স্মৃতিগদ্য বোধোদয়

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

ফাইল ছবি

সরাইল প্রজাতির একটি পুরুষ কুকুর ছিল আমাদের বাসায় আজ থেকে ৩৭–৩৮ বছর আগে। কুকুরটির নাম রাজা। সরাইল প্রজাতির কুকুরগুলো লম্বাটে ও হালকা–পাতলা গড়নের মেদহীন। শিকার ধরার জন্য হরিণের মতো সুন্দর দীর্ঘ লাফ দিতে পারে তারা। কিছুদিন পর থেকে কুকুরটির পুরুষাঙ্গ হতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরা শুরু হলো। স্থানীয় পশুচিকিৎসক রক্ত বন্ধের জন্য ট্যাবলেট দিলেন, মাংসের ছোট্ট টুকরায় ট্যাবলেট গুঁজে দিলে রাজা মহানন্দে লুফে নিত। ওষুধে রোগ সারছে না দেখে স্থানীয় পশুচিকিৎসক বললেন, মহাখালী নিয়ে যান। চিফ ভ্যাটেরিয়ান সমস্যার সমাধান করে দিতে পারবেন।

ঢাকা যাওয়ার জন্য গাড়ির পেছনের সিটে রাজা শুয়ে ছিল রাজার হালতেই। রাজাসহ মহাখালী চিফ ভেটেরিয়ানের চেম্বারে উপস্থিত হওয়ার পর দেখি চিকিৎসক সাহেব টেলিফোনে আলাপে ব্যস্ত। আমাকে বসতে বললেন। যথারীতি আমি তশরিফ আনার পর আমার বোধগম্য হলো, চিকিৎসক সাহেব ডায়েরি থেকে তাঁর লেখা ইংরেজি কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন বন্ধুকে। প্রায় এক ঘণ্টা তিনি নিমগ্ন ছিলেন সাহিত্যের ভুবনে। ধ্যান ভঙ্গ হলে কবিতার ঘর থেকে বের হয়ে পৃথিবীর আঙিনায় এসে ফোন রেখে দুচোখ তুলে আমার প্রতি মনোযোগী হন। বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি? কুকুরের সমস্যা শুনে বললেন, ওর সারকামসেশন করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সাহিত্যানুরাগী চিকিৎসক রাজাকে অজ্ঞান করার পর সুচ, ছুরি, কাঁচির মাধ্যমে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করে রাজার অণ্ডকোষ দুটি ফেলে দিলেন। অর্থাৎ মহামান্য চিকিৎসক রাজার রাজাগিরি খতম করে দিলেন। যথারীতি তাঁকে হাদিয়া প্রদানের পর ঘুমন্ত রাজাকে নিয়ে বাসায় ফিরি। কিছুদিন পর আবার ওই একই তথৈবচ অবস্থা। এবার স্থানীয় পশুচিকিৎসক রাজার হালত দেখে বললেন, অসুখ তো সারে নাই। এবার তা হলে কাজী আলাউদ্দিন রোডের পশু হাসপাতালে নিয়ে যান।

সকাল নয়টার মধ্যে পৌঁছাই কাজী আলাউদ্দিন রোডের পশু হাসপাতালে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাহেব তাঁর টেবিলের সামনের চেয়ারে বসতে বললেন আমাকে। তাঁর মুখোমুখি বসি আমি। তিনি ষাটের দশকে জার্মানি গিয়েছিলেন স্কলারশিপ নিয়ে। ছাত্রজীবনে জার্মানিতে তিনি স্কলারশিপের টাকায় একটি গাড়ি কিনেছিলেন। মনোমুগ্ধ শ্রোতা পেয়ে তিনি ফিরে গেলেন স্মৃতিময় জার্মানি। সকালের আলোয় চা পান আর তাঁর স্মৃতিময় গল্প শোনার জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে বসে আমার পাশের শূন্য চেয়ারে। দুই ঘণ্টা পর ডাক্তার সাহেব ফিরে আসেন অতীতের জার্মানি থেকে কোলাহলময় সকালের ঢাকায়। হেসে বললেন, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি? রাজার দুর্দশার কথা শুনে বললেন, ওই শালাকে ধইরা আনেন এখন। ওর সারকামসেশন করে দেব আমি। ব্যাটা কিছুই জানে না, ডাক্তারি করে। কুকুরটারে মাইরা ফালাইছে, ওর তো টিউমার হইছে। টিউমার ক্লিন করতে অইব, এই অসুখটা আবার আইব। আপনি আইলে আবার ক্লিন করতে অইব। এইভাবেই চলব ওর সারা জীবন। এখন চলেন, অপারেশন টেবিলে যাই।

মহাপ্রাণ চিকিৎসক সাহেব রাজাকে অজ্ঞান করে চা–চামচের মতো সরু লম্বা একটা চামচ দিয়ে রাজার পুরুষাঙ্গ থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ টিউমার বের করে আনেন। দীর্ঘ একটি নিশ্বাস নিয়ে ফিরে আসেন রৌদ্রময় সকালের রৌদ্রস্নাত অফিসে। আবার চা–পর্ব শেষ হলে ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করি, হাদিয়া কত দিতে হবে? বিস্মিত হয়ে তিনি বললেন, না না কোনো টাকা দিতে হবে না। কোনো সমস্যা হইলে আবার আইসেন, আমি আছি তো। প্রায় চার দশক পর আজও রাজা ও সেই মহানুভব ডাক্তারের কথা মনে হয় আমার।

নর্থ আমেরিকায় কুকুরের এই জাতীয় অপারেশনকে নিউটার বলে। প্রবাসে কুকুর, বিড়ালভক্তরা শুরুতেই প্রাণীটির অপারেশন সেরে নেন। বাংলাদেশে মহাখালী পশু হাসপাতালের ডাক্তার কেন সারকামসেশন বললেন, আমার জানা নেই। প্রকৃতিপ্রদত্ত ক্ষমতা নিউটারের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়ার জন্যই হয়তো একরাতে রাজা নীরবে দেয়াল টপকে নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। রাজা কি আমাদের কোনো বার্তা দিয়ে গেল? প্রভুভক্ত প্রাণীও প্রতিবাদী হতে পারে। ‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। পশুপ্রেমী হতে গিয়ে আজ আমরা প্রকৃতির দেওয়া পশুর অঙ্গচ্ছেদ করছি। কবি বলেছেন, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। আমরা পশুপ্রেমী হতে গিয়ে নির্দয়ের মতো প্রকৃতিপ্রদত্ত ওদের শক্তি কেড়ে নেই! আমাদের বোধোদয় হোক।