ভালোবাসার স্বদেশ
আমি যখন প্রথম দীর্ঘদিন পর দেশে গেলাম কেন যেন দেশের আবহাওয়া আমাকে নিল না। দুই তিন দিন পর থেকেই শুধু শুধু অসুস্থ হতে থাকলাম। বেশির ভাগ প্রবাসী পেটের পীড়ায় ভোগেন দেশে গিয়ে। আমার তা হলো না...বিচিত্র কারণে বুকে প্রচণ্ড গ্যাস তৈরি হয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। প্রথম যেদিন হলো, আমি তখন মিরপুর ১ নম্বরে...ভয়ের চোটে একটা ফার্মেসিতে ঢুকে ডাক্তারের খোঁজ করলাম, নেই। দেশের বেশির ভাগ ফার্মেসিতে বসা লোকজন আধা ডাক্তার...রোগের বর্ণনা দিলে ওষুধ দিতে পারেন। আমি শান্তভাবে বললাম, ‘ভাই, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না!’
হতভম্ব দোকানদার বললেন, আপনি ভাই আমার দোকানের বাইরে যান, এখানে ভালো–মন্দ কিছু হলে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। কিন্তু দম ঠিকমতো নিতে না পারার কারণে আমি কথা বলতে পারছিলাম না। একটু বসতে চাইলাম।
অন্য জায়গায় গিয়ে বসেন। আমি কোনোমতে একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে সোজা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে হাজির। কী মনে করে রাস্তা থেকে একটু আদা কিনে চিবাতে চিবাতে গেছি লবণ দিয়ে। এখন জানি, ওটা কাজে দিয়েছিল। ডিউটি ডাক্তার অনেক ভালো করে দেখলেন, অক্সিজেন লাগাল নাকে, ইসিজিসহ আরও কী কী করলেন! কিছুক্ষণ পর ডাক্তার সাহেব এসে বললেন, ‘আপনার হার্টে ছোটবেলা থেকেই সমস্যা আছে, কেউ বলেননি?’
‘না।’
‘ইউরোপের কোনো ডাক্তার বলেননি?’
‘না।’
‘ওনারা না বললেও আপনার এটা আছে। কাইন্ডলি আমার কার্ডটা রাখুন, ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে চেম্বারে আসুন, ভালো করে দেখে চিকিৎসা দেব। সরকারি হাসপাতালের কী অবস্থা, দেখতেই পাচ্ছেন।’
কিন্তু আমার কাছে দেশের সরকারি হাসপাতাল কখনোই খারাপ লাগেনি। দু–চারবার যা–ই গিয়েছি, আমার অভিজ্ঞতা ভালো। মনটাই তিতা হয়ে গেল ডাক্তারের কথা শুনে। জানি, আমার ওই সমস্যা নেই।
দেশে গেলেই আমার প্রথম কাজ হয় কোনো সেলুনে গিয়ে মাথা মালিশ! আধা ঘুম আধা জাগরণে কেউ মাথা, হাত, কাঁধ মালিশ করে দিচ্ছে...আঙুল ফুটিয়ে দিচ্ছে...আহা! এই অভ্যাস আমার ছিল না, প্রয়াত বন্ধু নাজিম থেকে এটা শেখা। বিদেশে এই শারীরিক আরাম নেই। সেখানে ভিন্ন কিছু। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সেলুনের এই বিরল আরাম পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না, আমার জানা নেই। তবে এখন দেশে গেলে এই নিয়ে সমস্যায় পড়ি। বেশির ভাগ সেলুনে মেশিন দিয়ে মেসেজ করে। অনেকে করতে চায় না। বলি, ‘ভাই, আপনাদের এখানে মাথা মালিশ হয়?’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
‘না।’
‘কেন ভাই?’
‘আমি করি না। কারণ, যার করব, তার শরীরের সব বিষ ব্যাদনা আমার শইল্লে চলে আসবে!’
‘ভাই, আমার ওই সব নাই।’
‘তা–ও করুম না।’
খুঁজে আরেকটা বের করি। বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে, ধরে মারে আসলে...তারপরও কোথাও সেট হতে পারি। এসবের আবার মূল্য হয় না। আপনি খুশি হয়ে যা দেন। তবে আমি দামদর করি। যা চায়, সেটার চেয়ে অনেক বেশি দিই; কিন্তু দামটা আমার জানতে হবে। ধারণা নেওয়া যাকে বলে। না হলে ফট করে গলা কাটবে জানি।
এখন হয় অন্য সমস্যা। কোথায় যাব? কার কাছে যাব? ছোটবেলার বন্ধুরা বিজি যার যার কাজ নিয়ে। বড় বেলার বন্ধুরাও তা–ই। গেলেই ফটাফট আধা কাপ চা খাইয়ে বিদায়! অনেকে খুব জড়িয়ে ধরে...রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ায়। গলাগলি ধরে দুই বন্ধু ঘুমাব গল্প করব...নেই! আহারে আহারে। নতুন বন্ধু ভয়ে বানাই না। আমরা সবাই খুব ভালো, এই ভয় কাজ করে।
বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে ইচ্ছা করে, সেখানেও নানা সমস্যা। একবার নেতার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। দেখা দিলেন। প্রবাসী পরিচয় কাজে লাগল এখানে। বিদেশে এলে সব বাঙালির ভাত খেতে হয় বলে এই কদর, বাঙালির ভাত খাওয়ার বেলায় মন্ত্রী, নেতা, সরকারি বড় কর্তার কোনো আলাপ নেই!
উনি অপারেশন করতে ইন্ডিয়া যাবেন। কিন্তু ফিরে এলে লোকজন আসতেই থাকবে, ইনফেকশন হতে পারে, এই ভয়ে ভীত। একটা উপায় বলে দিলাম...আপনি বিছানায় শুয়ে থাকবেন এবং পাশেই একটা জায়নামাজ রাখবেন। যে দেখতে আসবে, তাকে বলবেন, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে মোনাজাত করে বলে তার দুই দিনের হায়াত আল্লাহ যেন আমাকে দেন। আল্লাহ কবুল করবেন কি করবেন না, তাঁর ব্যাপার। তবে আমি মনে মনে ভাবব কবুল হয়েছে। আমাকে ভালোবাসো, তার প্রমাণ এটা...নেতা দেখবেন, তিন দিন পর থেকে আপনাকে কেউ দেখতে আসবে না। আপনি নিরাপদ থাকবেন।
ও ভাই, আপনি বিদেশে কেন? আমার সঙ্গে থাকেন। এই ছিল নেতার শেষ কথা। আবারও হা হা হা...