কাতারে কণ্ঠের জাদুতে সবাইকে মুগ্ধ করছেন বাংলাদেশি তানিম
কাতারে প্রতিদিনের মতো সেদিনও বাংলাদেশি তরুণ তানিম হাসান বের হয়েছেন ফুড ডেলিভারির জন্য। মাইজার এলাকায় ফুরুসিয়া সিগন্যালের কাছে এক জায়গায় কাজের ফাঁকে সহকর্মী কেনিয়ার তরুণ ফয়েজ আহমদ নিজের মুঠোফোনে তানিমের কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত ধারণ করে নেন। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি টিকটকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে তা আপলোড করেন ফয়েজ। সেখান থেকেই শুরু।
মূহূর্তে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তানিমের জাদুকরি কণ্ঠের তিলাওয়াত। পবিত্র রমজানে কাতারে কর্মরত বাংলাদেশি একজন বাইক রাইডারের এমন সুরে মোহিত হন কাতারবাসী। লাখ লাখ ভিউ ছাড়িয়ে তাঁর প্রথম ভিডিওটি শুধু ফয়েজের টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে এখন পর্যন্ত দেখেছেন ১৫ লাখের বেশি মানুষ। এর বাইরে সেটি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্সসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। লাখো মানুষ এখন এসব ভিডিও দেখছেন এবং শেয়ার করছেন।
ফয়েজ আহমদের আপলোড করা ভিডিওর কমেন্টে তানিম হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন ডেলিভারি অ্যাপ কোম্পানি সুনুনোর সিইও মুবারক আলহাজরি। কাতারে লুসাইল বলিভার্ডে সুনুন ভিলেজ নামে রমজান উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয় তানিম হাসানকে। সেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের সুরা আল-রহমান থেকে তিলাওয়াত করে সবাইকে মুগ্ধ করেন তিনি।
তানিম হাসানের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে হামাদ মুবারক আলহাজরি বলেন, এই তরুণের কোরআন মুখস্থ করা ও নিখুঁতভাবে তিলাওয়াত অবিশ্বাস্য এবং মুগ্ধকর। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মর্যাদা নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে এই পবিত্র রমজানে ওমরাহ আদায়ের জন্য নিয়ে যাব। পাশাপাশি তাঁর জন্য আর্থিক পুরস্কার ও অন্যান্য সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
পরে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে তানিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশি টাকা (৫ হাজার কাতারি রিয়াল) উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন আলহাজরি। প্রতিশ্রুতি দেন, সুনুনু কোম্পানির অফিসে তাঁর জন্য চাকরি এবং পাশাপাশি মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করে দেবেন তিনি।
তানিমের কোরআন তিলাওয়াত ভাইরাল হওয়ার পর কাতারের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও কোম্পানির পক্ষ থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দোহা থেকে প্রকাশিত আরবি দৈনিক আল-আরব পত্রিকার প্রধান কার্যালয়ে সম্পাদকসহ সিনিয়র সাংবাদিকদের সামনে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনান তিনি। পরদিন তাঁকে নিয়ে বড় আকারে ফিচার প্রকাশিত হয় দৈনিক আল-আরবের পাতায়। সেখান থেকেও বিশেষ সম্মাননা ও উপহার পান তিনি।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার নারান্দি ইউনিয়নে তানিম হাসানের বাড়ি। বাবা রুহুল আমিন কৃষিকাজ করেন। পরিবারে ২ ভাই ৪ বোনের মধ্যে সবার ছোট তানিম ২০২৫ সালে জীবিকার তাগিদে কাতারে চলে আসেন। গত আট মাস ধরে তিনি ফুড ডেলিভারি কোম্পানিতে বাইক রাইডার হিসেবে চাকরি করছেন।
কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জে নিউ আদর্শ নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় হাফেজ মাওলানা রমজানের কাছে ২০১৯ সালে কোরআন হিফজ শেষ করেন তানিম হাসান। এরপর ঢাকায় মিরপুরে জামিয়া কাসিমুল উলুম মাদ্রাসায় এক বছর শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। গত আট মাস ধরে কাতারে বাইক রাইডার হিসেবে কর্মরত তানিম থাকেন শিল্পাঞ্চল সানাইয়ায় ১৩ নম্বরে। বড় ভাই মুখলেসুর রহমানও কাতারে থাকেন।
তানিম হাসানের এমন সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। বন্ধুসভা কাতার শাখার সভাপতি শাকিল আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, পবিত্র রমজানে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সবার কাছে তানিম হাসানের পরিচিতির মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম, যা আমাদের সবার জন্য গর্বের এবং আনন্দের।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]