ফুলকপির গল্প
ফুলকপি খেতে কে না ভালোবাসে?
ফুলকপি খুবই পুষ্টিকর একটি সবজি; এটি রান্না করে তো বটে এমনকি কাঁচাও খাওয়া যায়। আবার স্টিমড বা সিদ্ধ করে ব্লাক পিপার অলিভ অয়েল দিয়ে লবণ ছিটিয়েও খাওয়া যায়। দেশে এই শীতের সময় ফুলকপির হরেক পদের সবজি রান্না হয় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই। বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ এই সবজি দিয়ে তরকারি খেতে পছন্দ করে। শীতের বাজারে সহজলভ্য এই সবজি।
এখন এই মৌসুমি সবজিটি নানা স্বাদে ও ভিন্ন নানা পদে আমাদের খাবার টেবিলে পরিবেশিত হচ্ছে। ফুলকপির সাধারণ তরকারি ছাড়াও ফুলকপি ক্রাস্ট পিৎজা, ফুলকপির কোরমা, কারি মসলাদার ফুলকপি, গার্লিক পার্মেজান চিজ ফুলকপি এমন নানা বাহারি নামে খাবার হয়ে আমাদের রসনায় স্বাদ জুগিয়ে চলেছে।
আমাদের পাশের দেশের উত্তরাঞ্চলে গোবি কা পরোটা বা ফুলকপির পরোটা একটি জনপ্রিয় স্টাফড (পুরভরা) রুটি, যা সাধারণত সকালের নাশতায় দই, আচার বা মাখনের সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করা হয়।
সহজলভ্য ও দৃষ্টিনন্দন এই সবজির রয়েছে নানা উপকারী গুণও।
ফুলকপি আহসান পরিবারেরও একটি প্রিয় সবজি।
আহসান পরিবারটিকে অভিজাত পরিবারের মধ্যে ফেললে অতিশয়োক্তি হবে না। কারণ, পরিবারটি ধনী, সুশিক্ষিত, অমায়িক ও ভদ্রোচিত আচরণ গুণে গুণান্বিত, একদিকে যেমন পরিবারটির মধ্যে সাংস্কৃতিক রুচিবোধ আছে, তেমনি আছে সমাজে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। মিস্টার ও মিসেস আহসান দুজনেই এডুকেটেড জ্ঞানী ভদ্র ও যোগ্য। প্রথাগতভাবে অত্যন্ত সম্পদশালী এবং বিত্তবান পরিবার। অঢেল পয়সার মালিক।
দুই কন্যার জনক–জননী। সুকন্যা দুটির বিয়ে হয়ে গেছে। একজন থাকে আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় অন্যজন ঢাকার উত্তরায়।
মিস্টার ও মিসেস আহসানের এখন একাকিত্ব জীবন। আহসান সাহেব খুব পরোপকারী দিল দরিয়া একজন দান–খয়রাত করা মানুষ। তিনি ডান হাতে যা দান করেন, তা উনার বাঁ হাতও টের পায় না।
আহসান সাহেবের বড় এক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে কাজ করে কয়েক হাজার কর্মচারী। আর নিজ আবাসনে রয়েছে প্রায় ডজন খানেক কাজ করা মানুষ। মানুষগুলো ভীষণ নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত।
আহসান সাহেব এই মানুষগুলোকে বেতন–ভাতা ছাড়াও তাঁদের গ্রামে থাকা পরিবারকে অনেক অনেক আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।
এই লোকগুলো ঘরে বাহিরের দৈনিক কাজকর্ম দেখাশোনা করে থাকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বিশ থেকে ২৫ বছর ধরেও সেবা দিয়ে যাচ্ছে এই পরিবারে। কাজের মানুষগুলো ঠিক যেন এই পরিবারেরই সদস্য। এদের মধ্যে কেউ গাড়ি চালায়, কেউ রান্না বান্না করে। কেউ বা পুরা বাড়ির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কেউ সিকিউরিটি গার্ড। কেউ বাগানের মালি।
তেমনি একজন। নাম বাশার।
প্রতিদিন সে গ্রোসারি করে থাকে। বাশার এই কাজটি প্রতিদিন সকালে করে। বাশার নিত্যদিন বাড়ির ঘরোয়া কাজ ও টেবিলে খাবার সার্ভ করে থাকে। কিন্তু রান্নার কাজ করে সেন্টু মিয়া।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ম্যাডাম ও স্যার এর সেবা দিতে সকলেই যেন এক অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়।
আজ দুপুরে ম্যাডামের বাইরে দাওয়াত ছিল।
স্যন্ডেলটা বেল্ট সিস্টেম—তাই বাধ্য হয়েই বাশারকে ডেকে স্যন্ডেলটার বেল্ট ঠিক করে নিয়ে পরে বের হলেন ম্যাডাম।
বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। ম্যাডাম কাপড় ছেড়ে দোতলায় আসলেন।
বাশারকে ডেকে বললেন সকালে যে ফুলকপি সে কিনে এনেছিল, সেগুলো নিয়ে আসতে। কারণ, কাল সকালের নাশতায় রুটির সঙ্গে খাওয়ার জন্য ফুলকপির সবজি রান্না করতে হবে।
বাশার ফুলকপি নিয়ে এল।
ম্যাডাম ফুলকপি কেটে কেটে দেখিয়ে দিলেন—আলু কীভাবে কাটতে হবে, সেটাও বলে দিলেন।
আরও বললেন, সকালে সেন্টুকে বলে দিয়ো—তাহলে বুঝতে পারবে যে আমি কী বলেছি—
সেন্টুকে আগের দিন বললে অনেক সময় মনে রাখতে পারে না—কিন্তু কী আর করা ২১ বছর ধরে আছে এই বাড়িতে। আর বাড়ির হেঁশেল তো সেই সামলিয়ে রেখেছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ফেলে তো দেওয়া যাবে না তাঁকে!
কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, বাশার তুমি কত দিন ধরে আছো এই বাড়িতে?
ও বলল, ৭ বছর।
ম্যাডাম বললেন, বাশার-তুমি তো আমাদের কে আগামী ২০ বছর সেবা করার সময় পাবে না—তোমার স্যার এখন ৭০ আর আমি ৬০।
তোমার কি আমাদের কথা মনে পড়বে?
কোনো কথা না বলে বাশার রান্নাঘরে চলে গেল—ফুলকপি রেখে চোখ মুছতে মুছতে নিচে নেমে গেল।
ম্যাডাম বসেই থাকলেন একাকী—
ভাবতে থাকলেন—কি অল্প সময় আমাদের হাতে—অথচ জীবন আর জগৎ নিয়ে কত ব্যস্ততা!!
দুই.
মিসেস আহসান একাকী বসে থাকতে থাকতেই সাহেব এসে একটা চেয়ার টেনে পাশে বসলেন।
সেন্টু দুই কাপ ডি-ক্যাফ কপি দিয়ে গেল।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে মিসেস আহসান শুরু করলেন, জানো গতকালকে না আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।
আহসান সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, কী স্বপ্ন ছিল?
‘আমি এক বেতের চেয়ারে বসে আছি আর ঝরা আপু এসে আমার হাতে হাত রেখে স্পর্শ করে পরম মমতায় আদর করছিল।’
ঝরা আপু তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অনেক দিন হয়ে গেল। তবু এমন স্বপ্ন কেন দেখলাম?
আহসান সাহেব বললেন, দেখ—স্বপ্ন হচ্ছে নিদ্রাকালে নানারূপ কল্পনা আশ্রয়ী চিন্তা ও এক মানসিক অবস্থা। যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি কাল্পনিক বা অবচেতনভাবে অনুভব করে থাকে।
আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ এমন স্বপ্ন দেখে, যা তার ভালো লাগে, তাহলে সে বুঝে নেবে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। সে এ স্বপ্নের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করবে আর অন্যকে এ ব্যাপারে জানাবে।’
তুমিও তাই আল্লাহর প্রশংসা করো আর তোমার অন্য ভাই বোনদেরকে জানাও।
আহসান সাহেব আরও বলতে লাগলেন, তোমার এই অবচেতন অনুভবের তাৎপর্য অনেক গভীর।
এই যে তুমি বেতের চেয়ারে বসে ছিলে আর ঝরা আপু এসে হাতে হাত রেখে স্পর্শ করে পরম মমতায় আদর করছিলেন।
তুমি সেই চরম নরম হাতের ছোঁয়ার সুখানুভূতি অনুভব করছিলে। আর কেঁপে কেঁপে উঠছিলে। আপুকে অনুধাবন করছিলে হৃদয় আর মনের মাধুরি দিয়ে।
আসলে উনি তোমাকে উনার জীবদ্দশায় সব সময় এক অদ্ভুত স্নেহমাখা ভালোবাসায় সিক্ত করে গেছেন।
তুমি এখন সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। সেই উষ্ণ হাতের ছোঁয়ার কাঙাল তুমি।
আর তাই তো উনি ঘুরে ফিরে আসেন তোমার কাছে। কল্পনা আশ্রয়ী চিন্তার মধ্য দিয়ে।
আপু এখন এক অনন্ত যাত্রার পথিক।
অবিরাম ধারায় চলছেন তাই। সুম্মুখের পানে। ক্লান্তি শ্রান্তিহীনভাবে।
লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতেই হবে তাঁর। বাধা বিঘ্নহীনভাবে। অশেষ, অসীম, অন্তহীন, চিরস্থায়ী স্থানে।
মুমিন নারীর জন্য আল্লাহ অঙ্গীকার করেছেন সেই শ্রেষ্ঠ চিরস্থায়ী স্থান, যার নাম জান্নাত।
যার নিম্নদেশ দিয়ে নহর বা ঝরনাধারা প্রবাহিত, চিরস্থায়ী স্থানে উনি চিরদিন থাকবেন।
শাশ্বত, অনন্ত, চিরস্থায়ী, চিরন্তন, ও অমর হয়ে।
তাই তোমার সব ভাইবোনদের বল, এক দিন আমরা সকলে মিলে আল্লাহর দরবারে উনার জন্য প্রার্থনা করি। উনার অনন্ত যাত্রার পথটা যেন সুগম হয়। হয় যেন ফুলে ফুলে ছড়ানো। কুসুমাস্তীর্ণ।
এসব কথা শোনার পর মিসেস আহসান হঠাৎই থমকে গেল—ভাবতে লাগল, এত ব্যস্ততা, এত কর্ম কিসের তাহলে।
ছোট বড় নানান সম্পর্কে যাদের হৃদয়ের অন্তঃস্তলে স্থান দিয়েছি—
সব হাসি—আনন্দ, গান, উচ্ছাস, ছন্দ, মান-অভিমান সব, সব বাধা পেরিয়ে একা-
এক অনন্ত যাত্রায় শরীক হবো! সেই জন্যই কি?
নাহ! সে যাত্রাপথের ঠিকানা জানা নেই, সজ্ঞী নেই রক্তের বা আত্মার অথবা ভালো লাগার বা ভালোবাসার।
এক অজানা পথিক অচেনা-অদেখা পথে চলবে, কোথায় ঠিকানা জানা নেই - থামবে কোথায় জানা নেই—শেষ কোথায় তা–ও জানা নেই
তবে কি তিনিই পথ দেখাবেন—যিনি প্রথমে দেখিয়েছিলেন!
নাহ! তবু অচেনা-অজানা পথভোলা এক পথিক! শুধু জানি মাটি হব আমি। তারপর?
কেন জানি মাটিকে আজকাল খুব আপন লাগে, কারণ হয়তো আমার সব পরিজন যে ওখানে!
আমাকেও যে সে মাটি হাতছানি দিচ্ছে।
আহসান সাহেব আবারও বললেন, দেখ-সব জীবকেই এক দিন ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ্ পাক বলেছেন। আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এবং একদিন আমার কাছেই তোমাদের ফিরে আসতে হবে। ‘প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’।
আমাদের মাটি ভাল লাগে বা খুব আপন মনে হয় শুধু এই জন্যই নয় যে আমাদের আপন পরিজনরা মাটিতে মিলিয়ে আছেন।
মাটির সঙ্গে আমাদের এক অদ্ভুত মিল বা সখ্যতা আছে। আমাদের দেহ গঠনে যে সব জৈব এবং অজৈব পদার্থ আছে তার সবকিছুই মাটিতে রয়েছে।
আমরা তো মাটি দিয়েই সৃষ্টি। তাই মাটি আমাদের এতটাই প্রিয় ও আপন।
আমাদের আগে যাঁরা মাটিতে চলে গেছেন তাই আমরা তাঁদের জন্য বলি, ‘আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের আগে তোমরা মাটিতে গেছে এবং আমরা পরে আসছি’।
আমরা সবায় এক পথহারা পথিক। ক্ষণিক সময়ের জন্যে এই পৃথিবীতে আমাদের আগমন।
নিশ্চয়ই তিনি দয়ালু এবং সর্বজ্ঞানী। তিনিই আমাদের পথ দেখাবেন।
মিসেস আহসান এগুলো শুনে বললেন, হুম ঠিকই বলেছ তুমি।
বলে আবারও শুরু করল।
দেখ আমাদের এই প্রিয় মাটিতে কত সুন্দর ফুলকপিও জন্মায়।
নানা রঙেরও হয়।
আচ্ছা তুমি কি বলতে পারো— এর নাম ফুলকপি হলো কেন?
‘ফুলকলি’ হলে ভালো হতো না?
অথবা ‘ফুলকুমারী’ কিম্বা ‘ফুলঝুরি’। ‘ফুলখুকি’ নইতো বা ‘ফুলকুঁড়ি’।
ফুলকপি দেখতে এতই সুন্দর আমার মনে হয়, ‘ফুলসুন্দরি’ নামটা হলে ওর জীবনটা সার্থক হতো।
আহসান সাহেব বললেন তা হয়তো হতো । কিন্তু এই নাম এসেছে ইতালীয় শব্দ ক্যাভোলফিওর থেকে, যার অর্থ ‘বাঁধাকপির ফুল’। পাতা দিয়ে ঘিরে থাকা সাদা অংশটুকু দেখতে ফুলের মতো বলেই ফুলকপির এমন নামকরণ।