লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সমাচার

ছোট বেলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি নষ্ট করলে মায়ের বকুনি খেতে হতো। আমরা যখন ছোট, পানির বিলের ব্যাপারটা নিয়ে বড়রা তেমন মাথা ঘামাতেন বলে আমার মনে পড়ে না। তাই অতিরিক্ত পানি নষ্ট করার কারণে যে শাসনটা করা হতো, তা বোধ করি বিলের টাকা পরিশোধের চিন্তা থেকে নয়, বরঞ্চ এই বদ অভ্যাস বন্ধের তাগিতেই তা করা হতো। ‘প্রকৃতির দান অপচয় করতে নেই’, ‘অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই’। এসব উপদেশ নিয়মিতভাবে ধারণ করেই আমরা বড় হয়েছি।

শুধু পানিই নয়, মা–বাবা সচেতনভাবে তাগদা দিতেন কাজ শেষে বাতি, ফ্যান বন্ধ করে বিদ্যুতের অপচয় কমানোর জন্য। আমরা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম, তখন আমাদের মানসিক পরিপক্বতা অবশ্যই সেই লেভেলেরই ছিল, ছাত্র হিসেবে স্কুলে ‘প্রাপ্ত বয়স্কের’ ব্রেইন নিয়ে নিশ্চয় আমরা ঘুরে বেড়াতাম না। কিন্তু আমার সারা স্কুলজীবনে মনে পড়ে না দুটি বা তিনটির বেশি সোয়েটার বা জ্যাকেট হারিয়েছি। তবে অস্বীকার করব না পেনসিল, কলম বা কখনো পেনসিল বক্স হারানোর ব্যাপারটা। খেলনাও হারিয়েছি মাঝেমধ্যে।

কিন্তু এ দেশে এসে দেখলাম নিত্যদিন জ্যাকেট, সুয়েটার, ক্যাপ, পানির বোতল বা লাঞ্চ ব্যাগ হারানোর হিড়িক। কিন্ডারগার্ডেনের ছোট বাচ্চাদের কথা না–হয় বাদই দিলাম। এখানে সিক্স গ্রেড থেকে শুরু করে নিম্নে যেকোনো গ্রেডের স্টুডেন্টদের জিনিস হারানো যেন একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।

ভোরের ঠান্ডায় গায়ে সুয়েটার চাপিয়ে ছাত্রের স্কুলে প্রবেশ। মাঠে একটু ছুটাছুটি করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অসহ্য গরম লাগে। স্বভাবতই ওপরের আস্তরটা স্থান পায় দোলনার কোনায় ঘাসের ওপর, বা ‘মাংকি-বারের’ ওপর। ঘণ্টা বাজতে সুয়েটারের মালিক শ্রেণিকক্ষে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়ালেও সুয়েটার পড়ে থাকে ঘাসের ওপর।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আবার বিরতি পর্যন্ত গায়ের আস্তরটি যদি গায়ে থেকেও যায়, বিরতিকালে খেলার সময়, তা স্থান পেতে পারে স্কুলের যেকোনো স্থানে। তবে বলাইবাহুল্য আস্তরটি আর ‘মালিকের’ দেখা পায় না। আর শুধু জ্যাকেট বা সুয়েটার তো নয়। একদিন যদি স্কুলে সোয়েটার–শার্ট ফেলে যায়। পরদিন লাঞ্চ বক্স, তারপর দিন পানির বোতল বা অন্য দিন হাতের গ্লাভস, কখনো বা লাইব্রেরির বই, এমনকি চোখের চশমাও চেয়ে, চেয়ে অপেক্ষা করে থাকে পরিচিত নাকের আশায়!

শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের মধ্যে পরিপাটি থাকা ও গোছানো অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ক্লাসরুমে নানা নিয়ম বেঁধে দেওয়া সত্ত্বেও, যেদিন বেলা শেষে নিজের জিনিস বাড়িতে নেওয়ার ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিতে ভুলে যাই, সেদিন ছাত্র বিদায়ের পর আবিষ্কার করি ডেস্কের কোণায়, চেয়ারের হাতায় পরে আছে তাদের কোনো না কোনো সম্পদ। অতঃপর ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট আবার নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য হই। কারণ, ফেলে যাওয়া এ সামগ্রী ক্লাসরুমকে অপরিপাটি তো করেই তার ওপর ছাত্রদের এ ভুলোমনের মাশুল দিতে হয় আমাকেই। কখনো অভিবাভকেরা উঁকি মারেন দোরগোড়ায়, বা ই–মেইল করেন তাদের সন্তানদের ভুলে যাওয়া সামগ্রীবিষয়ক নানা অনুরোধ নিয়ে। এ সব মোকাবিলা করতে সময়, ধৈর্য আর পরিশ্রম সবই ব্যয় হয় দেদার। যেমন ম্যাক্সের মা হয়তো ই–মেইল করলেন, ‘প্রিয় মিসেস চৌধুরী, ম্যাক্স তার প্রিয় নীল রঙের মাইন-ক্র্যাফটের সোয়েটশার্টটা হারিয়ে ফেলেছে লস্ট-অ্যান্ড-ফাউন্ডে খুঁজেও পাইনি। তুমি কি একটু দেখবে ক্লাসের কোথাও ওটা পরে আছে কি না?’ উত্তরে আমার লিখতে ইচ্ছা হয় তুমি যদি তোমার একজন ম্যাক্সকে প্রিয় জিনিসটির দেখভাল করার দিক্ষা না দিতে পারো, তবে আমার ক্লাসের আঠাশটা ম্যাক্সকে সে শিক্ষা কীভাবে দিই?’ ‘আর, আমি যদি ম্যাক্স, বা মেলিসার গাত্রধানের পাত্তা লাগাতেই ব্যস্ত থাকি, তবে ওদের শিক্ষার পাত্তাটা লাগাব কখন?’

আমার বিশ্বাস এসব ছাত্রছাত্রীর গৃহে জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই। না পাওয়ার কষ্ট বোঝানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। গৃহে কেবলই বলবৎ আছে পাওয়ার আনন্দ দেওয়ার সিস্টেম, পরিণাম বা কন্সিকুয়েন্স বোঝানোর কোনো সিস্টেম নেই।

গুরুগম্ভীর আলোচনা ছেড়ে আমার লেখার মূল বিষয়ে ফিরে আসি। ফেলে যাওয়া এ সামগ্রী নিয়ে ক্লাসরুমের এ পরিস্থিতি কোনো রকমে সামাল দেওয়া গেলেও ক্লাসরুমের বাইরে উন্মুক্ত প্রান্তরের এ অবস্থা সামাল দেওয়া এক বিরক্তিকর বাড়তি দায়িত্ব! যাঁরা স্কুল পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকেন, তারা আবর্জনা, ঝরা পাতা ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিতভাবে ফেলে যাওয়া জ্যাকেট, সুয়েটার, সোয়েটশার্ট, টুপি, গ্লাভস, নোটবইয়ের জঞ্জাল সরান।

কী ভাবছেন, আমি বাড়িয়ে বলছি? বা অদ্ভুদ এ সমস্যা কেবল আমার স্কুলেই? না এটা এখানকার সার্বিক একটা সমস্যা বলেই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় প্রতিটি স্কুলেই আছে ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’–এর ব্যবস্থা। অনেক সময় শিক্ষকেরা নিজের ক্লাসের কোনায় ছোট লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড তৈরি রাখেন। যে কাপড়গুলোর মালিকানা দাবি করা হয় না, পরে তা চলে যায় স্কুলের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে। লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’–এর সারি সারি কাপড়, জুতা বা পানির বোতলের প্রদর্শনী দেখে অনেক সময় দোকানের মতোই মনে হয়।

পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকা আমাদের স্কুলের এক কর্মী একদিন হাসতে হাসতে বলেছিলেন একবার তিনি একটা খাঁচাও কুঁড়িয়ে পেয়েছিলেন, ভেতরে কোনো পশু ছিলে না, এটাই রক্ষা! তার মতে বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি হারায় সোয়েটশার্ট।

এত কিছুর পরও যখন কেউ দাবি নিয়ে আসেন না, তখন স্কুল ডিসট্রিক্টের পলিসি মাফিক কোনো চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাপড়গুলো ডোনেট করা হয়। তবে এ পলিসি কেমন হবে, তা সেই প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকদের ওর নির্ভর করে।

শিক্ষক মাত্রই জানেন একটি ক্লাসে কখনই সব ছাত্র একই স্বভাবের হয় না। অগোছালো ছাত্রের ভিড়ে মাঝেমধ্যেই এমন গোছানো পরিপাটি ছাত্রের দেখা মেলে যে অবাক হই এই বয়সে এমন পরিপাটি এরা হয় কীভাবে! মনে সাধ জাগে অভিভাবককে জিজ্ঞাসা করি ‘হে মা জননী, কি জাদু আছে তোমার প্যারেন্টিংয়ে?’ একটা সিক্রেট অবশ্য আমি শেয়ার করতে পারি, এদের অভিভাবকেরা শার্টের ছোট্ট ট্যাগে সব সময় বাচ্চাদের নাম লিখে রাখেন।

  • লেখক: শবনম চৌধুরী, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র