আনা ফ্রাঙ্ক

এখন ২০২৩ সালের শেষের দিকে বড় দুঃসময়। যুদ্ধ চলছে। ঘোর যুদ্ধ। এমনই একসময়ে আরেক যুদ্ধের কথা মনে করাচ্ছি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে হিটলার পৃথিবীর কোল থেকে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করার পণ করেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হননি। এ সময়ে, অর্থাৎ বর্তমানে ইসরায়েলের নেতা নেতানিয়াহু পৃথিবীর বুক থেকে, তাঁর বয়ানে ‘পৃথিবী থেকে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করুন’ বা ফিলিস্তিনের হামাসদের মুছে ফেলবে বা নিশ্চিহ্ন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পুরো বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে হামাস আওতাধীন গাজায় পলকে পলকে ইসরায়েলের হাতে নিরপরাধ, নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যু দেখছে।

যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে প্রাণসংহার নয়। মৃত্যু তো আছেই, তার পাশাপাশি ভয়ংকর মর্মস্পর্শী, বেদনাদায়ক হলো মানবের অবমাননা, অপমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলার বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক তার পরিবারের এবং আরও কিছু পরিচিত ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে ছোটখাটো এক কারখানার ওপরতলায় প্রায় আড়াই বছর আত্মগোপনে ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা হিটলার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। নাজি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আনা, তার মা ও বোনের মৃত্যু ঘটে। আনার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক বেঁচে যান।

আমস্টারডামে আনা ফ্রাঙ্ক যে ছোট্ট পরিসরের কয়েক কামরার বাসস্থানে জীবনের আড়াই বছর কাটিয়েছিল আর প্রতিদিন ডায়েরি বা দিনলিপি লিখত, সে বাসস্থানটি এখন ‘আনা ফ্রাঙ্ক মিউজিয়াম’।

যাঁরা অল্প সময়ের জন্য ওই শহরে বেড়াতে যান, ভীষণ স্বল্প পরিসরের মিউজিয়ামে যেতে হলে আগেই টিকিট কেটে রাখতে হবে তাঁদের, না হলে যাওয়া সম্ভব নয়। কিছু সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ঢোকার পর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে মিউজিয়াম–ভ্রমণ শেষ। এক এক দলের জন্য সময় বরাদ্দ ১৫ মিনিট।

দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ভীষণ সংকীর্ণ। দুজন মানুষ সিঁড়িতে পাশাপাশি পা রাখতে পারবে না। একটি ছোট অডিও ডিভাইস ফিতায় আটকানো, তা গলায় দুলিয়ে মিউজিয়ামের বিষয়ে ধারাবর্ণনা শুনতে শুনতে নিমেষে ১৫ মিনিট শেষ। এত ছোট পরিসরে গাইডেড ট্যুর সম্ভব নয়। দোতলায় ওঠার পর দরজা–জানালা বন্ধ হালকা আলো জ্বলা পরিসরে প্রবেশ। সবকিছু ১৯৪২-১৯৪৪ বা ১৯৪২-১৯৪৫ যেমন ছিল, তেমনিভাবে সংরক্ষণ করা আছে। দেয়াল, চেয়ার-টেবিল, তৈজসপত্র তেমনি রংচটা ধূসর বর্ণ। আমার নিশ্বাস আটকে আসছিল বদ্ধঘরে। কি করে এত দীর্ঘ সময় ওরা এমন দম আটকানো পরিসরে বেঁচে ছিল! ভাবলে মাথা ঘুরে যায়।

আনা ফ্রাঙ্ক

আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি অনেকেই পড়েছেন, তবে এই দমবন্ধ পরিবেশ না দেখলে যুদ্ধের সময়ে তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম অনুভব সম্ভব নয়। আমাকে স্তম্ভিত করে দিল ঘরগুলোর কোনো এক কোণে রাখা অ্যালুমিনিয়ামের কড়াওয়ালা এক পুরোনো বালতি ও অডিওতে তার বর্ণনা শুনে।

দিনের বেলা আনারা টয়লেট ব্যবহার করতে পারত না। কারণ, দিনে নিচের কারখানায় চার-পাঁচ কি পাঁচ-ছয়জন লোক কাজ করতে আসত। তারা যেন ঘুণাক্ষরেও না বোঝে যে ওপরে কেউ লুকিয়ে আছে। তাই যত দূর সম্ভব প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম বা মলমূত্র ত্যাগ বন্ধ রাখতে হতো, তা না হলে নিচে পাইপ দিয়ে ছড়ছড় করে পানি পড়ার শব্দে প্রাণ সংশয় হওয়ার মতো বিপদ ঘটতই। যদি কারওর অবস্থা সাংঘাতিক বেগতিক হতো, তখন বালতিই ছিল একমাত্র ভরসা।

যুদ্ধ মানুষকে চরম অবমাননায় ফেলে দেয়। মানুষ তার সম্ভ্রম বজায় রাখা ও শালীনতা রক্ষার জন্য অন্য প্রাণীর চেয়ে স্বতন্ত্র। মানুষ পশুপাখির মতো সবার সামনে যেখানে–সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে না এবং রতিক্রিয়াও জনসমক্ষে মানুষের কর্ম নয়। অথচ যুদ্ধ মানুষের শালীন, সুসভ্য আচরণকে বিসর্জন দিতে বাধ্য করে।

হিটলারের হাত থেকে লুকাতে গিয়ে আনাদের অবমাননায় পূর্ণ ছিল সে বালতি।

মিউজিয়ামের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ, তাই বালতির ছবি দেওয়া গেল না।

কীভাবে কিশোরী আনা পানি খরচ না করে তার ঋতুকালের সময় কাটাত? ভাবতে ভয়ে, অপমানে গা রি–রি করে উঠল। যুদ্ধ সব সুসভ্য, শালীন আচরণ বিসর্জন দিতে বাধ্য করে অনায়াসে।

আজ গাজায় পানি, খাদ্য, ওষুধশূন্য অবস্থায় মানুষ কী করছে? মরছে আর ওখানে রজঃস্বলা কিশোরী রক্তাক্ত বসনে মানুষের সভ্যতাকে বিদ্রূপ করছে।

জাতীয় জাদুঘরের প্রদর্শনীর পোস্টারে আনা ফ্রাঙ্ক

যুদ্ধ জয়-পরাজয়ের বেশী যুযুধান দুপক্ষকেই দেয় মানবিক অবমাননা।

বিবেকবান ইহুদি বান্ধবী ইসরায়েল হাজার মাইল দূরে থেকেও সারা বিশ্বে নেতানিয়াহুর কার্যকলাপের পরিণতি কী হবে, ভেবে ভয় ও ঘৃণায় কাঁপছে।

তার অনুভব ও বোধ এই যে, নিরস্ত্র অসহায় মানুষের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা ও অপমান দেখে শুধু ফিলিস্তিনি নন, বাকি বিশ্বে সচেতন মানুষমাত্রই সবাই রাগে–দুঃখে–অপমানে এক একটি ফুটোণ্মুখ আগ্নেয়গিরি।

কখন কোথায় কোনো আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হবে, তা কেউ জানে না।

আসলে গাজায় হামাসকে নিশ্চিহ্ন করতে যে জঘন্য অপরাধ চালানো হচ্ছে, তা প্রত্যক্ষ করে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ইহুদি জাতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে। যদিও সব ইহুদি এই জঘন্য কর্মের সংগঠক নন, সমর্থকও নন। নেতানিয়াহুর কাজকর্মের কারণে পৃথিবী ইহুদিদের জন্য অনিরাপদ, ভয়ংকর হয়ে উঠবে।