একটি সম্পর্কের অকারণ মৃত্যু ও তাহারা–২
সুমনা অরনীকে সব বলে জানতে চায়, কেন এমন হলো? কেন অমি তাকে এভাবে উল্টোপাল্টা কথা বলল। অরনী তার উত্তর না দিয়ে ভয়ানক শশব্যস্ত হয়ে বলে, ওর অমির সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওর বন্ধু বলতেই পারে। তাই সুমনা কিছুই ভাবে না ব্যাপারটা নিয়ে। তবে অরনী চায়, সেটা সুমনার বান্ধবীর বাসায় হবে। আর যেহেতু সেটা সুমনার বান্ধবীর বাসা, সুমনাও সঙ্গে যাবে। সুমনা দুবার ভাবেনি, কেন! কৌতূহল হয়নি যে তা নয়। তবে সেদিন সে না গেলেই ভালো করত। সুমনা ভাবেওনি অরনী সুমনাকে অমির সঙ্গে আবার কথা বলতে নিয়ে যাচ্ছে!
গিয়েছে সরল বিশ্বাসে অরনীর সঙ্গে। সুমনাকে নিয়ে সে খেলছে, ভাবেইনি অরনী। ফোনে কথা শুরু করেই অরনী সুমনার হাতে ফোন দেয় কথা বলতে, সুমনা ভেবে পায় না কেন!
সুমনা সেখানেও তাকে ভদ্রভাবেই জানায়, সে অপারগ। আর এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। না তাকে সুমনা চেনে, না তার প্রতি সুমনার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট আছে। ‘হ্যাঁ’ কেন বলবে?
কথা শেষ করে ফিরতি পথে, অরনী সুমনাকে ব্ল্যাকমেল শুরু করে, ‘তুমি অমিকে “না” করেছ, এখন সে আরও ডিপ্রেসড, কান্নাকাটি করছে!’
সুমনা তাজ্জব হয়ে যায়, ‘তাতে আমার কী করার আছে?’
ঘটনার এখানেই পরিসমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল। কী বলেন?
না অমিকে সুমনা চিনে, না তার প্রতি তার কোনো ইন্টারেস্ট আছে।
আর অর্ণব যা পজেসিভ! কী অনর্থ ঘটাবে এসব জানলে, সেটাই তার মাথায় ঘুরছে তখন।
ঘটনার পরিসমাপ্তি? ভাই ধৈর্য ধরেন। কাহিনির ক্লাইমেক্সই তো আসেনি এখনো!
অরনী কাঁদতেই থাকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, রাত নামে, তার সঙ্গে তার কান্নার প্যারামিটারও বাড়তে থাকে। আর ব্ল্যাকমেল? শুরু হয় নতুন ধান্দা!
তুমি ‘না’ করেছ, এখন অমি নিজেকে কাটাকাটি করছে। মরে যাবে ছেলেটা। হেঁচকি তুলে কান্না। মাঝরাত তখন। অরনী বলতে শুরু করেছে, প্লিজ একটা কিছু করো! হিস্টিরিয়ায় পেয়ে বসেছে যেন অরনীকে।
এবার সুমনা ঘাবড়ে যায়। ৭ ঘণ্টার ননস্টপ কান্না আর হিস্টিরিয়ার কারণ খুঁজে পায় না সুমনা! এমন না যে লোকটি সুমনাকে চেনে! কেন এসব উটকো ঝামেলা সুমনাকে পোহাতে হচ্ছে, সুমনার মাথাতেই ঢুকছে না। সে তো সোজা না করেছে, লোকটা ভদ্র বলেই মনে হয়েছে, মেনে নিয়েছে! অরনীর সমস্যা কী? আর যদি লোকটা যদি সত্যিই আত্মহত্যা করে, অরনী তো সুমনাকেই দুষবে! সুমনা কী করবে? ‘ভাত চাই না কুত্তা খেদা’র কথা মনে পড়ে সুমনার। কী করলে এই অসহ্য ন্যাগিং থেকে আপাত রক্ষা পাবে সুমনা?
হুম সে গিয়ে বাকি ক্লাসমেটদের বলতে পারে, জানতে চাইতে পারে, উপদেশ চাইতে পারে, তার কী করা উচিত এই মুহূর্তে—তবে তাতে অরনী ছোট হয়ে যাবে সবার কাছে। অরনীকে কেউ পছন্দ এমনিতেই করে না। সুমনার খারাপ লাগবে, ওর বন্ধু সবার কাছে আরও ছোট হয়ে গেলে। সেটা সে কেমন করে করবে?
এদিকে রাত দুটো বাজে। সে অর্ণবকেই–বা কোথায় পাবে এত রাতে? তখন তো ল্যান্ডফোনই একমাত্র ভরসা! যার বাসায় ফোন আছে, তাদের সেইরাম দাপট। অর্ণবকে তো কোনোভাবেই রিচ করা যাবে না যে সুমনা তাকে জিজ্ঞেস করবে একটিবার—কীভাবে সে হ্যান্ডেল করবে এই বিরক্তিকর পরিস্থিতি! অর্ণব তো তাকে ভুলও বুঝতে পারে? ভয়ে তার হাত–পা কাঁপছে! তবে শুধু মনে হচ্ছে, এই লোক যদি সেলফমিউটিলেট করছে এখন, তা থামানোর একমাত্র রাস্তা ‘হ্যাঁ’ বলা। বাকিটা কাল দেখা যাবে।
অর্ণব মানবে? বুঝবে? ভুল বুঝবে না, ওর ফিয়ন্সে হ্যাঁ বলেছে, শুধু ঝামেলা ঠেকাতে? বুঝবে না? সুমনা তো অমিকে ভালোবাসে না। ‘হ্যাঁ’ বললে কি অর্ণব খুব রাগ করবে? বুঝবে না সুমনা শুধু অর্ণবকেই ভালোবাসে, বুঝিয়ে বললে? এই ‘হ্যাঁ’র কোনো ভ্যালু নেই—মানবে অর্ণব?
কী করবে সুমনা? বিকেল পাঁচটা থেকে এই রাত দুইটা আর কত সে হিস্টিরিয়া সহ্য করবে? সুমনা আবার ভুল করল, বন্ধুকে বিশ্বাস করে, প্রেমিককে বিশ্বাস করে যে সে বুঝবে। না সে অর্ণবকে ফেলে অমিকে বিয়ে করবে না। সম্ভবই নয়। এটা শুধু বান্ধবীর হিস্টিরিয়া কমাতে, তার বন্ধুর সুইসাইডাল টেনডেন্সি ঠেকাতে, আর কিছু হলে যেন দায়টা সুমনার না হয়—তা এড়াতে। হয়তো অন্যায় এটা তবে, এর চেয়ে আর কোনো ভালো সলিউশন সুমনা রাত দুইটায় দেখতে পায় না। এটাও বুঝে পায় না, কেন এই সাইকো দুই দিন কথা বলেই এই সমস্যা ক্রিয়েট করছে? অথবা তার প্রিয় বান্ধবীই–বা কেন তাকে ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছে কারণ ছাড়াই?
বন্ধুই তো তারা—একজন আরেকজনের জন্য অতটুকু তো করাই যায়। আর পরিস্থিতি হয়তো সকালে ভালো হবে। সুমনার ঘুমও দরকার—মাথা আর কাজ করছে না। ঠিক করল, যা আছে কপালে, কাল অর্ণবকে বুঝিয়ে বলবে, আপাতত কুত্তা সামলাই—‘হ্যাঁ’ বলি। কাল বোঝা যাবে বাকিটা।
সুমনা ভীষণ বোকা, তা–ই না? এত সহজে ম্যানিপুলেট করা যায়?
হুম সেই রাত দুইটার পর সে কোনোরকমে শুধু ‘হ্যাঁ’টুকুই বলেছিল, সেটাও সরল বিশ্বাসে! ভাবছেন একজন মানুষ কতটা আহম্মক হয়?
স্বাভাবিক ভাবা। তবে সেই মাঝরাতে তার হিস্টিরিক বন্ধুর কাজকর্মে তার আর সোজাভাবে চিন্তা করার অবসর ছিল না। অরনী অমিকে নাকি ভালোবাসত। অমিও তাকে। তবে অমি অরনীকে বিয়ে করবে না। কারণ সে দেখতে অসুন্দর।
ওদিকে হ্যাঁ বলেই সুমনা ঘাবড়ে গেছে ভেবে, কেন সে ‘হ্যাঁ’ বলল। অর্ণবকে চেনে সে, এর প্রাইস যে কী হবে, ভেবে এবার সে আতংকিত। খুন হয়ে যাবে সে। কে বাঁচাবে অর্ণবের রাগ থেকে?
শুধু ভাবছে, অরনী যদি সত্যিটা বলে অর্ণবকে, তাহলেই বাঁচার একমাত্র উপায়। নিশ্চয় অরনী মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না। ওর জন্যই এত কিছু। নয়তো অমি কে? না সুমনা তাকে চেনে, না জানে, না তার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে। বুঝবে অর্ণব? ভুল বুঝবে না তো। এবার সুমনার চোখ ভরে জল আসে, না চাইতেও কান্না। ঘুম পাড়াতে তাকে বন্ধুরা এবার ঘুমের ওষুধ দেয়। কেউ জানলও না কী ক্ষতি অরনী তার করেছে! সুমনা বন্ধুকে কারও কাছে ছোট করবে, ভাবতেও পারে না।
এদিকে কেউ জানেও না তার আর অর্ণবের সম্পর্কের কথা। জানে না সেটা নয়। অফিশিয়ালি জানে না, তবে এত দিনে সেটা ওপেন সিক্রেটও। তবে কেউ সেটা পছন্দও করে না। তাতে সুমনা বা অর্ণবের কিছু যায় আসে না। কিন্তু এই ঝামেলা সুমনা কী করে সামলাবে?
পরের দুই দিন সুমনার চোখের জলে গঙ্গা যমুনা—ভয়ে, হতাশায়, নিজের ওপর রাগে। অর্ণবের রাগের সঙ্গে পরিচয় আছে তার। তারপরও দুই দিন পরে সে ঠিক করে অর্ণবকে বলবে সব। যা রায় দেবে, মাথা পেতে মেনে নেবে সুমনা।
অফকোর্স সাইকো অমির কাছে যাবে না। আশা, অরনী ঝামেলা পাকিয়েছে, সে–ই মেটাবে। সে বন্ধুর জন্য গলাজলে নেমেছে, মাথা তলিয়ে যাচ্ছে, অরনী হাঁটুজলে নামবে না তাকে বাঁচাতে? শুধু সত্যিটা বলুক অর্ণবকে, তাহলেই চলবে। অর্ণব ছাড়া সুমনা বাঁচতে পারবে না, সুমনা জানে সেটা! অল্প দিনেই এই পাগলটাকে এত ভালোবেসেছে সুমনা যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না, অর্ণবকে ছাড়া। চলবে...
**দূর পরবাসে লেখা পাঠাতে পারবেন আপনিও। ঠিকানা [email protected]