পর্তুগালের পাহাড়ি গ্রাম তালাসনালে বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণ
বন্ধুদের সঙ্গে সম্প্রতি পর্তুগালের সেররা দা লুসা পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ঐতিহাসিক শিস্ট-পাথরের গ্রাম তালাসনাল ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। পাহাড়, সবুজ বন, পাথরের তৈরি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি আর শত বছরের ইতিহাস—সব মিলিয়ে তালাসনাল আমাদের ভ্রমণকে করে তুলেছে বিশেষ ও স্মরণীয়।
পর্তুগালের লুসা পৌরসভার সেররা দা লুসা পাহাড়ের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত তালাসনাল। গ্রামটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উচ্চতায় এবং লুসা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রাম দেখতে অনেকটা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা একটি পুরোনো জনপদের মতো।
শত বছরের ইতিহাস—
তালাসনালের ইতিহাস বেশ পুরোনো। সেররা দা লুসা অঞ্চলের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠা শুরু হয় মূলত সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতকের শুরুতে। তার আগে পাহাড়ে মানুষের বসবাস ছিল অনেকটাই মৌসুমি—বিশেষ করে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে পশুপালনের জন্য মানুষ এখানে আসতেন।
তালাসনালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর শিস্ট-পাথরের বাড়ি। স্থানীয় পাহাড় থেকেই পাওয়া পাথর দিয়ে তৈরি এসব বাড়ির সঙ্গে কাঠ ও ঐতিহ্যবাহী টালি ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক পুরোনো বাড়ির নিচতলা পশু রাখার জায়গা বা কৃষিকাজের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো, আর ওপরের তলায় থাকত পরিবার।
তালাসনালের অস্তিত্বের প্রাচীনতম লিখিত প্রমাণগুলোর একটি পাওয়া যায় ১৬৭৯ সালের একটি নথিতে। ১৬৮৭ সালের জমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত নথিতে এ অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই গ্রামের মানুষের জীবন একসময় মূলত কৃষিকাজ ও পশুপালনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। পাহাড়ি জমিতে কৃষিকাজ করা কঠিন হওয়ায় চাষাবাদ ছিল প্রধানত নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। গ্রামে জলপাইয়ের তেল তৈরির তেলকল, সামষ্টিক মাড়াইয়ের জায়গা এবং পানির উৎস ছিল গ্রামীণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাথরের বাড়িতে লুকিয়ে আছে মানুষের গল্প—
তালাসনালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর শিস্ট-পাথরের বাড়ি। স্থানীয় পাহাড় থেকেই পাওয়া পাথর দিয়ে তৈরি এসব বাড়ির সঙ্গে কাঠ ও ঐতিহ্যবাহী টালি ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক পুরোনো বাড়ির নিচতলা পশু রাখার জায়গা বা কৃষিকাজের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো, আর ওপরের তলায় থাকত পরিবার।
বর্তমানে তালাসনালের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো সংস্কার করে পর্যটকদের থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে একসময় প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়া গ্রামটি আবার পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির মাধ্যমে নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
গ্রামের প্রধান সরু রাস্তা পাহাড়ের ঢাল অনুসরণ করে ওপরে উঠেছে। সেই রাস্তা থেকে বের হয়েছে ছোট ছোট গলি ও সিঁড়ির মতো পথ। হাঁটতে হাঁটতে একেকটি মোড় পেরোলেই সামনে আসে নতুন কোনো পাথরের বাড়ি, ছোট উঠান কিংবা পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য।
তালাসনালের এই সরু রাস্তা, গলি ও ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলোই গ্রামটির স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে। আধুনিক শহরের প্রশস্ত রাস্তা ও উঁচু ভবনের বিপরীতে এখানে এখনো টিকে আছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো গ্রামীণ স্থাপত্যের ছাপ।
একসময় ছিল প্রাণবন্ত জনপদ—
তালাসনালে একসময় স্কুলও ছিল। ১৯১১ সালে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা সর্বোচ্চ ১২৯ জনে পৌঁছেছিল। তখন এখানে একটি স্কুল এবং দুটি জলপাই তেলের কল ছিল।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ কাজ ও উন্নত জীবনের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে গ্রামের স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেখানে মাত্র দুটি শিশু পড়াশোনা করত।
মাত্র কয়েক বছর পর, ১৯৮১ সালে তালাসনালে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা নেমে আসে মাত্র দুজনে। পরবর্তী সময়ে গ্রামের মূল বাসিন্দারাও একে একে অন্যত্র চলে যান। অনেকে পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে এবং অনেকে বিদেশে পাড়ি জমান।
হারিয়ে যাওয়ার পথে গ্রাম, পরে শুরু পুনর্জাগরণ—
একসময় তালাসনালের বহু বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। নীরব হয়ে যায় গ্রামের অনেক রাস্তা ও গলি। তবে পরবর্তী সময়ে পুরোনো বাড়িগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে অনেক বাড়িকে নতুন করে ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। বর্তমানে কিছু বাড়ি পর্যটকদের থাকার জায়গা, ব্যক্তিগত আবাসন এবং স্থানীয় ব্যবসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তালাসনাল বর্তমানে পর্তুগালের শিস্ট গ্রামগুলোর পর্যটন নেটওয়ার্কের অন্যতম পরিচিত গ্রাম। লুসা পৌরসভার পাঁচটি শিস্ট গ্রামের মধ্যে তালাসনালও রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও গ্রামের স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও আরও বেশি স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রকৃতির মাঝেই তালাসনাল
তালাসনালের চারপাশের প্রকৃতিও অসাধারণ। সেররা দা লুসা পাহাড়ের বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ ও বুনো শূকরসহ নানা বন্য প্রাণীর দেখা মেলে। পাহাড়ে রয়েছে কর্ক ওক, চেস্টনাট, ওক ও পাইনগাছের বিস্তীর্ণ বন।
এখান থেকে বিভিন্ন পাহাড়ি হাঁটার পথ ও পর্বত সাইকেল পথ ধরে লুসা দুর্গ, ত্রেভিমের চূড়া এবং আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়া যায়।
এ অঞ্চল ইউরোপের প্রকৃতি সংরক্ষণ নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে তালাসনালে ঘুরতে গেলে শুধু একটি ঐতিহাসিক গ্রাম নয়, পাহাড়ি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যেরও কাছাকাছি যাওয়া যায়।
‘ভালোবাসার পাহাড়’—তালাসনালের আরেক পরিচয়
আমাদের ভ্রমণের সময় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে ‘তালাসনাল—ভালোবাসার পাহাড়’ নামটি। পর্তুগিজ ভাষায় ‘মন্তানহাস দে আমোর’ শব্দের অর্থ ‘ভালোবাসার পাহাড়’।
ঐতিহ্যবাহী গ্রামের পরিবেশ, পাথরের বাড়ি, পাহাড়ি সৌন্দর্য ও শান্ত প্রকৃতির সঙ্গে এই নাম যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই মিশে গেছে।
বর্তমানে তালাসনালের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো সংস্কার করে পর্যটকদের থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে একসময় প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়া গ্রামটি আবার পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির মাধ্যমে নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণের স্মৃতি
বন্ধুদের সঙ্গে তালাসনালে হাঁটতে হাঁটতে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি অনুভব করেছি, তা হলো—এটি শুধু সুন্দর একটি পর্যটনস্থান নয়; প্রতিটি পাথরের দেয়াল, পুরোনো রাস্তা ও বাড়ির সঙ্গে যেন কোনো না কোনো মানুষের গল্প জড়িয়ে আছে।
শহরের কোলাহল থেকে দূরে পাহাড়ের নীরবতা, সবুজ বন, পুরোনো শিস্ট-পাথরের বাড়ি আর সরু গলি আমাদের কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন অন্য এক সময়ের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল।
তালাসনাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি গ্রামের ইতিহাস শুধু তার পুরোনো বাড়িতে নয়—সেখানে বসবাস করা মানুষ, তাদের শ্রম, স্বপ্ন, চলে যাওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের সংরক্ষণের মধ্যেও বেঁচে থাকে।
বন্ধুদের সঙ্গে এই ভ্রমণে তাই শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখিনি; দেখেছি মানুষের ফেলে যাওয়া স্মৃতি কীভাবে নতুন প্রজন্মের হাতে আবার বেঁচে উঠতে পারে। পাথরের দেয়াল, পুরোনো দরজা, সরু গলি আর পাহাড়ি বাতাস—সবকিছু মিলিয়ে তালাসনাল আমাদের মনে এক অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করেছে।
শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য দূরে গিয়ে মনে হয়েছে, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য কখনো কখনো খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না—প্রয়োজন হয় কিছু ভালো বন্ধু, একটি সুন্দর পথ আর ইতিহাসের স্পর্শ থাকা একটি জায়গা।