কানসাসের বিশ্বকাপ ডায়েরি

আমেরিকায় ফুটবল কখনো জনপ্রিয় খেলা ছিল না। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ আর এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে একদম দূরে ঠেলে দিয়েছে। তবে বিশ্বকাপ শুরু হতে দেখি একেবারেই অন্য রকম দৃশ্য। চারদিকে ব্যানার, ফেস্টুন, পতাকা আর একসঙ্গে খেলা দেখার ওয়াচ পার্টি।

বাংলাদেশ বিশ্ব ফুটবলে পরাশক্তি না হলেও বিশ্বকাপ ফুটবলের আবেদনটা আমাদের বাংলাদেশিদের কাছে অন্য রকম। আর আমাদের অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে আছে একদল ফুটবল–পাগল মানুষ। একেকজন একেক দলের সমর্থক—ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড। প্রিয় দল আর প্রিয় খেলোয়াড় নিয়ে সারাক্ষণ খুনসুটি লেগে থাকে। আমরা সবাই এই ট্রল আর মিমগুলো খুব ভালোই উপভোগ করি।

ফুটবল ভালোবাসি আর বাড়ির পাশে বিশ্বকাপ মাঠে গিয়ে খেলা দেখব না, তা কি হয়! বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাসখানেক আগে থেকে টিকিট পাওয়ার তোড়জোড় শুরু হলো। কিন্তু টিকিট তো সোনার হরিণ আর দামটাও আকাশচুম্বী। দাম দিয়ে টিকিট কিনব। কিন্তু কেনার সুযোগ পেতেও জিততে হবে লটারি। ভাগ্যক্রমে ছোট ভাই শাওন লটারি জিতে গেল। ওর কল্যাণে আমরাও পেয়ে গেলাম আমাদের বিশ্বকাপের কাঙ্ক্ষিত টিকিট কেনার সুযোগ। টিকিট করলাম জুলাই মাসের ৩ তারিখের—‘রাউন্ড অব ৩২’–এর নকআউট স্টেজের। খেলা কানসাস সিটিতে। তখনো জানি না, কোন দল খেলবে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট স্টেজের খেলা—আশা নিশ্চয়ই মন্দ হবে না। প্লেনের টিকিট, এয়ার বিএনবি, আর প্রিয় দলের জার্সি সব প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম ঝটপট। এবার শুধু অপেক্ষার পালা—বিশ্বকাপের ম্যাচ মাঠে গিয়ে দেখার প্রথম অভিজ্ঞতার।

খেলা জুলাইয়ের ৩ তারিখে। আমরা চলে এলাম ২ দিন আগে ১ তারিখে। উদ্দেশ্য বিশ্বকাপের হোম ভেন্যুতে বিশ্বকাপের আয়োজনটা উপভোগ করব। ল্যান্ড করলাম কানসাসের কাছের আরেকটা শহর উইচিটায়—আমি, আরমান, রনি, সাদ আর সাদের ৯ বছরের খেলাপাগল ছেলে সাদীদ। উইচিটাকে বলা হয় ‘এয়ার ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। সব বড় বড় এরোস্পেসের কারখানা এখানে। নেমেছি বেলা দুইটায়। খিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে। নেমেই চলে গেলাম উইচিটা শহরে এক দেশি রেস্তোরা ‘দেশি কারি’তে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

মাটন বিরিয়ানি, গরু, মুরগি, রুই মাছ আর গরম–গরম চা—আর কী চা! রেস্তোরাঁর মালিক এমরান ভাই। ভাই ও ভাবি খুব যত্ন করে খাওয়ালেন, মনে হলো নিজের বাসায় বসে খাচ্ছি। সুদূর কানসাসে এসে এমন আতিথেয়তা পাব ভাবিনি। দৈবাৎ দেখা পেলাম—বুয়েটের সিনিয়র ভাই রুপেন দেবের সঙ্গে। অসম্ভব অমায়িক দাদা। বুয়েটজীবনের নানা স্মৃতি হাতড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য যেন ঘুরে এলাম বুয়েট ক্যাম্পাসে।

এয়ার বিএনবিতে চেক ইন করে চলে গেলাম ইউএসএ-বসনিয়ার রাউন্ড অব ৩২ –এর ম্যাচ দেখতে। বাসার কাছের স্পোর্টস রেস্টুরেন্টে তিল ধারণের জায়গা নেই। পরে দূরে আরেকটা স্পোর্টস রেস্টুরেন্টে গিয়ে জায়গা পেলাম। বোঝা যাচ্ছে, ফুটবল (আমেরিকানরা বলে সকার) ধীরে ধীরে আমেরিকায় জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। পরের দিন খেলা দেখতে গেলাম কানসাসের জনপ্রিয় খেলার দেখার জায়গা ‘নো আদার পাব বাই স্পোর্টিং কেসি’–তে। ফিনিক্স থেকে নাবিল যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। বাইরে কনসার্ট আর ভেতরে জমজমাট খেলা—চমৎকার অভিজ্ঞতা। পর্তুগাল ফ্যানদের মধ্যে বসে ক্রোয়েশিয়ার জন্য অনেক গলা ফাটালাম। তবু পর্তুগাল জিতে গেল। তবে খেলা পাগল ফ্যানদের মধ্যে বসে এমন খেলা দেখার মজাই আলাদা। পর্তুগালের জয়সূচক গোলের পর যেভাবে পুরো স্পোর্টস কমপ্লেক্স আনন্দে ফেটে পড়ল—দৃশ্যটা দেখার মতো ছিল।

এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ ছিল এটা। প্রথমার্ধটা ম্যাড়মেড়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধটা ছিল নাটকীয়তায় ভর্তি। পাল্টাপাল্টি আক্রমণ, পেনাল্টি, স্কিনোমিটারে শেষ মিনিটের গোল বাতিল আর সেই সঙ্গে এক কিংবদন্তি খেলোয়াড় লুকা মদরিচের বিদায়। হারলেও ক্রোয়েশিয়া দল মাথা উঁচু করে বাড়ি ফিরল।

রাত ভোর হওয়ার আগে শাকিলও চলে এল খেলা দেখতে। আমরা সাতজন মিলে পরের দিন সকালে গেলাম কানসাস শহরের ফিফা ফ্যান ফেসটিভেলে, যেখানে একসঙ্গে ২৫ হাজার লোক যেন খেলা দেখতে পারে তার বিশাল আয়োজন। চারপাশে বিশাল স্ক্রিন, নানা জায়গায় বিশ্বকাপের স্যুভেনির, ফুড স্টল, ফিফা স্টোর, আর বিশ্বকাপের থিমের সঙ্গে মিল রেখে অসাধারণ সাজসজ্জা। বিশাল স্ক্রিনে খেলা দেখানো হচ্ছে আর খেলার মাঝখানে কনসার্ট আর ডিজে পার্টি। সেই সঙ্গে আছে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীরা যারা নেচে–গেয়ে পুরো বিশাল চত্বর মাতিয়ে রেখেছে। এককথায় বিশ্বকাপকে উৎসবে রূপ দিতে আয়োজনের কোনো কমতি নেই। এখানে আমরা উপভোগ করলাম মিসর ও অস্ট্রেলিয়ার রাউন্ড অব ৩২–এর ম্যাচ।

ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপের বিশেষ বাসে করে চলে গেলাম কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে। এটা মূলত আমেরিকার ন্যাশনাল ফুটবল লিগের দলের হোম গ্রাউন্ড। সকার খেলাটা এ অঞ্চলে ৭৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম বানানোর মতো জনপ্রিয় হয়নি এখনো। আমেরিকান ফুটবল এখানকার মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খেলা। আমরা মাঠে গিয়ে দেখব কলম্বিয়া আর ঘানার ম্যাচটি। দক্ষিণ আমেরিকা আর আফ্রিকার দুই মহাদেশের দুটো জনপ্রিয় দলের খেলা। কলম্বিয়ার ফ্যানরা যে কতটা উন্মত্ত আর খ্যাপাটে সেটা বিকেল থেকে টের পাচ্ছিলাম। কানসাস শহরের প্রতিটি পার্ক, খোলা জায়গা, পাব—এরা দখল করে নিয়েছে। নেচে–গেয়ে উৎসব করছে, ভুভুজেলা আর ঢোলের আওয়াজে প্রকম্পিত হচ্ছে চারপাশ আর সমস্বরে তারা গেয়ে চলেছে, ‘যাও এগিয়ে কলম্বিয়া, জয় আমাদের হবেই।’ আর আজকে বাস, আর স্টেডিয়াম এই গানে রীতিমতো কাঁপছে। গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত একটাও ঘানার জার্সি দেখলাম না। কলম্বিয়ার হলুদ, সবুজ জার্সিতে পুরো দর্শক গ্যালারি ঢেকে গেছে। স্থানীয় সময় ঠিক রাত ৮টা ৩০ মিনিটে স্টেডিয়ামে কলম্বিয়া আর ঘানার ম্যাচ শুরু হয়ে গেল। চারপাশে শুধু কলম্বিয়ার সমর্থক, স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিনে ভেসে আসা ছাড়া আর কোথাও ঘানার কোনো সমর্থক খুঁজে পেলাম না। বোঝা যাচ্ছিল ফুটবল খেলাটা কলম্বিয়ার মানুষের কাছে কত জনপ্রিয়। পুরো সময়জুড়ে এরা নেচেগেয়ে যাচ্ছে, মেক্সিকান ওয়েভ তৈরি করছে, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি সুন্দর পাস, প্রতিটি আক্রমণ এরা উদ্‌যাপন করছে। টিভি স্ক্রিনে খেলা দেখলে এই উত্তাপ টের পাওয়া যায় না। একটা সাধারণ, ম্যাড়মেড়ে খেলাকেও স্টেডিয়ামে প্রাণবন্ত দর্শকেরাও যে আকর্ষণীয় বানিয়ে ফেলতে পারে, এটা মাঠে না এলে বোঝা যেত না। খেলার প্রতিটি মুহূর্তগুলো স্টেডিয়ামের দুই পাশের বড় স্ক্রিনে সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে। ৪৫ মিনিটের খেলা শেষে খেলোয়াড়েরা বিরতিতে গেল। আর স্টেডিয়ামের দর্শকদের জন্য শুরু হলো মনোমুগ্ধকর লাইট শো। সুর আর আলোর অসাধারণ যুগলবন্দীতে মনে হচ্ছিল—হঠাৎ একটা মিউজিক কনসার্টে ঢুকে পড়েছি। ঘরে বসে মধ্যবিরতির অংশটা অনেক দীর্ঘ মনে হয়। এখানে খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল।

নানা বয়সী মানুষের ভিড় স্টেডিয়ামজুড়ে। এক বছর বয়সী ছোট বাচ্চা থেকে ৮৫ বছরের বৃদ্ধ দম্পতি—সবাই আছে স্টেডিয়ামে। একজন এসেছেন ক্রাচে ভর দিয়ে। কেউ এসেছেন হুইলচেয়ারে করে। সবার মধ্যে কী যে উন্মাদনা! সবাই যেন ২০–৩০ বছরের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা তরুণ–তরুণী। বিশ্বকাপের টিকিট, আর থাকা–খাওয়া নিয়ে পুরো ট্যুরটা—যেকোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। নিজের সামর্থ্যের বাইরে হলেও তারা এসেছে। কেউ কেউ এসেছে নিজের কোনো প্রিয় জিনিস বিক্রি করে। ফুটবলটা এলেই তাদের কাছে সাধারণ খেলা থেকেও বিশেষ কিছু। অবশেষে রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে খেলা শেষ হলো। কলম্বিয়া ১-০ গোলে ম্যাচটা জিতে নিল। পুরো স্টেডিয়াম আতশবাজি আর গগনবিদারী চিৎকারে কেঁপে উঠল।

সবাই লাইন বেঁধে বাসের দিকে ছুটছি। দূরে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের আতশবাজিতে আকাশ ছেয়ে গিয়েছে। এ যেন কলম্বিয়ানদের উৎসবে নতুন রং রাঙিয়ে দিল। কলম্বিয়ানরা নেচেগেয়ে বাড়ি ফিরছে।

সবার মুখে একই গান। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়—‘আমি গান গাই সেই জীবনের জন্য, যা আমাকে আরেকটি নতুন ভোর উপহার দেয়; আমি গান গাই সেই মানুষের জন্য, যারা খেলার মাঠে ছুটে যায়; আমি গান গাই আমার দলের জন্য, যা আমাকে আশায় ভরিয়ে তোলে সেই জার্সির জন্য, যা আমার হৃদয়ের গভীরে ছুঁয়ে যায়।’ আমাদেরও বাড়ি ফেরার পালা।

পরেরবার বিশ্বকাপ ইউরোপে। দেখা হবে কি না জানি না। যদি দেখা না হয়, এবারের বিশ্বকাপটা সারা জীবন মনে রাখার মতো একটা স্মৃতি হয়ে থাকল।