‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়!’

মারজুক রাসেল লিখেছিলেন—

‘আমি তো প্রেমে পড়িনি

প্রেম আমার উপরে পড়েছে’

সারা জীবন প্রেম–ভালোবাসা থেকে নিজেকে সংগত কারণেই সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। কৈশোরের যে বয়সে মনের পাতায় রং লাগে, চোখে লাগে ঘোর, আর বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি তৈরি হয় কুসুম কুসুম ভালোলাগা, তখন আমাকে জোর করে এসব অনুভূতি সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। কারণ, আমার দাদির একটা প্রবাদ ছিল— ‘ভাতের কুড়কুড়ি কি যৌবনের কুড়কুড়ি।’ সহজ কথায়, পেটে ভাত থাকলে সবই ভালো লাগে, কিন্তু পেটে ক্ষুধা থাকলে আর কিছুই ভালো লাগে না।

পদ্মার পাড়ে জন্ম নেওয়া আমার জীবনটাও যেন নদীরই প্রতিচ্ছবি। পদ্মা যেমন শীতকালে শুকিয়ে যায়, আমার জীবনটাও কৈশোরের সময়ে একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। পেটে ভাতের সংস্থান নেই। পরনের কাপড়ে শত তালি। এক পোশাকেই বছর পার করতে হয়। এর পাশাপাশি পড়াশোনাটা ছিল গরিবের ‘ঘোড়া রোগ’। তবু কোনো রকম চালিয়ে নিচ্ছিলাম। পাড়ার বন্ধুরা বিভিন্ন মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে শুরু করল এবং নগদে ‘ছ্যাঁকামাইসিন’ খেয়ে ‘ব্যাকা’ হয়ে গেল। পাশাপাশি পড়াশোনা উঠল চাঙে। কিন্তু আমাকে জোর করে এই বিলাসিতা থেকে মুক্ত রাখতে হলো। কারণ, পড়াশোনা করে নিজের এবং পরিবারের অভাব দূর করতে হবে। আমি তাই পাড়ার মোড়ের দোকানে বসে নচিকেতার গান শুনি আর নিজেকে নিজেই প্রেরণা জোগাই—

‘এই তুমি কি আমায় ভালোবাসো?

যদি না বাসো, তবে পরোয়া করি না’

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যখন মনের রং আরও একটু গাঢ় হলো, তখন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আরও বেশি ভালোলাগা তৈরি হলো। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় সেটাকেও চেপে রাখতে হলো। এরপর বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধুরা সবাই মোটামুটি প্রেম করতে শুরু করল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে আমরা তখন চাইলেই রাজত্বসহ রাজকন্যার বাবা রাজি। কিন্তু আত্মসম্মানের গর্বে সেদিকে আর পা বাড়ালাম না। বন্ধুরা যখন বিকেলে নিজেদের প্রেয়সীকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়, আমি তখন ঢাকা শহরের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত হেঁটে টিউশনি করে ক্লান্ত হয়ে হলে ফিরি। নিজের পড়াশোনার খরচ, ছোট ভাইদের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি সংসারেও কিছুটা সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তাই প্রেম বিষয়টা ঠিক যেন আমার করে ওঠা হলো না।

অবশ্য বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রেম নিয়ে আমার কিছু তত্ত্বও ছিল। আমি প্রেমিকদের বলতাম, পোষা কুকুর। আর কুকুরের মালিক হচ্ছে প্রেমিকা। পোষা কুকুর যেমন মনিবভক্ত হয়, প্রেমিকও ঠিক তেমন। মালিকের দরকারের সময় তুতু করে ডাকলেই লেজ নাড়তে নাড়তে বেচারা কুকুর হাজির। আবার কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে গেলেই মালিক কষে পেছনে একটা লাথি দেন। লাথি খেয়ে ব্যথায় কুঁই কুঁই করতে করতে ফিরে আসে। এরপর আবারও মালিক তুতু করে ডাকলে আবারও হাজির হয়। এমন একটা অশোভন কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল। উপরন্তু হলের রুমমেট তানভীরের এহেন কুকুর স্বভাবের কর্মকাণ্ড প্রেম সম্বন্ধে মনে আরও বিতৃষ্ণা তৈরি করেছিল। আমাদের সহপাঠী এক মেয়ে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ–সুবিধা নিয়েছিল। এরপর যখন সে সেই মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল, মেয়েটা তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিয়েছিল—

‘আমি তোমাকে ভালো বন্ধু বলেই জানতাম, সেই তুমিও আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে!’

প্রেম নিয়ে আরও যেসব অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেগুলোও প্রেম করা থেকে আমাকে নিরুৎসাহিত করত। বন্ধুরা টিউশনি করে টাকা কামিয়ে প্রেমিকাকে দামি উপহার কিনে দিয়ে সেই টাকার শ্রাদ্ধ করত, যেটা আমার পক্ষে কোনোকালেই সম্ভবপর ছিল না। তখন সবে মুঠোফোন মানুষের হাতে আসছে। মুঠোফোনের দাম যেমন অনেক, তেমনি এক মিনিট কথা বলতে গেলেও অনেক টাকা খরচ করতে হয়। বন্ধুরা তাদের প্রেমিকাদের মুঠোফোন কিনে দিয়েই ক্ষান্ত হতো না। প্রেমিকা মিস কল দিলেই সাথে সাথে কল ব্যাক করা ছিল বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া অনেককেই দেখলাম ছ্যাঁকা খেতে। আমার খুব কাছের এক বন্ধুকে একদিন দেখলাম, ছ্যাঁকা খেয়ে আনাড়িভাবে দামি সিগারেট ফুঁকছে। এসব দেখেশুনে নিজে তো প্রেম করলামই না, পরিচিত যারা প্রেম করত তাদেরও চরমভাবে নিরুৎসাহিত করা নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করতাম।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আমি যেহেতু মানুষকে প্রেম করতে শুধু নিরুৎসাহিতই করি না, বরং ভুজুং ভাজুং দিয়ে তাই পরিচিতজনেরা একসময় আমাকে আর তাদের সম্পর্কের বিষয়গুলো বলত না। তাদের একসময় প্রকট ধারণা হলো এই ছেলে জীবনেও প্রেম বা বিয়ে থা করবে না। তারপরও মানুষের মন বলে কথা। অবচেতন মন নিশ্চয়ই চাইত একটা অন্তত প্রেম হোক। দুজন মুখোমুখি বসে গোধূলির মায়াবী আলোয় একে অপরের চোখে স্বপ্ন আঁকি। সেই সুযোগও এল। আমার নিজ জেলার প্রাক্তন এক ছাত্রী, যে আমারই সমবয়সী ছিল। আমরা প্রথমবারেই ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু সে না পাওয়ায় তাকে প্রাইভেট পড়াতে হয়েছিল। সে নাকি আমাকে মনে মনে পছন্দ করত। তত দিনে সে–ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করে লাক্স চ্যানেল আই ফটোসুন্দরীর প্রথম ২০ জনের ১ জন ও হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের বাধার কারণে আর এগোতে পারেনি। তার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। এক ছুটির দিনে সকালে সে ফোন দিয়ে দেখা করতে বলল, কিন্তু তখন আমার কাছে ঘুমটাই মুখ্য। তাই মোবাইল বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর বুঝলাম, আমি আসলে সবেচেয়ে বেশি নিজেকেই ভালোবাসি। অন্য মানুষের ইচ্ছাপূরণের মতো ন্যূনতম ইচ্ছা আমার নেই।

এই পর্যন্ত বলে হাসান সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসলেন। আমি বললাম, এই তাহলে আপনার প্রেমের আখ্যান। উনি বললেন, ইয়াকুব সাহেব গল্প এখনো শেষ হয়নি। আমি বললাম, বলেন কী! এখানে হাসান সাহেবের একটু পরিচয় দিয়ে রাখি। আমি অনেক হাঁটাহাঁটি করি এবং পথেঘাটে যেকোনো মানুষের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিই। এভাবেই ওনার সঙ্গে পরিচয়। দুজনের মানসিকতা মিলে বলেই যোগাযোগটা বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছে। যাহোক, এরপর উনি যেটা বললেন, আমি তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। উনি বললেন, সংসারের দায়িত্ব পালন করেও অনলাইনে এক মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়। শুরুতেই দুজন সম্পর্কটাকে বন্ধুত্বের মধ্যে রাখার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। সবই ঠিকঠাক চলছিল। এর মধ্যে একদিন দেখি, ওনার মুখটা শুকনো। বললাম, ‘ঘটনা কী, ভাবির সাথে ঝামেলা হয়েছে বুঝি।’

উত্তরে উনি বললেন, ‘না ভাই, বুড়ো বয়সে ছ্যাঁকামাইসিন খেয়েছি। তরুণ বয়সে খেলে হয়তোবা তেমন কিছু হতো না, কিন্তু বুড়ো বয়সে হাড়গোড় ভেঙে গেছে।’ উনি বলে চললেন, ‘মহিলার সাথে আমার আলাপ চলছিল ঠিকঠাক। এর মধ্যে একদিন মহিলা বললেন, তার নাকি একজনকে ভালো লাগে।’ হাসান সাহেব বললেন, তা লাগতেই পারে। এরপর বললেন, অনলাইনে এক লোকের লেখা পড়ে তাকে ভালো লেগে গেছে। এরপর হাসান সাহেব অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন, তার মন খারাপ হচ্ছে। এর পর থেকে তার আর মন খারাপ ভাব যাচ্ছেই না। উনি বললেন, ‘ভাই বিশ্বাস করেন, আমি কস্মিনকালেও সম্পর্কটাকে অন্যকিছু ভাবিনি, কিন্তু তবু এমন কেন হচ্ছে?’ আমি বললাম, ‘আমি আপনাকে চিনি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু মানুষের মন বলে কথা। সে যে কখন কার বাঁধনে আটকা পড়বে, কেউই সেটা আগে থেকে বুঝতে পারে না ভাই।’

উত্তর শুনে উনি বললেন, ‘এটা কাটিয়ে উঠতে কত দিন লাগতে পারে?’ আমি বললাম, ‘হয়তোবা বাকি জীবন আপনাকে এই স্মৃতি আঁকড়েই বাঁচতে হবে, যেহেতু আপনি এর আগে কখনো প্রেম করেননি, অথবা আপনি ধুর ছাই বলে সবকিছু কাটিয়ে উঠবেন। সময়ই আপনাকে বলে দেবে, আপনার ক্ষেত্রে কোনটা ঘটবে। তবে আমার উপদেশ হলো মনের ওপর জোর করবেন না।’ উনি বললেন, ‘জোর করছি না, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ওনার সাথে কথা না বললে ভালো লাগে না, আবার কথা বললেও অশান্তি লাগে। আমি কী করব!’ আমি বললাম, ‘কবি এখানে নীরব।’ আমার মনে তখন কবিগুরুর গানের একটা চরণ ঘুরপাক খাচ্ছে—

‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়।’