যে লাউ সেই কদু
ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের প্রতি আমার গভীর আগ্রহ। আমি গ্রামের ছেলে। আমার বাপ-দাদার চৌদ্দগোষ্ঠীই কৃষিকাজ করেছেন। তবে আমার বাবা ছিলেন পরিবারের প্রথম ব্যক্তি, যিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন।
এর পেছনেও একটি ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ শাসনামলে আমাদের এলাকায় নীলচাষের প্রচলন শুরু হয়েছিল। নীলচাষকে কেন্দ্র করে কৃষকদের ওপর অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতনের বন্যা বয়ে যেতে থাকে। স্থানীয় ছোটখাটো রাজাদের প্রভাবের পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল? শেষ পর্যন্ত আমার দাদা পরিকল্পনা করলেন, বাবাকে পুলিশ প্রশাসনে যুক্ত করবেন। বাবার চেহারা ও শারীরিক গঠন সম্ভবত তৎকালীন পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।
কিন্তু সরকারি চাকরি করলেও বাবা কৃষিকাজ ছেড়ে দেননি। তাঁর ৩০ বছরের কর্মজীবনে যেমন কৃষিকাজ চলেছে, তেমনি অবসর গ্রহণের পরও তিনি জমি ও কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কৃষি তাঁর কাছে কেবল জীবিকা ছিল না, ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রায় ২০ বছর আগে আমার মা–বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমরা দেশের বাইরে থাকলেও আমাদের জমিতে কৃষিকাজ এখনো চলছে। তবে জমিজমার ভোগদখল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও লক্ষ করছি। সময় ও যথেষ্ট গুরুত্বের অভাবে বিষয়টি নিয়ে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু মনে হচ্ছে, এবার কিছু একটা করা প্রয়োজন। কারণ, পূর্বপুরুষের সম্পত্তি শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার বিষয় নয়, তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও উত্তরসূরিদের।
সুইডেনে অবসর সময়ে আমি কৃষিকাজ করি। বিশেষ করে বাংলাদেশের দেশীয় শাকসবজি চাষ করে আসছি কয়েক বছর ধরে। মজার ব্যাপার হলো, শীতপ্রধান সুইডেনেও গ্রীষ্মের মৌসুমে বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের শাকসবজি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে দারুণভাবে উৎসাহিত করে। মনে মনে ভাবি, কৃষির প্রতি আগ্রহ, নতুন পদ্ধতি ও কিছুটা পরিশ্রম কাজে লাগাতে পারলে শীতের দেশেও গ্রীষ্মকালে একধরনের কৃষিবিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
আমার বাগানে লাউয়ের চাষ বেশ সাড়া ফেলেছে। অনেক সুইডিশও এখন নিজেদের বাড়ির আঙিনায় লাউ চাষ শুরু করেছেন। আমি সবজিটিকে লাউ বলেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছি, মূলত উচ্চারণের সুবিধার্থে। এভাবেই বাংলাদেশের একটি পরিচিত সবজি সুইডেনের মানুষের কাছেও ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে।
আমার বাগানের পাশে রান্নাবান্নার ব্যবস্থাও আছে। বাংলাদেশের শাকসবজি দিয়ে সেখানে রান্না করি। প্রায়ই মাঠের পরিবেশে সবাই মিলে বসে খাওয়াদাওয়া করি। চারপাশের প্রকৃতি, তাজা সবজি, রান্নার ঘ্রাণ আর একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ আমাকে বারবার শৈশবের গ্রামীণ জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মনে হয়, দেশ থেকে বহু দূরে থেকেও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা যায়।
কিছুদিন আগে লাউ দিয়ে একটি বিশেষ খাবার রান্না করেছিলাম, যার নাম ‘দুধকদু’। বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষায় এই খাবারের আরও কোনো নাম আছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে খাবারটি তৈরির উপকরণ ও পদ্ধতি বেশ সহজ। লাউ কুচি কুচি করে কেটে তার সঙ্গে গরুর দুধ, নারিকেলের দুধ, খেজুরের গুড় বা চিনি, চালের সুজি বা গুঁড়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশিয়ে রান্না করা হয়। তৈরি হওয়ার পর এটি একটি সুস্বাদু মিষ্টান্নে পরিণত হয়।
সবাই খেয়ে বলল, খাবারটি নাকি অমৃত! তা হবে না কেন? দেশীয় সবজির স্বাদ, দুধের ঘ্রাণ, নারিকেলের মিষ্টতা আর খেজুরের গুড়ের পরিচিত সুবাস একসঙ্গে মিশলে খাবারটি সুস্বাদু হওয়ারই কথা।
কিন্তু খাওয়া শেষ হতেই সবার মুখে একটি প্রশ্ন: রান্না করার আগে যার নাম লাউ, রান্নার পর সে কদু হলো কীভাবে?
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি নিজের মতো করে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই স্ত্রী মারিয়া হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘যে লাউ সেই কদু!’
কথাটি শুনে আমি তো অবাক! এ কীভাবে সম্ভব? এমন একটি প্রচলিত বাংলা প্রবাদ তিনি ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় ব্যবহার করলেন কীভাবে?
পরে জানা গেল, এর পেছনে রয়েছে আরও একটি মধুর স্মৃতি।
১৯৯৫ সালে মারিয়া প্রথম বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন আমার মা নিজের হাতে দুধকদু রান্না করেছিলেন। খেজুরের রসের সঙ্গে দুধ মিশিয়ে চিতই পিঠা পরিবেশন করা, দুধকদু রান্না করা এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে খাওয়াদাওয়ার সেই দিনগুলোর স্মৃতি মারিয়ার মনে আজও অমলিন। এত বছর পর সুইডেনের মাটিতে একই ধরনের খাবার খেয়ে তাঁর সেই স্মৃতিগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
আমার মা আজ আর পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁর হাতে তৈরি খাবারের স্মৃতি, আতিথেয়তা ও ভালোবাসা আজও আমাদের সংসারে বেঁচে আছে। মায়ের রান্না করা একটি খাবার যে এত বছর পরও অন্য একটি দেশের মানুষের মনে এত গভীরভাবে জায়গা করে থাকবে, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।
এখানেই আমার কাছে গল্পটির প্রকৃত সৌন্দর্য।
একটি খাবার কেবল ক্ষুধা নিবারণ করে না। কখনো কখনো তা মানুষকে অতীতের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে আপন করে তোলে এবং দূরত্বের মধ্যেও সম্পর্কের সেতু গড়ে দেয়। আমার মায়ের রান্না করা দুধকদু তাই মারিয়ার কাছে কেবল একটি খাবার নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়ের একটি জীবন্ত স্মৃতি।
আর মারিয়ার বলা সেই কথাটি, ‘যে লাউ সেই কদু’, আমাকে ভাবিয়েছে অন্যভাবে।
আমরা একই জিনিসকে ভিন্ন নামে চিনি, ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করি, ভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে তার অর্থ খুঁজে নিই। কিন্তু নামের পার্থক্য সব সময় মূল বিষয়ের পার্থক্য তৈরি করে না। লাউ ও কদুর এই গল্পে যেমন হাস্যরস আছে, তেমনি আছে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে বোঝার একটি সহজ শিক্ষা।
আমাদের সমাজেও এমন অনেক পার্থক্য আছে, যেগুলো নিয়ে মানুষ অকারণে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অঞ্চল, ভাষা, সামাজিক পরিচয়, রাজনৈতিক মত কিংবা জীবনযাপনের ভিন্নতা আমাদের পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ পার্থক্যকে বোঝার চেষ্টা করলে তার মধ্যেও মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
তবে এই উপলব্ধির অর্থ এই নয় যে সব পার্থক্য উপেক্ষা করতে হবে। ন্যায় ও অন্যায়, সততা ও অসততার পার্থক্য অবশ্যই বুঝতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান ও সহমর্মিতা দিয়ে দূরত্ব কমানো সম্ভব, সেখানে বিভেদ বাড়িয়ে কী লাভ?
আমার নিজের জীবনও আমাকে এই শিক্ষা দিয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামে কৃষিকাজের মধ্য দিয়ে যে জীবন শুরু হয়েছিল, আজ সুইডেনের মাটিতে সেই কৃষির মধ্যেই আমি আনন্দ খুঁজে পাই। দেশ বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে, কিন্তু মাটির প্রতি ভালোবাসা বদলায়নি। আমার বাবা সরকারি চাকরি করেও কৃষিকে আঁকড়ে রেখেছিলেন, আর আমি বিদেশে থেকেও সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত আছি। এ যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলা সম্পর্কের ধারাবাহিকতা।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কৃষিকে অবহেলা করে কোনো জাতি দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ জীবনের শক্ত ভিত নিশ্চিত করতে পারে না। কৃষি শুধু অতীতের ঐতিহ্য নয়, ভবিষ্যতেরও সম্ভাবনা। জ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে পারলে আমাদের কৃষি আরও উৎপাদনশীল, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া জমি, সম্পদ ও ঐতিহ্য রক্ষা করাও একটি দায়িত্ব। শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে কথা বললে হবে না, বর্তমানের দায়িত্ব পালন করতে হবে। জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর উত্তরাধিকার রেখে যেতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সন্তানদের জন্য শুধু অর্থসম্পদ রেখে যাওয়াই যথেষ্ট নয়। তাদের মনে সততা, পরিশ্রম, মানবিকতা, শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের প্রতি সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলাও জরুরি। কারণ, সম্পদ হয়তো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তর করা যায়, কিন্তু মূল্যবোধ টিকে থাকে মানুষের আচরণে, স্মৃতিতে ও জীবনের চর্চায়।
আজ সুইডেনের বাগানে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশের লাউ দেখি, তখন শুধু একটি সবজি দেখি না। দেখি আমার শৈশব, আমার পূর্বপুরুষ, আমার বাবার কৃষির প্রতি ভালোবাসা, মায়ের রান্নাঘর এবং একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্মৃতি। আর যখন সবাই মিলে সেই লাউ দিয়ে তৈরি দুধকদু খাই, তখন মনে হয়, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের জীবনযাত্রা বদলালেও ভালোবাসা ও স্মৃতির ভাষা খুব একটা বদলায় না।
মারিয়ার একটি ছোট্ট মন্তব্য তাই আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। কখনো কখনো জীবনের বড় শিক্ষা আসে একেবারেই ছোট্ট কোনো ঘটনা থেকে। তার জন্য বড় বক্তৃতা লাগে না, জটিল তত্ত্বেরও প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু ঘটনাটির ভেতরের অর্থ উপলব্ধি করার ক্ষমতা।
যে লাউ সেই কদু। কথাটি হাসির ছলে বলা হলেও এর মধ্যে আমি খুঁজে পাই শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ এবং নিজের দায়িত্ব পালনের শিক্ষা।
আমরা যদি নিজেদের শিকড়কে ভালোবাসতে শিখি, কৃষি ও শ্রমের মর্যাদা দিতে পারি, অন্যের ভিন্নতাকে সম্মান করি এবং ন্যায়ের প্রশ্নে আপস না করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে মূল্য দিই, তাহলে আমাদের সমাজ আরও মানবিক হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত মানুষ কী নামে পরিচিত, কোথায় বসবাস করে কিংবা কোন সংস্কৃতির অনুসারী, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কী রেখে যাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
একটি লাউ থেকে দুধকদু হতে পারে, একটি পুরোনো স্মৃতি নতুন করে জীবন্ত হতে পারে, আর একটি সাধারণ পারিবারিক ঘটনা হয়ে উঠতে পারে জীবনের মূল্যবান শিক্ষা।
আমাদেরও তাই এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা উচিত, যেখানে শিকড় থাকবে অটুট, কৃষি পাবে মর্যাদা, উত্তরাধিকার থাকবে সুরক্ষিত, ভিন্নতার মধ্যে তৈরি হবে সম্প্রীতি এবং মানুষের পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে তার সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা।