্দে আনন্দে জমে উঠছিল আড্ডাটি। আবু মুসা হাসান এলেন ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’ গানটি নিয়ে। গাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মূলত এটি পাঠ করে গেলেন গদ্য পড়ার মতো করে। তাঁর এই রসবোধ সহকর্মীরা এতটাই পছন্দ করলেন যে সমস্বরে অনেককে বলতে শোনা গেল দুর্দান্ত গান; অসাধারণ পরিবেশনা; আহা, কী সুর; আহা কী সুমধুর!

পলি রহমান ও হাফসা নূর যৌথভাবে পরিবেশন করেন ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা’ গানটি। গানটির শেষ দিকটায় এসে পলি রহমান যে টান দিয়েছেন, তা ছিল দর্শকদের শ্রবণেন্দ্রিয়ের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা! আমরা সহকর্মীরা সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতে ক্রমাগত পৌঁছে যাচ্ছিলাম আনন্দের অনতিক্রম্য উচ্চতায়।

এরপর হিলাল সাইফ নিয়ে এলেন স্বরচিত ছড়া। তীর্যক বক্তব্য সন্নিবেশিত ছড়াটি ছিল অর্থবহ। শুরুর কথাগুলো এ রকম, ‘বলতে পারেন কোন সে কাজে আপনার আমার হয় না খরচা? পরচর্চা, পরচর্চা।’

ছড়ার পর আবারও গান। এবার গান নিয়ে এলেন মাসুদ হাসান খান। তিনি পরিবেশন করেন তাঁর স্ত্রীর পছন্দের ‘আমার বুকের মধ্যখানে মন যেখানে হৃদয় যেখানে’ গানটি।

অনুষ্ঠানে ভিন্নতা আনতে যুক্ত করা হয় নাতিদীর্ঘ যাত্রাপালাও। নাম ‘গরম দেশের গরম রাজা’। সাঈম চৌধুরী রচিত এ যাত্রাপালায় অভিনয় করেন ঊর্মি মাযহার, মো. সালাউদ্দিন ও আবদুল কাদির মুরাদ চৌধুরী। যাত্রাটি বেশ প্রশংসা কুড়ায়।

যাত্রাপালার আবেশে দর্শকেরা যখন মুগ্ধ, তখন হামিদ মোহাম্মাদ এলেন তাঁর ‘আমার খালি ডর লাগে তোমারে নিয়া’ কবিতাটি নিয়ে।

গান, কবিতা ও যাত্রাপালায় প্রাণে প্রাণে প্রাণিত হচ্ছিল সন্ধ্যাটি। কিন্তু বাঙালি আর যা–ই করুক না কেন, ভূরিভোজ ছাড়া যে তাদের মন ভরানো যাবে না, আয়োজকেরা সম্ভবত সে কথা ঠিকই মাথায় রেখেছিলেন। সে জন্য আয়োজনে ছিল নববর্ষ উদ্‌যাপনের অনিবার্য অনুষঙ্গ ইলিশ। এ পর্বে ইলিশের সঙ্গে অবশ্য পান্তা নয়, পরিবেশিত হয় মজাদার খিচুড়ি এবং সেই সঙ্গে কয়েক প্রকার ভর্তা। শেষে সুস্বাদু মিষ্টান্ন।

রসনাতৃপ্ত করে অভ্যাগতরা যখন আরও আরও আনন্দের জন্য প্রস্তুত, তখন গান নিয়ে এলেন মোস্তফা কামাল মিলন। তিনি একে একে একে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘কলকল ছলছল নদী করে টলমল’ ইত্যাদি গান পরিবেশন করে মুগ্ধতা ছড়ান। আর সবশেষে ছিল কালান্দার ও বাউল শহীদের কণ্ঠে কয়েকটি জনপ্রিয় বাংলা গানের পরিবেশনা। গানের সঙ্গে ধামাইল নৃত্যে অংশ নেন সৈয়দ নাহাস পাশা, জাকি রেজওয়ানা আনোয়ার, ঊর্মি মাযহার, মাসুদ হাসান খান, সৈয়দ আনাস পাশা, রূপি আমিন, সাঈম চৌধুরী, মুরাদ চৌধুরী, লুনা নাহার, জিয়াউর রহমান সাকলায়েন, শামীমা মিতা, আমিনা আলী, জুয়েল রাজ, সারওয়ার-ই আলম প্রমুখ। একদিকে বাউল শহীদ ও কলন্দর তালুকদারের দরাজ কণ্ঠে জনপ্রিয় ধারার বাংলা গান। অন্যদিকে সুরের তালে তালে হেলেদুলে হাততালি দিয়ে ধামাইল নৃত্যের মনোমুগ্ধকর ঝংকার আর সেই সঙ্গে দর্শকসারি থেকে মুহুর্মুহু করতালি—সবকিছু মিলিয়ে বৈশাখী আড্ডাটি হয়ে উঠেছিল প্রকৃত অর্থেই বিপুল আনন্দময় ও স্মরণীয় সন্ধ্যা। এ সন্ধ্যায় বর্ষবরণের বারতায় নির্মল আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি ছিল উল্লাস, আবহমান বাংলার ঐতিহ্য এবং ছিল সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী। আর এভাবেই বিলেতে গণমাধ্যমকর্মীরা উদ্‌যাপন করেন বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]