ব্যক্তিগত সম্পত্তি, তবু প্রবেশে বাধা নেই

কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে হয়তো অনেকেই শুনেছেন ‘এটা আমাদের হোটেলের প্রাইভেট বিচ’। কোনো কোনো হোটেল আবার বিজ্ঞাপনেও প্রাইভেট বিচ কথাটি বেশ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করে। কথাটা শুনে আমরা খুব একটা অবাক হই না; বরং ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানেই সেখানে অন্যের প্রবেশের অধিকার নেই এই ধারণাটিই আমাদের কাছে স্বাভাবিক।

আমিও ঠিক এই ধারণা নিয়েই বড় হয়েছি। কারও জমির ওপর দিয়ে হাঁটতে হলে অনুমতি নিতে হবে, পুকুরে মাছ ধরার তো প্রশ্নই আসে না, এমনকি জমিতে জন্মানো কোনো ফল বা গাছের কিছু নেওয়ার কথাও ভাবা যায় না। ছোটবেলা থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতে আমরা মোটামুটি এমন একটি সীমানাই বুঝেছি যে এটা আমার, অতএব অনুমতি ছাড়া এখানে অন্যের প্রবেশ নেই।

সুইডেনে আসার পরও দীর্ঘদিন আমার ধারণাটা একই ছিল। রাস্তার পাশ দিয়ে গাড়ি চালাতে কিংবা ট্রেনে যেতে যেতে সুইডেনের বিস্তীর্ণ বন চোখে পড়ত। কখনো মনে হতো এগুলো নিশ্চয়ই সরকারি বন। আবার কোনো হ্রদের পাশে মানুষকে হাঁটতে, সাইকেল চালাতে কিংবা তাঁবু খাটিয়ে থাকতে দেখলে ধরে নিতাম, জায়গাটি নিশ্চয়ই সবার জন্য উন্মুক্ত কোনো সরকারি এলাকা।

কথায়–কথায় তাঁরা বললেন, ‘তুমি চাইলে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বনের ভেতর দিয়েও হাঁটতে পারো। সেখানে বুনো বেরি বা মাশরুম সংগ্রহ করতে পারো। বাড়িঘর থেকে যথেষ্ট দূরে উপযুক্ত জায়গা হলে তাঁবু খাটিয়ে রাতও কাটাতে পারো।’

কিন্তু একদিন সহকর্মীদের সঙ্গে প্রকৃতি, বন আর গ্রীষ্মের ছুটি নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে এমন একটি বিষয় জানলাম, যা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কথায়–কথায় তাঁরা বললেন, ‘তুমি চাইলে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বনের ভেতর দিয়েও হাঁটতে পারো। সেখানে বুনো বেরি বা মাশরুম সংগ্রহ করতে পারো। বাড়িঘর থেকে যথেষ্ট দূরে উপযুক্ত জায়গা হলে তাঁবু খাটিয়ে রাতও কাটাতে পারো।’

আমি কিছুক্ষণ ভেবেছিলাম, হয়তো তাঁদের কথা ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। তাই আবার জানতে চাইলাম, বনটা যদি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়, তাহলেও? উত্তর এল, হ্যাঁ।

আমার বিস্ময়ের আসল জায়গাটা ছিল এখানেই। জমি একজন মানুষের, অথচ সেই জমির বনের ভেতর দিয়ে অন্য মানুষ হাঁটতে পারে! শুধু হাঁটাই নয়, সেখানে জন্মানো বুনো বেরি বা মাশরুমও সংগ্রহ করতে পারে! মালিকের কাছ থেকে আগে অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন নেই!

বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা আমার কাছে বিষয়টি এতটাই অস্বাভাবিক লেগেছিল যে পরে নিজেই খোঁজখবর শুরু করলাম। তখন জানলাম, এটি কোনো বিশেষ এলাকার নিয়ম নয়, কোনো পর্যটন সুবিধাও নয়। সুইডেনে বহুদিন ধরে চলে আসা একটি বিশেষ অধিকার ‘আলেমানসরেত্তেন (Allemansrätten)’। সহজ বাংলায় বলা যেতে পারে ‘প্রকৃতিতে সবার প্রবেশাধিকার’।

আরও অবাক হলাম যখন জানলাম, সুইডেনের বিশাল বনভূমির বড় অংশই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। অর্থাৎ বনে হাঁটতে গিয়ে আমরা যে জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছি, সেটি কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তারপরও প্রকৃতির দরজা সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে যায় না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে অন্যের সম্পত্তিতে যা খুশি করা যাবে। কারও বাড়ির আঙিনায় ঢোকা যাবে না, বাড়ির এত কাছে যাওয়া যাবে না যাতে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট হয়। চাষের জমি নষ্ট করে হাঁটা যাবে না। গাছ কাটা বা ডাল ভাঙা যাবে না। যেখানে আগুন জ্বালানো নিরাপদ নয়, সেখানে আগুন জ্বালানো যাবে না। আর নিজের উপস্থিতির কারণে জমির মালিক, অন্য মানুষ কিংবা প্রকৃতির কোনো ক্ষতি করা যাবে না।

এই বিশাল স্বাধীনতাকে সুইডিশরা খুব ছোট একটি বাক্যে প্রকাশ করে “Inte störa - inte förstöra”। অর্থাৎ, “বিরক্ত কোরো না, ক্ষতি কোরো না”। যতই বিষয়টি জানতে থাকলাম, ততই বুঝতে পারলাম আলেমানসরেত্তেন শুধু বনে হাঁটার অধিকার নয়। এর ভেতরে সুইডিশ সমাজের একটি গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। এখানে মালিকানা আর প্রকৃতিকে উপভোগ করার অধিকারকে সব সময় একই বিষয় হিসেবে দেখা হয় না।

আপনি জমির মালিক হতে পারেন। সেই মালিকানা আপনারই থাকবে। কিন্তু আপনার জমির বিস্তীর্ণ বনের মধ্য দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে, বুনো কয়েকটি বেরি তুলে নিলে কিংবা বাড়িঘর থেকে দূরে প্রকৃতির ক্ষতি না করে কিছু সময় কাটালে শুধু জমিটি আপনার বলে তাকে সব ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার অধিকার আপনার নেই।

বাংলাদেশ থেকে আসা আমার কাছে এই ধারণাটিই ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর। কারণ, আমরা এমন একটি সমাজ থেকে এসেছি, যেখানে নিজের আর অন্যের সীমানাটি খুব স্পষ্ট। বাড়ির সীমানা, জমির আল, পুকুরের মালিকানা এসব আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বাস্তবতা। সেখানে সুইডেন আমাকে প্রকৃতিকে দেখার আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি শেখাল। জমির মালিক একজন হতে পারেন, কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ অনেকের।

লেখক: মুকুল হোসেন, পুষ্টিবিজ্ঞানী ও গবেষক, সুইডিশ ফুড এজেন্সি, সুইডেন