ভালোবাসা-সর্বজনীন ধর্ম

সস্ত্রীক এই প্রথম ভ্রমণ আমার এই শহরে। বাচ্চারা এতটাই প্রফুল্ল যে আমার ছেলে ওয়াও বলে এক প্রকার চিৎকার করে উঠেছিল। আশপাশের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। অনেকে মিষ্টি হেসে নিশ্চিত হলেন যে এটা বাচ্চার অতি আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। আমার এতটুকু ছেলের বোধ দেখে আমিও পরবর্তী সময়ে অবাক হই। যখন বুঝল তার দিকে তাকিয়ে আছে অনেকেই, সে লজ্জায় মাথা নিচু করে মুচকি হাসল। সে হাসি দেখার মতো ছিল। হাসিটা ফ্রেমবন্ধী করতে পারিনি। কিন্তু আমার হৃদয়ের ফ্রেমে সেটা অমলিন। শুধু এয়ারপোর্টের সৌন্দর্য দেখেই তারা এতটা মুগ্ধ। অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য দেখার অপেক্ষায় শুধু রাতটা কাটল।

আমরা ফুটওভার ব্রিজ অতিক্রম করতে যাচ্ছিলাম সেদিন। বাচ্চাদের প্রশ্নে আমার নীরবতা বিদায় নিয়েছিল। বিরক্তি উঁকি দিলেও আমি যুদ্ধ ঘোষণা করতাম। যেন তাদের কৌতূহল নষ্ট না হয়ে যায়। ওভারব্রিজ যেন আরেক নান্দনিক এবং আর্কিটেকচালার বিউটি এই শহরে। কৌতূহল আমারও কমনা এসবে। কিন্তু আমি কাউকে প্রশ্নে প্রশ্নে জানতে পারিনি। হয়তো কারো কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ফালতু কাজ। কিন্তু আমার বাচ্চাদের প্রশ্নে আমার এটা মনে করার প্রশ্নই আসে না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

—বাবা এইখানে ছাদ দিয়েছে কে? খুবই সুন্দর তো, ছাদ না দিলে তো আমরা এখন ভিজে যেতাম, তা–ই না?

আমি সব প্রশ্নের উত্তরই পেয়ে গেলাম তার প্রশ্নের মধ্যে।

—ছাদ দিয়েছে ভালো মানুষেরা প্রিয়। আর এই জন্যই দিয়েছে যেন তোমার মতো অন্য সবাই বৃষ্টিতে না ভিজে।

তারপরের প্রশ্ন শুনতে শুনতেই আমরা লিফটে উঠি।

—আচ্ছা বাবা ওভারব্রিজেও এই ফুলগাছ কেন লাগিয়েছে? কি সুন্দর তাই না বাবা? বাবা আমরা কি এখন ওপরে যাব? কোন বাটনে চাপ দেব এখন আমরা? সে তার আঙুল এদিক–সেদিক করছে। স্থানীয় মানুষেরা তার এই আহলাদি বিষয়ে বিরক্ত হয় কি না, আমি সেটা ভাবছি। আমার স্ত্রী আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তবে পরিবেশ বলছে ভিন্ন কথা। সবার উৎসাহী চোখ! স্থানীয় বাচ্চারা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তারা নিজেরা জড়সড় হয়ে যেন আমাদের জন্যই সর্বোচ্চ জায়গাটুকু ছেড়ে দিচ্ছে। নামার সময় সে স্তম্ভিত। কে আগে নামবে। আমাদের সুযোগ দেওয়া হলো। এক প্রকার লাফিয়েই লিফট থেকে নামল। কয়েক পা এগোতেই বয়স্ক নারী বাচ্চাদের উদ্দেশ্য সম্ভাষণ জানিয়ে ব্যাগ থেকে দুটো চকলেট বার এবং একটি মোড়ক জড়ানো কিছু আমার ছেলেমেয়ের হাতে দিলেন। বাচ্চারা দুজনেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে গ্রহণ করল। লক্ষ্য করলাম বয়স্ক মহিলার ব্যাগে বৌদ্ধিক কিছু বই, ছোট কয়েকটি মূর্তি। বুঝতে পারলাম হয়তো বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী তিনি। আমি ছেলেমেয়েকে কোলে তুলে দুই পাশের ফুলগাছ দেখালাম।

—এই ফুলগাছগুলোও ভালো মানুষেরা রোপণ করেছে প্রিয়। তুমি যেমন দেখে আনন্দিত হয়েছো, তারা চায় যেন সবাই একই রকম আনন্দ পায় এখান দিয়ে আসা–যাওয়ার সময়।

জাপানিজ গার্ডেন যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা মেট্রোতে। সকালের এই সময় প্রচুর লোকসমাগম। আসন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমি দাঁড়িয়ে দুই বাচ্চার হাত ধরে আছি। টালমাটাল অবস্থা মেট্রোর ঝাঁকুনিতে। পুরো মেট্রোজুড়ে ধরার জন্য বিশেষ বেল্টহোল্ডিং রয়েছে। বাচ্চারা চলন্ত মেট্রো থেকে ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের বাইরের ছুটে চলা শহর দেখছে আর আঙুল নির্দেশ করছে। অনেকেরই দৃষ্টি তাদের দিকে। মেয়ে দেখতে পাচ্ছিল না বলে তাকে কোলে নিয়ে দেখাতে হচ্ছিল। মধ্যবয়সী দুই মহিলা সিট ছেড়ে দিয়ে আমার বাচ্চাদের জন্য সিট অফার করলেন। আমি ফিরিয়ে দেওয়ার আগেই বাচ্চারা বসে পড়ল। আরেকজন ভারতীয় পুরুষ সিট অফার করলেন আমার স্ত্রীকে। সে আমার দিকে তাকিয়ে হয়তো অনুমতি চাইছে। আমি বসতে বললাম। ছেলের চোখে পড়ল বিশেষ সিটগুলোর দিকে।

—আচ্ছা বাবা, এই সিটগুলো আলাদা কেন? বলেই সে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে পড়তে শুরু করলো ‘Please offer the seat, who needs it most!’ বাবা এর মানে কী?

আমি তাকে মানে বুঝালাম। ভেঙে ভেঙে অর্থ করে দিলাম।

—এরা কত ভালো, তাই না?

স্ত্রীর জিজ্ঞাসায় আমি হুম বলে মাথা নাড়লাম। মানুষে মানুষে পার্থক্য বললাম। সৌন্দর্যের সজ্ঞায় ব্যবহার বুঝালাম।

আমরা যখন জাপানিজ গার্ডেন পৌঁছলাম, তখন তপ্ত রোদ। চারদিক খাঁ খাঁ করছে। কংক্রিটের রাস্তা আর আশপাশের স্থাপনা থেকে তাপ প্রতিফলিত হয়ে যেন রোদের তাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। প্রতিটা মুহূর্ত এবং পরিবেশের ভিন্নতারই একটা আলাদা সৌন্দর্য থাকে। রোদের আলো–সবুজ গাছগুলোর ওপরে যেন সবুজের দ্যুতি ছড়ায়। কখনো বাচ্চাদের ছবি তুলছিলাম, কখনো তার মায়ের। আবার সবার একসঙ্গে ছবি তুলছিলাম। কিন্তু সপরিবারে ছবি তোলা যাচ্ছিল না মনের মতো করে। সেলফিতে সেভাবে পাচ্ছিলাম না পুরোটা। আমার সেলফি স্টিক না থাকায় এটা আরও কঠিন হয়ে গিয়েছে। এই রোদের তাপপ্রবাহও ভ্রমণেচ্ছুদের আগ্রহকে থামাতে পারেনি। আমাদের মতো অনেকেই ঘুরে ঘুরে উপভোগ করছে। বনসাই গার্ডেন, বনসাই পেভেলিয়ন, বেম্বো গ্রোভ, গ্রান্ড আর্ক হোয়াইট রেইনবো ব্রিজ, টুইন পেগোডা, স্টোন বোট টি হাউস ঘুরে আমরা সানকেন হাউসের গেটে দাঁড়িয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের ছবি তুলছিলাম। স্থানীয় একজন পুরুষ এসে আমাকে সম্ভাষণ জানিয়ে এক ধরনের অনুরোধ করলেন সপরিবার একসঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য। I am helping to frame you together. Be framed with your loved one! আমি আনন্দ চিত্তে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে মুঠোফোনটা এগিয়ে দিলাম।

আমার স্ত্রীর অনুভূতির বাইরে শুধু বাচ্চাদের এই অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং অভিবাদন ছিল অনন্য।

আগন্তুক, অভিবাসী এবং বেড়াতে আসা মানুষের প্রতি এই সম্ভাষণ, আন্তরিকতা, সৌজন্যবোধ, ভালোবাসা হয়তো ওদের অন্তরে খোদাইকৃত থাকবে।

স্বজাতিক, স্বগোত্র এবং স্বধর্মীয় অনুভূতির বাইরে এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণের এত রকমফেরের মধ্যেও ভালোবাসা যেন সর্বজনীন এক ধর্ম।

ধর্মের উৎপত্তি এবং উদ্দেশ্য ভালোবাসা হলেও আমরা তার উপস্থিতি কমই দেখি।

ধর্ম আলাদা। অথচ ভালোবাসাই যদি একটি ধর্ম হয়, তবে আর কোনো ধর্মের উপস্থিতি যেন মূল্যহীন। প্রকৃতপক্ষে, ভালোবাসাই হচ্ছে ধর্ম। যেই ধর্ম সব ধর্মের পার্থক্যকে মুছে দিতে পারে। দেখাতে পারে অনন্যতা।