দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেভাবে রোজা পালন করেন

প্রতিবছর রমজানে মুসল্লিদের পদচারণে মুখর থাকে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল কেন্দ্রীয় মসজিদছবি: লেখকের পাঠানো

রোজা হচ্ছে মুসলমানদের জন্য বছরে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রোজার মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমান যেমন ইবাদতে মননিবেশ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আসা করে তেমনি আমাদের খাবারের সময় এবং মেনুটাও পরিবর্তন হয়ে যায়। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশিদের ইফতারিতে থাকে নানা ধরনের ভিন্নতা ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, চপ, পিঁয়াজু, বুন্দিয়া, খেজুর এবং নানা ধরনের জিলাপি দিয়ে টেবিল থাকে পরিপূর্ণ।

কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসীরাও কি দেশি ইফতারের আমেজ পান? আজ মুসলিম সংখ্যালঘু দেশ দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসীদের রোজা ও ইফতারি নিয়ে এই প্রতিবেদন।

বাংলাদেশি প্রবাসীরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুক, যতই প্রতিকূলতা থাকুক চেষ্টা করে রমজানের রোজা পালন করার। কিছু ব্যতিক্রম হয়তো আছে, তা উল্লেখযোগ্য নয়। ঠিক তেমনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবাসীরাও শত কষ্টের মাঝেও পুরো রমজান মাস রোজা পালন করার চেষ্টা করে থাকেন।

রমজানে রোজার মূল বিষয়গুলো ঠিক রেখে বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়। ইসলামিক দেশে কিংবা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে রমজানের আবহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের দেশ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন।

বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসীর বসবাস দক্ষিণ কোরিয়ায়। একজন মুসলমানের নামাজ রোজা যেমন গুরুত্বপূর্ণ অন্যদিকে খাবারের হালাল হারাম বিষয়টি তার চেয়েও কম নয়।

বিশেষ করে যাঁরা দক্ষিণ কোরিয়াতে থাকেন, তাঁদের জন্য রোজার মাস হচ্ছে শুধুই নিজের ইবাদতের জন্য। না আছে মসজিদে আজানের শব্দ, না আছে সাহ্‌রির ডাকাডাকি, না আছে ইফতারের আগে মসজিদের কোরআন তিলাওয়াতের সুর। কার্যদিবসে নিজের ঘড়ি অথবা মুঠোফোন দেখে বিসমিল্লাহ বলে কোনো রকমের পানি কিংবা খেজুর মুখে দিয়ে ইফতার করা হয়। শুনতে কষ্টদায়ক কিন্তু বাস্তবতা এটাই। কর্মব্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় কারখানায় নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পাশাপাশি সিয়াম পালন করেন এখানকার প্রবাসী মুসলিমরা।  

দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার একটি উন্নত দেশ হলেও অমুসলিম দেশ হিসেবে মুসলমানদের কাছে পরিচিত। স্থানীয় মুসলামনের সংখ্যা অনেক কম তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিসর, মরক্কো এবং উজবেকিস্তান থেকে আসে অভিবাসী মুসলমানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার আনসান মসজিদে রমজানের প্রথম ইফতারে বাংলাদেশিসহ অভিবাসী মুসলমানদের একাংশ
ছবি: লেখকের পাঠানো

কাজপাগল দেশ দক্ষিণ কোরিয়া যে দেশে কাক ডাকা ভোরে কারখানার মেসিনের শব্দে ঘুম ভাঙে প্রবাসীদের। এ দেশে প্রবাসী মুসলমানদের রোজা পালন অনেকটাই কষ্টের। কাজের ফাঁকে সেরে নিতে হয় সাহ্‌রি ও ইফতার। অধিকাংশ প্রবাসীর কাজের ফাঁকে তাড়াহুড়া করে খেজুর আর পানি দিয়ে ইফতার করতে হয়। তার মধ্যেও আল্লাহর সুন্তুষ্টি অর্জনে রোজা পালন করে খুশি এখানকার প্রবাসীরা। মাহে রমজান এলে বাইরে থেকে ইফতারি কেনার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন রোজার ইফতারে নিজেদের মতো করে সেরে নেন কোরিয়ার প্রবাসীরা। ভোজনরসিক বাঙালিদের ইফতারে বুট-মুড়ি না হলে চলেই না। বাহারি সব ইফতারি সামগ্রীর সঙ্গে মুড়ি, বুট, পেঁয়াজু, বড়া, আলুর চপ রাখতেই হবে। আর সেখানে কোরিয়ার প্রবাস জীবনে অনেকটা ব্যতিক্রমী রোজা পালন করে থাকেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

তবে সাপ্তহিক ছুটির দিনে বন্ধুদের নিয়ে চলে নিজেদের তৈরি রকমারি ইফতারের আয়োজন। এ সময়ে নিজেদের সাধ্যমতো কয়েক পদের ইফতারি তৈরি করার সময় পান প্রবাসীরা। আবার শনিবার এবং রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় কোরিয়ার বিভিন্ন মসজিদগুলোয় থাকে ইফতারির আয়োজন।

এখানকার প্রবাসীরা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এককাতারে আদায় করে তারাবিহর নামাজও। সময় পেলে কোরআন তিলাওয়াতে মশগুল হতে দেখা যায় অনেককেই। এককথায় প্রবাসীরা যতটুকু সময় পায় কাজের পাশাপাশি রমজানে ইবাদত-বন্দেগিতেই সময়টা কাটানোর চেষ্টা করে। রমজান উপলক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিগুলোর পক্ষ থেকে কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। কমিউনিটির সঙ্গে প্রবাসীদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ইফতার মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়।

মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর, রমজানের চাঁদ দেখা, তারাবিহর নামাজ, সাহ্‌রির সময় ডাকাডাকি, আমাদের দেশে রমজান আসে সবাইকে জানান দিয়ে। কী পবিত্র ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ চারদিকে। আর দক্ষিণ কোরিয়াতে রমজান আসে নিভৃতে শুধু ক্যালেন্ডারে।

সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় রমজানের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে করে রোজাদারেরা সিয়াম পালন করতে পারেন স্বাচ্ছন্দ্যে। কিন্তু অমুসলিম দেশ হওয়ায় রমজানের কোনো ধরনের ছাড় থাকে না কোরিয়া প্রবাসীদের। কোনো প্রবাসী মুসলমান রমজানে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাসের বিষয়টি জানতে পারলে কোরীয়রা রীতিমতো অবাক হন।

আতিকুর রহমান নামের বুসানের এক প্রবাসী সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তাঁর ভাইয়ের বাসায় ইফতারের আয়োজন করেন
ছবি: লেখকের পাঠানো

বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসীর বসবাস এই দক্ষিণ কোরিয়াতে। কোরিয়াতে মুসলমানদের জীবন যাপন বলতে হয় অনেকটাই কষ্টের। একজন মুসলমানের নামাজ রোজা যেমন গুরুত্বপূর্ণ অন্যদিকে খাবারের হালাল হারাম বিষয়টি তার চেয়েও কম নয়। দেশে আমরা সাধারণত মাংস থেকে শুরু করে যেকোনো খাবারের জিনিস শুধু তার মেয়াদ দেখে চোখ বন্ধ করে কিনে নিয়ে অনায়াসে খেতে পারি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়াতে তার পুরোটা ব্যতিক্রম। বাহির থেকে মাংস তো দূরের কথা একটা চিপস খেতে চাইলেও  চিপসের গায়ে ভালো করে পড়ে দেখতে হয় এটি হালাল নাকি হারাম! রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে হলেও হিসাব করে খেতে হয়; কারণ, হালাল-হারামের প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, কোরিয়ার বেশির ভাগ খাবারে শূকরের মাংস থেকেই থাকে। তাই একজন মুসলিম হিসেবে জেনেশুনে খাবার খেতে হয়।

১৯২০ সালের দিকে তুর্কি মুসলিমরা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক বিপ্লব থেকে বাঁচতে কোরিয়ান উপদ্বীপে পালিয়ে আসে এবং কিছু সময়ের জন্য এখানেই থেকে যায়। এ ছাড়া যখন কোরিয়ান যুদ্ধ শুরু হয়, তখন জাতিসংঘ বাহিনীর অংশ হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তুর্কি সৈন্যদের মিশনারি কাজের মাধ্যমে কোরিয়দের মধ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

ইফতারে কেন্দ্রীয় মসজিদের বাহিরে লেখকসহ কয়েকজন
ছবি: সংগৃহীত

১৯৬৯ সালে কোরিয়ান সরকার প্রদত্ত জমিতে গড়ে ওঠে সিউল কেন্দ্রীয় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। বর্তমানে তিন শতাধিক ছোট বড় মসজিদ রয়েছে কোরিয়াতে। তবে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে কোরীয়দের মধ্যে। এতে অনেক কোরিয়ান ইসলাম ধর্মগ্রহণ করছেন। যার সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে।
কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় কোরীয় মুসলিম সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার যা কোরিয়ার জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। আর অভিবাসী মুসলমানের সংখ্যা ৩ লাখেরও বেশি।

লেখক: মোহাম্মদ হানিফ, সভাপতি, কোরিয়া-বাংলা প্রেসক্লাব